মেয়েটি দেখতে সুন্দর। কথাবার্তা অতি মার্জিত। মোসাদ্দেক সাহেবকে সে বড় ভাইজান বলে ডাকে। সাজ্জাদ লক্ষ্য করল নুড সিটিং দেয়ার ব্যাপারে মেয়েটির ভিতরে কোনরকম লজ্জা বা সংকোচ নেই। সাজ্জাদ একজন অপরিচিত মানুষ। অপরিচিতের সামনে নিজেকে নগ্ন করার স্বাভাবিক লজ্জাও কণার ভেতরে পুরোপুরি অনুপস্থিত।
এক ঘণ্টার মত সিটিং-এর পর পাঁচ—দশ মিনিটের জন্যে বিশ্রাম দেয়া হয়। মোসাদ্দেক সাহেব এই সময়ে চা খান, সিগারেট খান। কণা তখন অতি দ্রুত শাড়ি নিজের গায়ে জড়িয়ে স্বাভাবিক গলায় গল্প করে। সাজ্জাদ মেয়েটির খাপ খাইয়ে নেয়ার শক্তি দেখে মোহিত হল। মেয়েটি তাকে সাজ্জাদ ভাই বলছে এবং এমনভাবে তার সঙ্গে কথা বলছে যেন আসলেই সাজ্জাদ তার ভাই।
বুঝলেন সাজ্জাদ ভাই, ঢাকা শহরে কত কিছু দেখলাম। আসল জিনিস দেখা হয় নাই।
আসল জিনিস কি?
চিড়িয়াখানা। আমি প্রতি সপ্তাহে একবার করে ওকে বলি–চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাও। সে খালি বলে, আচ্ছা আচ্ছা।
তোমার স্বামী পশু-পাখি পছন্দ করে না?
তার পছন্দ-অপছন্দ নাই। তার হল আলসি।
আলসি?
গ্রাম্য ভাষা বললাম। অলস, সে বড়ই অলস।
শব্দটা সুন্দর–আলিসি। যাই হোক, একদিন তোমাকে আর তোমার আলসী স্বামীকে চিড়িয়াখানা দেখিয়ে নিয়ে আসব।
সত্যি দেখাবেন?
মনে থাকলে দেখাব। আমার আবার কিছুই মনে থাকে না। যাদের কিছুই মনে থাকে না গ্ৰাম্য ভাষায় তাদের কি বলে?
বেভুইল্যা।
বেভুইল্যা?
হুঁ।
কণা হাসছে। সুন্দর করে হাসছে। সাজ্জাদ বলল, তুমি যে মডেল হয়ে সিটিং দাও তোমার স্বামী জানে?
জানিবে না কেন? সেই তো জোগাড় করল।
সে জোগাড় করে দিয়েছে?
হুঁ। তার ফার্মেসীর পাশে ছবি বিক্রির একটা বড় দোকান আছে–ঋতু গ্যালারী। ওদের সাথে কথাবার্তা বলে একদিন আমারে বলল, কাজ করবা?
আমি বললাম, হুঁ করব।
সে রাগী গলায় বলল, কি কাজ না শুনেই বললা–করব? আগে শোনা কি কাজ।
আমি বললাম, কাজ হল কাজ। কাজের আবার শোনা শুনি কি?
সাজ্জাদ বলল, কাজটা কি তোমার পছন্দ হয়েছে?
কণা হাসতে হাসতে বলল, না। পছন্দ না হইলেও তো করনের কিছু নাই। মানুষের পছন্দ-অপছন্দে দুনিয়া চলে না। দুনিয়া চলে তার নিজের পছন্দে। সেই পছন্দ ভাল লাগলে ভাল। ভাল না লাগলে নাই।
মোসাদ্দেক চোখের ইশারা করলেন। কণা তৎক্ষণাৎ গায়ের কাপড় খুলে টুলে গিয়ে বসল। তার মধ্যে কোন রকম বিকার, কোন রকম অস্বাভাবিকতা দেখা গেল না।
সাজ্জাদ মোসাদ্দেকের দিকে তাকিয়ে বলল, মোসাদ্দেক ভাই, আমি চললাম।
মোসাদ্দেক হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। তাঁর চোখ কণার দিকে। তাঁর হাতে পেনসিল এবং ব্লেড। কণার দিকে তাকিয়েই তিনি পেনসিলের মাথা কাটছেন। কোন রকম অসুবিধা হচ্ছে না।
রাস্তায় নেমে সাজ্জাদের মনে হল–ভুল হয়েছে, আরো কিছুক্ষণ মোসাদ্দেক সাহেবের সঙ্গে থাকলে হত। আলসি স্বামীর স্ত্রীটির সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল। আজকাল তার কি যে হয়েছে, কারো সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগে না। কথা বলে আরাম পাওয়ার একটা ব্যাপার আছে–সেটা হচ্ছে না।
তিনটার মত বাজে। বয়া বঁটা রোদ। বেশিক্ষণ এই রোদে হাঁটলে সানস্ট্রোক হবার কথা। সাজ্জাদের মাথা ঝিম ঝিম করছে। তার গায়ে কালো রঙের বুশ শার্ট। শার্টটা বাইরের সব উত্তাপ শূষে নিচ্ছে। তার গা দিয়ে রীতিমত ভাপ বেরুচ্ছে। সে অবশ্যি হাঁটছে মোটামুটি নির্বিকার ভঙ্গিতে। তাকে দেখে মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে, সে হেঁটে আনন্দ পাচ্ছে। দুদিকে কৌতূহলী চোখ ফেলে ফেলে সে এগুচ্ছে। দেখার মত দৃশ্য দুদিকে প্রচুর আছে।
সে ফার্মগেট ছাড়িয়ে চলে এসেছে। এখন রাস্তার দুপাশেই কৃষ্ণচূড়া গাছ। রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুল ফুটেছে। রোদের আগুন ফুল হয়ে ফুটেছে এরকম ভাবা যেতে পারে। কৃষ্ণচূড়া ফুল দেখতে দেখেতে চোখ যখন ধাঁধিয়ে যাচ্ছে তখন চোখ পড়ছে জারুল গাছে। গাছ ভৰ্তি থোকা থোকা নীল ফুল। কৃষ্ণচূড়া ফুল যদি আগুনের ফুল হয় তাহলে জারুল ফুলে হল জোছনার ফুল। এই দুই ফুল পাশাপাশি যেতে পারে না। নগর যারা পরিকল্পনা করেন তাদের অফিসে বেতনভুক কিছু কবি থাকা দরকার। কবিরা ঠিক করবেন কোথায় কোন গাছ হবে।
বড় নগরীর পরিকল্পনা করা হবে ঋতুর দিকে তাকিয়ে। নগরীর একটা অংশের নাম হবে বর্ষা নগর। সেই অংশে থাকবে শুধুই কদম গাছ। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কদম গাছ। বর্ষার প্রথম জলধারায় ফুটবে সোনালী ফুল–। আহা, কি দর্শনীয় হবে সেই নগর! সেই নগরে ছাতা নিষিদ্ধ। বৃষ্টির সময় ভিজে ভিজে সবাইকে যাতায়াত করতে হবে।
নগরীর একটা অংশের নাম হবে গ্ৰীষ্ম। সেই অংশে থাকবে শুধুই কৃষ্ণচূড়া। বৈশাখ মাসে মনে হবে নগরীতে আগুন ধরে গেছে।
সাজ্জাদের পানির পিপাসা পেয়ে গেল। পিপাসার ধরনটা ভাল না। সাধারণত পানির পিপাসা বুকের ভেতরে হয়–তাঁর পিপাসা সারা শরীরে হচ্ছে। কৃষ্ণচূড়া, কদম, জারুল কোন গাছই এখন তাকে আকর্ষণ করছে না। তার চোখে এখন একটা বাথটাবের ছবি ভাসছে। তার নিজের ঘরের বাথটাব। কানায় কানায় টলটলে পানিতে ভর্তি। তার উপর বরফের কুঁচি ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। বরফ ভাসছে। বাথটাবের পাশে ছোট্ট একটা টেবিল যার টপটা মার্বেল পাথরের। সেই টেবিলে পাশাপাশি দুটা পানির গ্লাস। বাথটাবের মত পানির গ্লাস দুটিও কানায় কানায় ভর্তি। বরফ চিনির দানার মত গুড়ো করে গ্লাসে দেয়া হয়েছে। গ্লাসের গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে।
