যতই আমি দূরে যেতে চাই ততই আসি কাছে
আমার গায়ে তাহার গায়ের গন্ধ লেগে আছে।
না, ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে কলেজ ম্যাগাজিনের কবিতা। তা ছাড়া গায়ে কখনো গন্ধ লেগে থাকে না। লাক্স সাবান দিয়ে গোসল করলেই গন্ধ ধুয়ে চলে যায়— গন্ধ যদি লেগে থাকার হয় তাহলে লেগে থাকে–মনে। কাজেই এই বিষয়টি থাক, বাবার ছাত্রীকে নিয়ে বরং একটা কিছু লেখা যাক।
আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়।
আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর
প্রথম প্রেমিকার কাছে।
আমার প্যান্টের পকেটে শাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র।
খুব যত্নে খামের উপর তিনি তার প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন।
কে জানে চিঠিতে কি লেখা–?
তার শরীরের সাম্প্রতিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা?
রাতে ঘুম হচ্ছে না, রক্তে সুগার বেড়ে গেছে
কষ্ট পাচ্ছেন হাঁপানিতে–এইসব হাবিজাবি। প্রেমিকার কাছে
লেখা চিঠি বয়সের ভারে প্রসঙ্গ পালটায়
অন্য রকম হয়ে যায়।
সেখানে জোছনার কথা থাকে না,
সাম্প্রতিক শ্বাসকষ্ট বড় হয়ে ওঠে।
প্রেমিকাও একটা নিদিষ্ট বয়সের পর
রোগভুগের কথা পড়তে ভালবাসেন।
চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন—
আহা, বেচারা ইদানীং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো…
মা-মা চেহারার এক মহিলা দরজা খুলে আশ্চর্য রকম মিষ্টি গলায় বললেন, কে? আতাহার হকচকিয়ে গেল। ফরিদা হক নামের একজন মহিলার যে ছবি মাথায় নিয়ে সে এসেছে–এই মহিলার সঙ্গে তার কোন মিল নেই। দরজা খুলেছেন মাথায় কাপড় দেয়া রোগা শ্যামলা একজন মহিলা, যার চোখ আশ্চর্য সুন্দর, গলার স্বর অদ্ভুত মিষ্টি। নিশ্চয়ই এই মহিলা ফরিদা হক না, অন্য কেউ। ফরিদা হকের দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়।
মহিলা আবার বললেন, কে?
জি, আমার নাম আতাহার। বাবা আমাকে পাঠিয়েছেন। আমার বাবার নাম রশীদ আলি।
ও, তুমি রশীদ স্যারের ছেলে। তোমার যখন তিন-চার বৎসর বয়স তখন তোমাকে দেখেছি। তোমার চেহারা তো একদম পালেট গেছে।
আতাহার বলল, জ্বি, তখন আমার দাড়ি ছিল না।
মহিলা খিলখিল করে হেসে ফেললেন। গলার স্বরের মত এই মহিলার হাসিও মিষ্টি।
এসো বাবা, ভেতরে এসো।
জ্বি না, আমি চলে যাব। আমার খুব জরুরী একটা কাজ আছে। বাবা আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন।
তুমি ভেতরে আস তো।
আতাহার ঘরে ঢুকল। সুন্দর ছিমছাম একটা বসার ঘর। বেতের চেয়ার। চেয়ারের কুশনগুলি ধবধবে পরিষ্কার। মেঝেতে কাপেট নেই। তবে মেঝে ঝকঝকি করছে। মনে হচ্ছে খালি গায়ে এই মেঝেতে শুয়ে বই পড়লে খুব আরাম হবে–
বাবা, তুমি ফ্যানের নিচে এই চেয়ারটায় বস তো। ঘোমে একেবারে নেয়ে গেছ। সরবত বানিয়ে দেই–সরবত খাবে?
জ্বি না, আমি সরবত খাই না।
আজকালকার ছেলেরা চা ছাড়া আর কিছু খেতে চায় না–অথচ গরমের মধ্যে তেতুলের সরবতের মত ভাল জিনিস আর কিছু নেই। একটু তেতুলের সরবত করে দেই? তেতুল ভিজানো আছে।
আমি টকা খাই না। আমার পেটে আলসার আছে।
তাহলে ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি খাও। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। ইশ, কি ঘামা ঘেমেছ!
ভদ্রমহিলা পানি আনতে গেলেন। আতাহারের আগে তৃষ্ণা পায়নি–কিন্তু চিঠির জন্যে পকেটে হাত দিয়ে তৃষ্ণা পেয়ে গেল। পকেটে চিঠি নেই। পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করার সময় নির্ঘৎ পড়ে গেছে। কি সর্বনাশের কথা! আতাহার এক চুমুকে পানির গ্লাস শেষ করে নিচু গলায় বলল, বাবার চিঠিটা হারিয়ে ফেলেছি। প্যান্টের পকেটে ছিল–মনে হয়। রাস্তায় কোথাও পড়ে গেছে।
ভদ্রমহিলা বললেন, হারিয়ে গেলে তো করার কিছু নেই। তুমি এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? হারিয়ে গেছে শুনলে স্যার রাগ করবেন।
জ্বি।
চট করে রেগে যাবার ব্যাপারটা অবশ্যি স্যারের মধ্যে আছে–যাই হোক, উনাকে বলার দরকার নেই যে তুমি চিঠি হারিয়ে ফেলেছ। বলবে আমাকে চিঠি দিয়েছ।
জ্বি আচ্ছা। আমি তাহলে যাই।
আরেকটু বসে যাও। গায়ের ঘামটা মরুক।
আতাহার গায়ের ঘাম মরার জন্যে অপেক্ষা করল না। জীবিত ঘাম নিয়েই বের হয়ে পড়ল। সাজ্জাদের খোঁজ বের করতে হবে। কোথায় সে ড়ুব মেরেছে কে জানে। সাজ্জাদকে সঙ্গে নিয়ে কয়েক দিনের জন্যে ঢাকার বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে। শহর আর ভাল লাগছে না।
সাজ্জাদ ভূতের গলির এক বাসায়
গত চার দিন ধরে সাজ্জাদ ভূতের গলির এক বাসায় আছে। এই চার দিন দাড়ি-গোঁফ কামায়নি। তার মুখ ভর্তি খোচা খোচা দাড়ি। ব্রাশের অভাবে মাজা হয় নি বলে–হলুদ দীত। ঘুম মোটেই ভাল হচ্ছে না। ঘুমের অভাবে চোখের নিচে কালি পড়েছে।
তিন কামরার এই বাড়িটি হাফ বিলিডিং ছাদ টিনের। দিনের বেলা এই ছাদ তেতে আগুন হয়ে থাকে। টিনের বাড়িগুলির উত্তাপ রাতে কমার কথা। এখানে কমছে না, বরং বাড়ছে। শোবার ঘরে কয়েকটা জানালা। জানালায় তারের জালি দেয়া। মশা-মাছি আটকানোর জন্য তারের জালি–মশা-মাছির তাতে অসুবিধা হচ্ছে না। আটকে যাচ্ছে বাতাস। একফোটা বাতাস নেই।
বাড়ির মূল মালিক মোসাদ্দেক হোসেনের তাতে কোন অসুবিধা হয় না। ভদ্রলোকের নির্বিকার থাকার ক্ষমতা দেখে সাজ্জাদ বিস্মিত ও অভিভূত।
মোসাদ্দেক সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তার স্বাস্থ্য অসম্ভব ভাল। গাট্টাগোট্টা ধরনের চেহারা। অতি অস্পভাষী। তবে হাস্যমুখ। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে আছে। চুলটানা স্বভাব আছে। এক হাতে সারাক্ষণ মাথার চুল টানছেন। গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। এরকম কালো মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না।
