বোর্ডের দ্বিতীয় ব্যক্তি গলা লম্বা করলেন। সাজ্জাদের মনে হল, একটা শুকনা হলুদ রঙের কচ্ছপ তার খোলের ভেতর থেকে মাথাটা বের করল। অনেকখানি বের করল।
সাজ্জাদ হোসেন সাহেব।
জ্বি স্যার।
বাংলাদেশকে আপনি কি আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রি বলে মনে করেন?
করি স্যার।
আমাদের দেশের অনগ্রসরতার পেছনে কারণ কি বলে আপনার ধারণা?
কারণ তো একটা না, অনেক।
কারণ অনেক হলেও মূল কারণ কিন্তু একটি–সেটা কি?
মূল কারণ একেকজন একেকভাবে চিহ্নিত করবেন। আমার নিজের ধারণা অশিক্ষা।
সাজ্জাদ সাহেব, আপনি কি মনে করেন এই দেশের সব মানুষ যেদিন ইন্টমিডিয়েট পাশ করবে। সেদিন দেশ অনেকদূর অগ্রসর হয়ে যাবে?
বোর্ডের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। প্রশ্নটার ভেতর হাসির কি আছে সাজ্জাদ ধরতে পারল না। সে মনে মনে বলল ব্যাটা কচ্ছপ তোর পানির ভেতর থাকার কথা–তুই এখানে কি করছিস? তুই তোর কচ্ছপকে নিয়ে নদীর পাড়ে চলে যা। কচ্ছপ ডিম পাড়বে। বালির ভেতর ডিম লুকিয়ে রাখবে। তুই সেই ডিম পাহারা দিবি।
সাজ্জাদ সাহেব, আমাদের ধারণা হয়ে গেছে— নানান সরকারী প্রপাগান্ডার জন্যেই ধারণা হয়েছে যে, অশিক্ষাই সব কিছুর মূলে। আসলে তা না। মূল ব্যাপার হল স্বপ্নের অভাব।
কিসের অভাব বললেন?
স্বপ্নের। আমাদের নেতারা এখন আর স্বপ্ন দেখতে পারছেন না। তারা রিয়েলিটি নিয়ে ব্যস্ত। আপনার কি মনে হয় না যে এই সময়ের নেতাদের কোন স্বপ্ন নেই?
আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। স্বপ্ন খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। নেতাদের স্বপ্ন আছে কি নেই তা তাদেরই শুধু জানার কথা।
সাজ্জাদ সাহেব, আপনার নিজের কি কোন স্বপ্ন আছে?
জ্বি স্যার, আছে।
বলুন দেখি, কি স্বপ্ন।
আপনাদের শুনতে ভাল লাগবে না।
ভাল না লাগলেও শুনি। একজন মানুষকে সত্যিকারভাবে জানার উপায় হচ্ছে তার স্বপ্নটা জানা। শুনি, আপনার স্বপ্নটা কি শুনি।
সাজ্জাদ একটু ঝুঁকে গেল। কচ্ছপের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর হাসিমুখে বলল–আমার স্বপ্ন হচ্ছে আশ্রম করা। বর্ষা আশ্রম।
কি আশ্রম?
বর্ষায় সেই আশ্রমে বর্ষা উৎসব হবে। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বর্ষার নব্যধারা জলে ভিজতে ভিজতে নাচবে। নগ্ন নৃত্য।
নগ্ন নৃত্য?
জি, নগ্ন নৃত্য।
তাতে লাভ কি?
স্বপ্ন কি স্যার লাভ লোকসান দেখে চলে? রিয়েলিটি লাভ-লোকসান বিবেচনা করে। স্বপ্ন করে না।
বোর্ড মেম্বারদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো। বোর্ডের চেয়ারম্যান সাহেব অকারণে কয়েকবার গলা খাকাড়ি দিলেন। সাজ্জাদ বসে আছে চুপচাপ। স্যার আজ তাহলে আসি এই বলে বিদায় নেয়াটা অভদ্রতা হবে কি-না বুঝতে পারছে না। বোর্ডের শেষ মাথার এক ভদ্রলোক নড়াচড়া করছেন। জ্ঞানগর্ভ কোন প্রশ্ন করার প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে। সাজ্জাদ তাকালো তার দিকে। ইনি সম্ভবত সায়েন্সের প্রশ্ন করবেন। বোর্ড মেম্বারদের একজন থাকেন সায়েন্টিস্ট। তিনি বিজ্ঞানের জটিল প্রশ্ন হাসিমুখে করেন। তাকে একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল–হাইজেনবার্গের আনসারাটিনিটি প্রিন্সিপ্যালটা কি? এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন সে নিজেই হাইজেনবার্গ।
সাজ্জাদ সাহেব।
জ্বি স্যার।
আপনি যেতে পারেন।
জ্বি আচ্ছা।
সাজ্জাদ হাসিমুখে বের হয়ে এল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার ঘরে ঢুকে চেয়ারম্যান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, আপনাদের বাথরুমটা কোন দিকে? আমার একটু বাথরুমে যাওয়া প্রয়োজন।
চেয়ারম্যান সাহেব হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে তিনি গভীর বেদনা বোধ করছেন। যে বেদনার উৎস সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই।
বিকেলে আতাহার সাজ্জাদ বাসায় ফিরেছে কি-না জানতে এসে হকচকিয়ে গেল। বিশাল আম গাছ সাজ্জাদদের বাড়িতে পড়ে আছে। জানালার কাচ ভেঙ্গে একাকার।
আতাহার বিস্মিত হয়ে নীতুকে বলল, ব্যাপার কিরে?
নীতু বলল, ঝড়ে গাছ পড়ে গেছে?
ঝড় কখন হল যে গাছ পড়ে যাবে?
বলেন কি আপনি, কাল প্ৰচণ্ড ঝড় হল না?
বৃষ্টি হয়েছে–সামান্য বাতাসও হয়ত হয়েছে–এটাকে ঝড় বললে তো ঝড়ের অপমান। তোর হাতে ব্যাণ্ডেজ কি জন্যে। ঝড় কি হাতের উপর দিয়েও গেছে?
হুঁ।
হুঁ মানে কি?
হুঁ মানে জানালা ভাঙা কাচে হাত কেটে গেছে।
বলিস কি? বিনা মেঘে বজুপাত, এখন দেখছি বিনা মেঘে রক্তপাত।
সব কিছু নিয়ে ঠাট্টা করবেন না।
সাজ্জাদ। সাজ্জাদের কোন খোঁজ পাওয়া গেছে?
ভাইয়া এসেছে। ইন্টারভ্যু দিতে গেছে।
ইন্টারভ্যু দিয়ে কি বাসায় ফিরবে, না উধাও হয়ে যাবে?
সে তো আর আমি জানি না। ভাইয়া জানে। আপনি কি অপেক্ষা করবেন ভাইয়ার জন্যে?
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারি।
আপনাকে একা একা অপেক্ষা করতে হবে। আমি একটু হাসপাতালে যাব।
বাবা হাসপাতালে। উনাকে নিয়ে আসতে যাব।
উনি আবার হাসপাতালে কখন গেলেন?
আপনার এত প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। আপনি বসে অপেক্ষা করুন। ভাইয়ার ঘরে গিয়ে বসুন। আপনাকে চা দিতে বলি।
হাসপাতালে যাচ্ছিস তো এমন সাজগোজ করেছিস কেন? মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছিস।
নীতু আহত গলায় বলল, সাজগোজের কি দেখলেন? ইস্ত্রি করা একটা শাড়ি শুধু পরেছি। আমার চেহারা খারাপ বলে আমি একটা ভাল শাড়িও পরতে পারব না? আমাকে সব সময় ময়লা আর কম দামী শাড়ি পরে ঘুরঘুর করতে হবে?
একসঙ্গে অনেকগুলি কথা বলতে গিয়ে নীতুর গলা ধরে গেল। তার চোখ ও ভিজে আসছে। আতাহার হকচুকিয়ে গেল। কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। মেয়েট। যতই বড় হচ্ছে ততই যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে আর ঠাট্টা-তামাশা করা ঠিক হবে না। সাবধান হয়ে যাওয়া দরকার। এই জাতীয় মেয়েরা বড় ভাইয়ের বন্ধুদের সঙ্গে প্রেম করার জন্যে পেখম মেলে থাকে। নীতুও হয়ত পেখম মেলে আছে। ভাবভঙ্গি সেরকমই। আগেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। মনে হয় দেরি হয়ে গেছে।
