ভদ্রলোক ঢাকা আট কলেজ থেকে পাশ করা প্রথম ব্যাচের ছাত্র। শিল্পীর শোবার ঘরের দেয়ালে ছবি-টবি থাকার কথা। মোসাদ্দেক সাহেবের বাড়ির দেয়াল বলতে গেলে খালি। দেয়ালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের দু বছর আগের একটা ক্যালেন্ডার আছে। ক্যালেন্ডারের পাশে দামী ফ্রেমে বাঁধাই করা একটা চিঠি। চিঠিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিঠিটি লিখেছেন শিম্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। স্পেনের মাদ্রিদের এক হোটেলের প্যাডে গুটি গুটি হরফে লেখা চিঠি।
মোসাদ্দেক,
আমি আমার জীবনে অনেক অপদাৰ্থ দেখেছি–তোমার মত কাউকে দেখি নাই। অকর্মন্যতা, অলসতা এবং স্থবিরতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য, তা হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে আকর্মন্যতা ও অলসতাকে গ্লোরিফাই করা হয়।
তোমার আকর্মন্যতা আমাকে সত্যত পীড়া দেয়। মনে রাখবে, অব্যবহারে ইস্পাতের তৈরি অতি ধারালো যন্ত্রেও মরিচা ধরে।
বিশেষ আর কি। কিছুদিন যাবৎ শরীর ভাল যাচ্ছে না। দুর্বল পরিপাক যন্ত্রের ক্রিয়ায় কষ্ট পাচ্ছি।
ভাল থাক এবং গা ঝাড়া দিয়ে উঠা। ইতি–
বিষয়বস্তু ছাড়াও চিঠিটির আর একটি গুরুত্ব আছে–চিঠির শেষে ফাঁকা জায়গাটা শিলপাচার্য ফাঁকা রাখেননি। যে কলমে চিঠি লেখা হচ্ছিল সেই কলমের কয়েক টানে রাস্তার একটা স্কেচ করে দিয়েছেন।
মোসাদ্দেক সাহেব চিঠি বাঁধিয়ে রেখেছেন স্কেচটির জন্যে। তাঁর ধারণা, জয়নুল আবেদীনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজের মধ্যে এটি একটি। সৃষ্টিশীল মানুষ তার অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি কখনো খুব ভেবেচিন্তে করেন না। সেই সব কাজ হঠাৎ করে তৈরি হয়। কাজের শুরুতে তাঁরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না। মাদ্রিদের যে রাস্তার ছবিটি আঁকা হয়েছে সেই রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। দুজন তরুণী মেয়ে রাস্তা ধরে এগুচ্ছে। শিল্পী তাদের পিছনটা এঁকেছেন। একটি মেয়ে মুখ ফিরিয়ে তার বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করছে বলে তার মুখের কিছু অংশ ধরা পড়েছে।
মোসাদ্দেক সাহেব মাথার চুল টানতে টানতে ছবিটির দিকে তাকান এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, বড় মাপের একজন শিল্পী সামান্য জায়গায় কি অসাধারণ কাজ করতে পারেন। সামান্য কয়েকটি টানে শহরের রাজপথে প্রাণ সঞ্চার করতে পারেন। দুটি তরুণী মেয়ে হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে যাচ্ছে–মনে হচ্ছে তাদের সঙ্গে রাস্তাটাও হাসতে হাসতে এগুচ্ছে। রাস্তা যেন রাস্তা না, বহমান নদী। মোসাদ্দেক সাহেবের ইচ্ছা আছে–টাকা পয়সা হলে কোন একদিন মাদ্রিদে গিয়ে রাস্তাটা দেখে আসবেন। সেই সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
মোসাদ্দেক সাহেবের স্থায়ী কোন রোজগার নেই। রোজগারের চেষ্টাও নেই। বর্তমানে তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা তিনি রিকশা এবং বেবীটেক্সীর পেছনে চিত্রকলা নির্মাণে ব্যয় করছেন। কাজগুলি তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে করেন। এবং তঁকে প্রচুর মেধাও ব্যয় করতে হয়। ছবিগুলি এমন হতে হবে যেন ছবি দেখে কেউ বুঝতে না পারে একজন অত্যন্ত প্ৰতিভাবান এবং সম্ভাবনাময় শিল্পী ছবি এঁকেছেন। আনাড়ি কাঁচা হাতের শিল্পীর মত করে ছবি আঁকা খুব সহজ ব্যাপার নয়। মোসাদ্দেক সাহেব দুরূহ কাজটি তৃপ্তির সঙ্গে করেন। ছবি আঁকা শেষ হলে ইংরেজিতে লিখে দেন–Art by M. Hossain. মাঝে মাঝে by-এর জায়গায় লেখেন dy. b এবং d-এর মধ্যে মূর্খ শিল্পী যে ভুল করেন তাকেও তাই করতে হয়। ছবির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে কথাবার্তা লিখতে হয়। বেশির ভাগ বেবীটেক্সীতে লিখতে হয়–মায়ের দোয়া। বেবীটেক্সীওয়ালারা রিকশাওয়ালাদের তুলনায় বেশি মাতৃভক্ত। রিকশায় লিখতে হয় টিভি এবং সিনেমার চালু সংলাপ, যেমন–শান্তি নাই, থামলে ভাল লাগে, বিষয়টা কি?। মোসাদ্দেক সাহেব টিভি-সিনেমা কোনটাই দেখেন না। সংলাপ লেখার সময় বুঝতে পারেন বাজারে এখন কি চলছে। তিনি মাঝে মাঝে কিছু রসিকতাও করেন। যেমন এক টেম্পোত ছাদে উঠা নিষেধ লিখে দেয়ার কথা, তিনি লিখে দিলেন চাঁদে ওঠা নিষেধ।
এইসব কাজ ছাড়াও তিনি অর্ডার পেলে ন্যুড ছবি এঁকে দেন। নব্য ধনীদের জন্যে এইসব আঁকা হয়। ন্যুড মেয়েদের মুখ নব্য ধনীদের পছন্দসই কোন মুখের মত হতে হয়। ফিগারের জন্য তিনি মডেল ব্যবহার করেন। তাঁর পরিচিত তিন-চারজন মডেল আছে। খবর দিলে তারা আসে। ঘন্টা হিসাবে সিটিং দেয়। প্রতি ঘণ্টা পঁচিশ টাকা। খাওয়ার সময় খাওয়া-দাওয়া।
সাজ্জাদ মডেল দেখে ছবি আঁকার প্রক্রিয়াটা দেখার জন্যে মোসাদ্দেক সাহেবের কাছে এসে আটকা পড়ে গেল। গত চার রাত গরমে সিদ্ধ হয়ে সে মোসাদ্দেক সাহেবের সঙ্গে এক খাটে ঘুমিয়েছে। রাতে দোকান থেকে শিক কাবাব এবং নানরুটি এনে খেয়েছে।
মোসাদ্দেক সাহেব সারাদিনে একবেলা খান। সাজ্জাদকে তিনি বলেছেন, আমি কুকুর স্বভাবের মানুষ। কুকুর সারাদিনে একবার খায়–আমিও একবার খাই। তুমি আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারবে না–তুমি দুপুরে খেয়ে এসো। বিসমিল্লাহ হোটেলে গিয়ে বলবে–মনা মিয়া পাঠিয়েছে। তাহলে পয়সা দিতে হবে না। আমার খাতা আছে, খাতায় নাম তুলে রাখবে।
সাজ্জাদ হোটেলে যায়নি। চিনি—দুধবিহীন কাপের পর কাপ কড়া চা খেয়ে খিদে নষ্ট করেছে। প্রায় কুকুরের মতই হুমহাম শব্দ করে শিক কাবাব নানরুটি খেয়েছে। জীবনটাকে তার অনেক দিন পর অর্থবহ মনে হয়েছে।
মোসাদ্দেক সাহেবকে তার যেমন মনে ধরেছে–মোসাদ্দেক সাহেবের মডেলকেও মনে ধরেছে। মডেল মেয়েটির নাম কণা। মেয়েটির বছরখানেক আগে বিয়ে হয়েছে। স্বামী একটা ফার্মেসীতে সেলসম্যান। মাসে পনেরশ টাকা পায়। এক কামরার যে ঘরে তারা দুইজন বাস করে তার ভাড়া নাশ টাকা। বাকি ছয় শ টাকায় সংসার চলে না। কণাকে বাড়তি রোজগারের চেষ্টা করতে হয়।
