হোসেন সাহেব আবার উঠে বসলেন। ডাক্তার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাত ইশারা করলেন। টেলিফোন করা তাঁর অসম্ভব জরুরী। সাজ্জাদের কাল ইন্টারভ্যু আছে। ব্যবস্থা সবই নেয়া হয়েছে। সাজ্জাদ শুধু উপস্থিত হলেই হবে। প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে টেলিফোন করবেন কি-না তার সন্দেহ ছিল। তবে তিনি খবর পেয়েছেন–প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করেছেন। এখন গাধামার্কা ছেলে–বোর্ডের সামনেই হয়ত উপস্থিত হবে না।
ডাক্তার মেয়েটি উঠে আসছে। এবার সে একা আসছে না–সঙ্গে ছেলেটিও আসছে।
আপনার কি ব্যাপার বলুন তো?
একটা টেলিফোন করার দরকার ছিল।
আপনার যা দরকার তার নাম ঘুম। টেলিফোন না। কাকে টেলিফোন করতে চান?
হোসেন সাহেব দ্রুত ভাবছেন–কাকে টেলিফোন করার কথা শুনলে এরা ভড়কে যাবে? ডাক্তাররা কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে? সমাজ কল্যাণ না-কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরই হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এখন কে? মোবারক না? উহুঁ, মোবারক আছে যুব অধিদপ্তরে…
ডাক্তার ছেলেটি বলল, বুড়ামিয়া ঘুমানোর চেষ্টা করুন। শুয়ে পরুন তো। শুয়ে শুয়ে পাঁঠার সংখ্যা গুণতে থাকুন। হাজারখানিক পাঁঠা গুণতেই ঘুম চলে আসবে।
হোসেন সাহেব ছেলেটির অভদ্রতায় হতভম্বর হয়ে গেলেন। এই ছেলেটিকে কঠিন কোন শিক্ষা দেয়া দরকার। ছেলেটার ডিউটি কতক্ষণ কে জানে। ডিউটিতে থাকতে থাকতেই তার ভিজিটাররা চলে এলে মাইলড় একটা শিক্ষা হবে। যদিও যে অভদ্রতা সে করেছে তাতে মাইলড ধরনের শিক্ষা দিলে চলবে না।
তার ভিজিটাররা এখনো আসছে না কেন? এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে আর বাসা থেকে কাউকে খবর দেয়া হয়নি, বিশ্বাস করা কঠিন। ছেলেটা গাধা, মেয়েটা তো গাধা না।
শুনুন বুড়োমিয়া। চোখ বন্ধ করে থাকুন। ঘুমের অষুধ আপনাকে দেয়া হয়েছে। অষুধকে কাজ করার সুযোগ দিন। চোখ বন্ধ করে থাকুন।
হোসেন সাহেবের নিজেকে চোখ বন্ধ করতে হল না। আপনাতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি অসহায় বোধ করছেন। ভিজিটাররা আসবে, তিনি ঘুমিয়ে থাকবেন–কে আসবে কে যাবে বুঝতেই পারবেন না। এর কি কোন মানে হয়। ওরা ফুল টুল নিয়ে আসবে। ফুল রাখারই বা জায়গা কোথায়? কেবিন হলে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যেত।
ভিজিটার কেউ আসছে না। এও একদিক দিয়ে ভাল। তারা এসে দেখতো। তিনি একদল ফকির মিসকিনের সঙ্গে পড়ে আছেন। লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার মত অবস্থা হত। এই নরক থেকে উদ্ধার না পাওয়া পর্যন্ত টেলিফোন করা যাবে না। কবে উদ্ধার পাওয়া যাবে? সাজ্জাদ কি যেন বলে গেছে। সকালে? সকালে এলেই ইন্টারভ্যুর কথাটা মনে করিয়ে দিতে হবে। কে জানে তাঁর নিজেরই হয়ত মনে থাকবে না।
হাট এ্যাটাকের পর স্মৃতি শক্তি কমে যায়। ঠিকমত রক্ত না পাওয়ায় মস্তিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারটা অবশ্য মাইলন্ড এ্যাটাক। হয়ত তার মস্তিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি। ওয়া ওঁয়া শব্দে কে কাঁদছে। আশ্চর্য কাণ্ড, নবজাত শিশুর কান্না আসছে কোত্থেকে? এটাতো মেটানিটি ওয়ার্ড না। হোসেন সাহেব প্রাণপণ চেষ্টা করলেন চোখ মেলতে। মেলতে পারছেন না। ওঁয়া ওঁয়া কান্না শুনতে শুনতে তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন।
সাজ্জাদ ইন্টারভ্যু দিতে ঘরে ঢুকেছে
সাজ্জাদ ইন্টারভ্যু দিতে ঘরে ঢুকেছে। প্রায় হলঘরের মত বড় ঘর। নিশ্চয়ই ছোটখাট কনফারেন্স টিনফারেনাস হয়। ঘরের মাঝখানে কনফারেন্স টেবিলের মত গোল টেবিল। একটা পাশ বুড়ো এবং আধাবুড়োরা দখল করে আছেন। এঁরাই ইন্টারভ্যু নেবেন। সাজ্জাদ চট করে গুণে ফেলল–সাতজন। একটা করে প্রশ্ন করলেও সাতটা প্রশ্ন। সাতজনই চেষ্টা করবে। এমন প্রশ্ন করতে যেন প্রশ্ন শুনে শুধু যে সাজ্জাদই ভাবাচেকা খেয়ে যাবে তা না–ইন্টারভ্যু! বোর্ডের অন্য মেম্বারেরাও ভাবাচেকা খেয়ে যাবেন। প্রশ্নকতাঁর গভীর জ্ঞান, গভীর প্রজ্ঞায় অভিভূত হবেন। দু একজন থাকবে যাদের ধারণা তারা মহা রসিক।
সাজ্জাদ মাঝখানে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, স্লামালিকুম। তার কাছে মনে হল আজকের এই ইন্টারভ্যু। বোর্ডের তিনিই প্রধান। ভদ্রলোক সোজা হয়ে বসলেন, এবং বললেন, সিট ডাউন ইয়ং ম্যান। তুমি যে বললে স্লামালিকুম এটা কি ঠিক হল? শব্দটা আমি যতদূর জানি–আসসালামুআলাইকুম। যার অর্থ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। স্লামালিকুমের অর্থ কি?
সাজ্জাদ লক্ষ্য করল প্রশ্নটা করতে পেরে ভদ্রলোক আনন্দিত। প্রথম প্রশ্নতেই শক্ৰ ঘায়েলের আনন্দ। সাজ্জাদ মনে মনে বলল–অফ যা বেকুব।
ইয়াং ম্যান, বল বিকৃত শব্দ বলার মানে কি? এই শব্দ দিয়ে তুমি কি বুঝাতে চাইছ? আনসার মি।
সাজ্জাদ হাসিমুখে বলল, এই শব্দের মানেও আপনার উপর শান্তি বৰ্ষিত হোক। আমরা মূল শব্দটাকে একটু ছোট করে নিয়েছি। এরকম আমরা সব সময় করি। রবার্টকে বলি বব। রবার্ট কেনেডির জায়গায় বলি বব কেনেডি। বাংলা শব্দের অনেক উদাহরণও আমি দিতে পারব। শব্দ ছোট করায় আমার বলতে সুবিধা হচ্ছে। এটাই আসল কথা। আমি জানি এই শব্দ দিয়ে আমি কি বুঝাতে চাচ্ছি–আপনিও জানেন। কাজেই সমস্যা হচ্ছে না। আপনি যদি আরবের অধিবাসী হতেন তাহলে স্লামালিকুম শুনে হকচকিয়ে যেতেন, এর অর্থ ধরতে পারতেন না–কিন্তু আপনি তো আরবের লোক না।
ইন্টারভ্যু বোর্ডের চেয়ারম্যানের চোখ সরু হয়ে গেল। তাঁর এটি খুবই প্রিয় প্রশ্ন। সবাইকে তিনি এই প্রশ্ন দিয়ে কাত করেন এবং শেষে মধুর ভঙ্গিতে বলেন–এখন থেকে বিকৃত ভঙ্গিতে সালাম দেবে না। ঠিক আছে? এই প্রথম একজনকে পাওয়া গেল যে নিজেকে ডিফেন্ড করল এবং বলা যেতে পারে ভালভাবেই করল। ডিফেন্সেরর পদ্ধতি যদিও খুবই উগ্র। তিনি গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন–ইয়াং ম্যান, তুমি যুক্তি ভালই দিয়েছ। তবে নিজের ফাঁদে নিজে পা দিয়েছ। এক্ষুণি তোমাকে মহাবিপদে ফেলে দিতে পারি–যাই হোক, । spared you the trouble, আপনাদের কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে জিজ্ঞেস করুন।
