না।
ভেরী গুড। তোমার এ্যাটাকটা মাইলন্ড টাইপের–ভালমন্দ কিছু হবার কথাও না। ঘুমের অষুধ দেয়া হয়েছে। টানা একটা ঘুম দাও। সকালে এসে তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাব।
আমি এখানে একা থাকব?
এক কোথায়? শত শত রোগী আছে তোমার সঙ্গে।
আমাকে ফেলে চলে যাবি?
বাড়তি লোক থাকার কোন ব্যবস্থা নেই বাবা। তোমাকে কেবিন দেয়া হয়নি। কেবিন দিলে মেঝেতে চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকতাম।
কেবিন দেয়নি?
না।
তুই আমার পরিচয় দিস নাই?
পরিচয় দেব না কেন? তোমার নাম বলেছি, বাড়ির ঠিকানা বলেছি।
বিস্ময়ে হোসেন সাহেবের বাক রুদ্ধ হয়ে গেল। কি বলছে এই ছেলে! নাম আর বাড়ির ঠিকানা। এর বাইরে তার নাকি আর বলার কিছু নেই? তার এই গাধা ছেলে কি জানে না তার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে এই খবরটা প্রচার হলে আধঘণ্টার মধ্যে খুব কম করে হলেও তিনজন মন্ত্রী ফ্ল্যাগ গাড়ি নিয়ে চলে আসবেন? প্রধানমন্ত্রী নিজে টেলিফোনে তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেবেন। দেশের প্রতিটি প্রধান দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ তার সংবাদ ছাপা হবে। গাধা ছেলে কি পত্রিকায় খবর দিয়েছে? মনে হয় না। যে ছেলে মনে করে শুধু নাম আর ঠিকানাতেই তার পরিচয়, তার কাছ থেকে এরচে বেশি কি আশা করা যায়?
তিনি চারদিকে তাকালেন–হলঘরের মত একটা ঘরে তাকে ফেলে রেখেছে। চারপাশে গিজ গিজ করছে রোগী। এতদিন তার মনে একটা ভ্ৰান্ত ধারণা ছিল–হাটের ব্যামো শুধু বিত্তবানদেরই হয়–। এই ধারণা তার এখন ভেঙেছে। তার চারপাশে আজেবাজে টাইপের লোক। একজন তাঁর চোখের সামনে নাকের সর্দি ঝাড়ল। সর্দি মাখা আঙ্গুল নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের শাটে মুছে ফেলল। এখন সে আবার পানের কৌটা খুলে সর্দি ভেজা নোংরা হাতে পান বানাচ্ছে। ওই গড! একটা টেলিফোন করা দরকার। খুবই দরকার। এই ওয়ার্ডে কি কোন ডাক্তার নেই? ডাক্তারকে বলে একটা টেলিফোন করানো যায় না?
পাশের বেড থেকে এক বৃদ্ধ বলল, কি খুঁজেন চাচা মিয়া?
হোসেন সাহেব জবাব দিলেন না। এরা কথা বলার মত কেউ না। তিনি ভেবে পেলেন। না–রাস্তার সব ফকির ধরে এরা হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে কি-না। কেউ এক আসেনি। সবার সঙ্গে একজন-দুজন করে আত্মীয় আছে। এরা রোগীর পাশে জায়গা করে দিব্যি গুটিশুটি মেরে ঘুমুবার আয়োজন করছে। একজন আবার চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা নিয়ে এসেছে। বাচ্চাটা পুরোপরি উদোম। কোমরে শুধু কালো ঘুনশি। বাচ্চাটার হাতে পাউরুটি। সে পাউরুটির টুকরা কামড় দিয়ে ছিড়ছে এবং থু করে মেঝেতে ফেলছে। একজন আবার সঙ্গে সঙ্গে মেঝে থেকে সেই টুকরা তুলে বিছানায় জমা করছে। এক সময় নিশ্চয়ই এই টুকরাগুলি খাওয়া হবে। হোসেন সাহেব। আবার বিড় বিড় করে বললেন, ওহ গড!
হোসেন সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন। ঘরের এক মাথায় চেয়ার-টেবিল পেতে দুজন তরুণ-তরুণী বসে আছে। তরুণীর গায়ে এপ্রন দেখে মনে হচ্ছে সে ডাক্তার। হোসেন সাহেব হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। মেয়েটি তা দেখেও উঠে এল না। সে হাত নেড়ে নেড়ে গল্প করেই যেতে লাগল।
পাশের বেডের বুড়ো আবার বলল, আপনের কিছু লাগব চাচা মিয়া? আমারে কন দেহি। আমার লোক আছে। সংগ্ৰহ কইরা দিব।
সবারই লোক আছে। রাস্তার ভিক্ষুকের মত দেখতে বুড়োও বলছে তার লোক আছে–অথচ তার কেউ নেই। তার ছেলে তাকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চলে গেছে। পরিচয় হিসেবে শুধু নাম আর বাড়ির ঠিকানা দিয়ে গেছে। কাউকে বোধহয় টেলিফোন করেও খবর দেয়নি। খবর দিলে এতক্ষণে ভিজিটাররা আসতে শুরু করতো। হাসপাতালের টনক নড়ে যেত।
তরুণী ডাক্তারনি এতক্ষণে র্তাকে দেখল। সে উঠে আসছে। বিরক্ত মুখে উঠে আসছে। এত বিরক্ত হবার কি আছে? হোসেন সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
কি হয়েছেআপনার?
একটা টেলিফোন করব।
টেলিফোন করবেন কেন? কোন সমস্যা হচ্ছে?
জ্বি না।
সমস্যা না হলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। রেস্ট নিন। বসে থাকবেন না। শুয়ে পড়ুন।
হোসেন সাহেব শুয়ে পড়লেন। মেয়েটি তার লোহার খাটের পায়ের কাছ থেকে একটা কার্ড নিয়ে ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ দেখল। তারপর যে রকম বিরক্ত ভঙ্গিতে এসেছিল। সে রকম বিরক্ত ভঙ্গিতে চলে গেল। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একজন নার্স হাতে একটা ট্যাবলেট এবং পানির গ্লাস নিয়ে উপস্থিত হল। ঘুমের অষুধা। ডাক্তার মেয়েটি বোধহয় পাঠিয়েছে।
তিনি অষুধ খেয়ে নিলেন। এখনো ঘুম আসছে না। আসবে বলেও মনে হচ্ছে না। না আসাই ভাল। ভিজিটাররা আসবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। সাজ্জাদ কাউকে কিছু না জানালেও নীতু জানাবে। একজন কেউ জানলেই সেটা ছড়িয়ে পড়বে। খবরের কাগজ থেকেও লোকজন আসতে পারে। তাদের সঙ্গে দু-একটা হালকা এবং মজার ধরনের কথা বলতে হবে। সে কথাগুলি আগে গুছিয়ে রাখলে ভাল হয়। হাট বিষয়ক ইন্টারেস্টিং কোন কথা।
মানুষ তার আবেগ, ভালবাসা, ঘৃণার জন্ম ও অবস্থানের জন্যে যে স্থান নির্ধারিত করেছে সেটা হল হৃদপিণ্ড। হাট। প্রাচীনকাল থেকে মানুষের ধারণা–যাবতীয় ইমোশনের জন্ম-মৃত্যু হৃদপিণ্ডে। এর কারণ কি জানেন? এর কারণ হল–মানুষের শরীরের এই একটি অংশই দিবারাত্রি স্পন্দিত হয়। এই স্পন্দন কখনো থামে না।
হার্ট সম্পর্কে আরো কিছু বলতে পারলে ভাল হত। মনে পড়ছে না। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকাটা হাতের কাছে থাকলে দেখে নেয়া যেত। টেলিফোন করতে পারলে নীতুকে বলে দিতেন ড্রাইভারকে দিয়ে এনসাইক্লোপিডিয়াটা পাঠিয়ে দিতে। আর ফ্লাস্ৰেক করে ঠাণ্ডা পানি। এখনো তার পানির পিপাসা হয়নি। তবে হবে। যদি হয় এখানকার পানি তিনি মরলেও খেতে পারবেন না।
