প্রথমে ছিল। টিউমার। বেনাইন টিউমার–এখন ক্যানসারাস হয়ে যাচ্ছে। অপারেশন করে কেটে বাদ দিতে হবে। কিংবা শক্ত ঝাঁকি দিতে হবে। প্রেম-প্ৰেম ভাব ঝেঁটিয়ে বিদেয় না করলে পরে সমস্যা হবে। আতাহার ধমকের গলায় বলল, কাঁদছিস কেন?
কাঁদলেও আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে?
কৈফিয়ত দেয়াদেয়ির কিছু না–কথায় কথায় ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ–চেহারা তো এমিতেই খারাপ, তার উপর যদি স্বভাব-চরিত্র খারাপ কবিস, তা হলে তো বিয়েই হবে না। পেকে ঝানু হয়ে যাবি, বিয়ে হবে না।
এমন অশালীন ভাষায় কথা বলেন কেন?
যা সত্যি তাই বলি–শালীন-অশালীন কিছু না। কোন ছেলের দায় পড়েনি ফ্যাঁচফ্যাচালি মেয়ে বিয়ে করবে।
আমার বিয়ে নিয়ে তো আপনাকে ভাবতে বলিনি। না-কি বলেছি? না—কি আপনার ধারণা হয়েছে। আমি আপনার প্রেমে হাবুড়ুবু খাচ্ছি? আমি দেখতে সস্তা ধরনের হতে পারি–আমার প্রেম সস্তা হবে কেন?
ওরে বাপরে, তুই তো ভয়াবহ ডায়ালগ দিচ্ছিস।
ভাল ভাল ডায়ালগ শুধু আপনি দিতে পারবেন? আমার দায়িত্ব শুধু শুনে যাওয়া? আপনার দোষ কি জানেন আতাহার ভাই? আপনার দোষ হচ্ছে নিজেকে আপনি মহাজ্ঞানী ভাবেন। মহাবুদ্ধিমান ভাবেন। আপনি মহাজ্ঞানীও না, মহাবুদ্ধিমানও না।
আমি তাহলে কি?
আপনি অতি সাধারণ একজন মানুষ। অপদাৰ্থ ধরনের মানুষ। এম. এ. পাশ করে বসে আছেন। কাজকর্ম কিছুই জোগাড় করতে পারেননি। সিন্দাবাদের ভূতের মত এখনো বাবার ঘাড়ে চেপে আছেন। মনে মনে ধারণা করছেন যে আপনি বিরাট কিছু— মহাকবি। আসলে কিছুই না। আপনি নিজে আসলে কি তা নিজে জানলে পৃথিবীতে বাস করতে পারবেন না। যেহেতু আপনার ধারণা। আপনি বিরাট সৃষ্টিশীল একজন মানুষ, সেহেতু বেঁচে আছেন।
তুই তো বিরাট বক্তৃতা দিয়ে ফেললি।
বক্তৃতা শেষ হয়নি–সবটা শুনুন। আপনি মানুষ হিসেবেও তুচ্ছ। তুচ্ছ কেন বলছি জানেন? সব মানুষের নিজের স্বাধীন সত্তা বলে একটা জিনিস থাকে। আপনার সেটা একেবারেই নেই। আপনার অভ্যাস হল অন্যের হুকুমে চলা। আমি ব্যাপারটা খুব ভালভাবে লক্ষ্য করেছি। ভাইয়া এবং আপনি যখন একসঙ্গে থাকেন, তখন ভাইয়া যা বলে আপনি রোবটের মত পালন করেন। আপনার মধ্যে আছে হুকুম তামিল করা স্বভাব। আমি নিশ্চিত, আপনার নিজের বাড়িতেও আপনার একই অবস্থা। আপনি হলেন ইয়েস স্যার টাইপ মানুষ। আরো খারাপ ভাবে বলতে বললে বলব, আপনি নিম্নশ্রেণীর চামচা।
নিম্নশ্রেণীর বলছিস কেন? চামচার আবার জাতিভেদ আছে না-কি?
অবশ্যই আছে। প্রথম শ্রেণীর চামচা হচ্ছে যারা স্বাৰ্থ সিদ্ধির জন্যে চামচার ভাব ধরে থাকে। আর তৃতীয় শ্রেণীর চামচা হচ্ছে তারাই যাদের জন্মই হয়েছে চামচা হিসেবে। আপনি হচ্ছেন তৃতীয় শ্রেণীর চামচা।
বলিস কি!
সত্যি কথা বললাম। হয়ত মনে কষ্ট পেয়েছেন। কষ্ট পেলেও কিছু করার নেই। অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম আপনাকে কথাগুলি বলব–সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হল। যাই আতাহার ভাই।
চলে যাচ্ছিস?
হ্যাঁ। আপনার কিছু বলার থাকলে দু-তিন মিনিট অপেক্ষা করতে পারি।
সাজ্জাদের ঘর কি খোলা আছে?
হ্যাঁ, খোলা আছে। যান, অপেক্ষা করুন। আপনাকে যেন সময়মত চা-টা দেয় বলে যাচ্ছি।
তোর কি আসতে দেরি হবে?
কোন দরকার নেই, জিজ্ঞেস করলাম।
আমার আসতে দেরি হবে না। যাব। আর বাবাকে নিয়ে চলে আসব। তারপরেও অনেকখানি সময় পাবেন–এই সময়ে ভেবে-টেবে বের করুন কি করলে আমি কষ্ট পাব। আমার চেহারা খারাপ এটা বলে বেশি সুবিধা করতে পারবেন না। অসংখ্য মানুষের কাছে অসংখ্যবার শুনেছি। এখন আর শুনতে খারাপ লাগে না।
এ রকম মাস্টারনী টাইপ কথা কার কাছে শিখেছিস?
নিজে নিজেই শিখেছি। কেউ শেখায়নি। যাই আতাহার ভাই।
নীতু শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গ্যারেজের দিকে গেলো। গ্যারেজে একটা দড়ির খাটিয়া পাতা আছে। তাদের ড্রাইভার সেই খাটিয়ায় সারাক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে।
সাজ্জাদের ঘর ছবির মত গোছানো। তার প্রধান কারণ সাজ্জাদ তার এই ঘরে কমই থাকে। এ বাড়িতে তার অনেকগুলি শোবার জায়গা। প্রধান শোধার জায়গা হচ্ছে ড্রয়িংরুমের সোফা। একটা লম্বাটে সোফা আছে জানালার পাশে। এই সোফায় শুয়ে থাকলে তার কাছে না-কি মনে হয় ট্রেনের বেঞ্চে শুয়ে আছে। ট্রেনের দুলুনিও না—কি টের পাওয়া যায়। একটাই সমস্যা–মশা। সাজ্জাদ সেই সমস্যার সমাধান তার নিজস্ব পদ্ধতিতে করেছে। পদ্ধতিটা সহজ–অন্ডিকোলন স্তেপ্র করা একটা দড়ির মাথায় আগুন ধরিয়ে সেই দড়ি জানালার দিকে ঝুলিয়ে দেয়া। দড়ি পুড়ে অডিকেলন এবং ধোয়ার একটা মিশ্র গন্ধ বের হয়। সেই গন্ধ না-কি মশাদের খুব প্রিয়। সব মশা সেই গন্ধের লোভে ভিড় করে। কাছেই যে মানুষটা শুয়ে থাকে তার দিকে নজর থাকে না।
সাজ্জাদের দ্বিতীয় পছন্দের শোবার জায়গা হচ্ছে ছাদের চিলেকোঠার ঘর। সেই ঘরের একটাই দরজা, জানালা-টানালার কোন বালাই নেই। একটা চৌকি এবং চৌকির উপর শীতল পার্টি বিছানো। জোছনা রাত কিংবা বৃষ্টির রাতে সাজ্জাদ ঐ চৌকিতে শুয়ে থাকে। কাজেই নীতু প্রচুর সময় পায় সাজ্জাদের ঘর গুছিয়ে রাখার। যে যত্ন এবং আগ্রহ নিয়ে সে এই ঘর গোছায় সেই যত্ন এবং আগ্রহ বোধহয় সে নিজের ঘর সাজানোর সময়ও বোধ করে না।
এই ঘরে জুতা পরে যাওয়া নিষেধ। দরজার সামনে জুতা খুলে রেখে ঢুকতে হবে। সিগারেটের ছাই ঘরের মেঝেতে ফেলা যাবে না। ঘরের আসবাবপত্র টানাটানি করে তাদের নির্ধারিত জায়গা থেকে সরানো যাবে না। এই মর্মে হাতে লেখা একটা নোটিশ দরজায় সঁাটা আছে। আতাহার নোটিশের তিনটি নিষেধাজ্ঞাই অমান্য করেছে। জুতা পায়ে ঘরে ঢুকে জুতার ময়লা মেঝেতে মাখিয়েছে। ঘরে ঢুকেছে বেশিক্ষণ হয়নি–এর মধ্যেই দুটা সিগারেট খেয়ে তার ছাই মেঝেতে ছড়িয়েছে। সাজ্জাদের কাবার্ড খুলে লুঙ্গি বের করে পরেছে। ফুল স্ফীডে ফ্যান ছেড়ে এখন সে বিছানায় কান্ত হয়ে আছে। পা রাখার জন্যে ভাল জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। সোফা টেনে এনে বিছানার সঙ্গে লাগিয়ে পা রেখেছে। তাতেও তার ঠিক আরাম হচ্ছে না। মনে হচ্ছে–পায়ের লেভেল সমান না হয়ে উঁচুনিচু থাকলে আরাম হত। তার হাতে হ্যারলর্ড পিন্টারের An Anthology of 100 poems by 100 poets, বইটা বালিশের কাছে রাখা ছিল বলেই সে হাতে নিয়েছে।
