সাজ্জাদ এখন আর হীটছে না। দাঁড়িয়ে আছে। কোন খালি রিকশা দেখলেই লাফিয়ে উঠে পড়তে হবে। খালি রিকশা দেখা যাচ্ছে না। হুস হুস করে কয়েকটা বেবীটেক্সি গেল। সবকটা যাত্রী বোঝাই। গীষ্মের প্রচণ্ড দাবীদাহের দিনে খালি রিক্সা খালি বেবীটেক্সি চলাচল করে না। প্রাইভেট গাড়ি, মাইক্রোবাস প্রচুর যাতায়াত করছে। হাত তুললে এরা কেউ কি থামবো? মনে হয় না। সাজ্জাদের মাথা এখন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করেছে। এটা সানস্ট্রোকের আগের ধাপ কিনা সে বুঝতে পারছে না। মাথার ভেতর বিজ বিজ করে কে যেন আবার কথাও বলছে–কবিতার লাইন।
সন্ন্যাসী উপগুপ্ত
মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে
একদা দিলেন সুপ্ত।
ক্লাস সিক্সে বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণীর দিন আবৃত্তি করার জন্যে এই দীর্ঘ কবিতাটি সে মুখস্থ করেছিল। উৎসবের দিন প্রথম তিন লাইন বলার পর কবিতা আর মনে পড়ে না। শত শত মানুষ তাকিয়ে আছে তার দিকে। উইংসের আড়াল থেকে বাংলা স্যার চাপা গলায় বললেন–কি হল! এই গাধা! সে তখন আবার গোড়া থেকে শুরু করল। তিন লাইন বলার পর আবার আটকে গেল। দর্শকদের ভেতর থেকে চাপা হাসি শুরু হল। বাংলা স্যার ক্রুদ্ধ গলায় বললেন,–এই গাধার বাচ্চা, চলে আয়। সে চলে না। এসে আবারো গোড়া থেকে শুরু করল। আবারো তিন লাইনে আটকে গেল। শুরু হল প্রচণ্ড হাসোহাসি। বাংলা স্যার উইংসের আড়াল থেকে এসে হাত ধরে হ্যাঁচকাটান মেরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরো কবিতাটা তার মনে পড়ল। এখনো যে কোন দুঃসময়ে ফাট করে কবিতাটা মাথার ভেতর চলে আসে। মাথার ভেতরে বসে কেউ একজন গভীর এবং ভারি গলায় পুরো কবিতা আবৃত্তি করেন।
এখনো আবৃত্তি শুরু হয়েছে। পুরো কবিতাটা শেষ না হলে তা বন্ধ হবে না। সাজ্জাদ দাঁড়িয়ে আছে। অসহায় মুখ করে কবিতা শুনছে–রোদ মনে হয় আরো বাড়ছে–রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে–
নগরীর দীপ নিবেছে পবনে,
দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে,
নিশীথের তারা শ্ৰাবণ গগনে
ঘন মেঘে অবলুপ্ত।
কাহার নুপুরশিঞ্জিত পদ
সহসা বাজিল বক্ষে…
সাজ্জাদ বাসায় এসে পোছল সাড়ে তিনটার দিকে। তার সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। মুখ শুকিয়ে এতটুক হয়ে গেছে। নীতু বলল, ভাইয়া, এ কি অবস্থা! সাজ্জাদ হাসিমুখে বলল, অবস্থা খুবই খারাপ। মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যে ইন্তেকাল করব। চার মাইল দূর থেকে হেঁটে হেঁটে এসেছি।
আগামীকাল তোমার ইন্টারভিউ, মনে আছে?
আগামীকালেরটা আগামীকাল দেখা যাবে। তিন বোতল ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আয়।
গতকাল তোমার জন্যে থানায় জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে। বাবার ধারণা তোমাকে গুম খুন করা হয়েছে। বাবা খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন।
কথা বলে সময় নষ্ট করিস না নীতু। ঘরে কি বার্নল আছে?
বার্নল কি জন্যে?
গায়ে মাখব। সারা শরীরে ফোসফা পড়ে গেছে।
তুমি এই কদিন কোথায় ছিলে?
ব্যানানা গার্ডেন।
সেটা কোথায়?
সেটা হচ্ছে কলাবাগান। নীতু, দাঁড়িয়ে বকবক করিস না–পানি, জল, অম্বু…
তুমি যতই পানি পানি করে চেঁচাও তোমাকে এখন পানি দেব না। তুমি একটু নরম্যাল হও। ফ্যানের নিচে চুপ করে দাঁড়াও। এখন পানি খেলেই তোমার অসুখ করবে।
অসুখ করলে করবে। অসুখের চিকিৎসা আছে। মরে গেলে চিকিৎসার বাইরে চলে যাব রে নীতু।
সাজ্জাদ সোফায় গা এলিয়ে বসল। নীতু ট্রেতে করে পানির বোতল এবং গ্লাস এনে দেখে সাজ্জাদ ঘুমুচ্ছে। গভীর ঘুম। তাকে দেখে মনে হচ্ছে গত পাঁচ দিন সে ঘুমায়নি।
ভাইয়া, পানি এনেছি। পানি খেয়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমাও।
সাজ্জাদ চোখ মেলে নীতুকে দেখল, পানির বোতল-গ্লাস দেখল, আবার চোখ বন্ধ করে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়–ঝড়ের শব্দে। তখন বাড়ির সবাই ছোটাছুটি করে দরজা-জানালা বন্ধ করছে। শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে বাইরে। তাদের বাড়ির সামনের দীর্ঘদিনের পুরানো আম গাছ সশব্দে ভেঙে তাদের বাড়ির উপর পড়ল। জানালার ভাঙা কাচে নীতুর হাত কেটে গলগল করে রক্ত পড়তে লাগল। রান্নাঘরে কাজের বুয়া আটকা পড়ে গেল। ঝড় রান্নাঘরের দরজা চেপে ধরেছে। কাজের বুয়া প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেই দরজা এক ইঞ্চিও খুলতে পারল না। সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল–আফা গো! ও আফা! মইরা গেলাম গো আফা! হোসেন সাহেব অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলি উত্তেজনার দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না, ঝড়ের পরবর্তী ধাক্কাটার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
বৈশাখের ঝড়ের স্থায়িত্ব কম। ঝড় আসে, ছোট্ট একটা অঞ্চল। লণ্ডভণ্ড করে চলে যায়। সেদিনের ঝড় ঢাকা শহরের তেমন কোন ক্ষতি করল না— শুধু হোসেন সাহেবের বাড়িতে প্রবল একটা ছোেবল বসাল।
হোসেন সাহেবের স্থান হল সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালে। তার বিছানার পাশে সাজ্জাদ বসে আছে। সাজ্জাদের মুখ হাসি হাসি। তিনি ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকালেন। সাজ্জাদ বলল, আরাম করে একটা লম্বা ঘুম দাও তো বাবা।
তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন, আমার কি হয়েছে?
তোমার মায়োকাডিয়াল ইনফ্রাকশন হয়েছে। ঝড় দেখে ভয়ে তোমার পিলে চমকে গেছে। সেখান থেকে হার্ট এ্যাটাক।
ছেলে রসিকতা করছে কি-না। তিনি বুঝতে পারছেন না। হট এ্যাটাক কোন আনন্দজনক ব্যাপার না যে হাসিমুখে সংবাদটা দিতে হবে।
এটা কোন হাসপাতাল?
সোহরাওয়ার্দি হাসপাতাল। তোমাকে জায়গামতই এনে ফেলেছি। ভয় পাচ্ছ?
