আতাহার একবার ভাবল বলে–কোন কাজকে ছোট ভাবা ঠিক না। ক্লাস নাইনে মুখস্থ করা রচনা আছে না। শুমের মর্যাদা। যে জাতি শ্রমের মর্যাদা দিতে জানে না সেই জাতির সামনে ভয়াবহ দিন–উদাহরণ বাংলাদেশ। কিছুই বলা হল না। আতাহার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রশীদ সাহেব বললেন, ঐ লোককে কত টাকা দিতে হবে?
দুই লাখ টাকা।
বলিস কি? এত টাকা! এইসব চিন্তা মাথা থেকে দূর করা। যার দেশে কিছু হয় না তার বিদেশেও হয় না। বুঝলি?
জ্বি।
এখন একটা কাজ কর–পত্রিকার অফিসে যা–একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে আয়। মনিকা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চায়। বিক্রি করে ঝামেলা চুকিয়ে দেই। উল্টাপাল্টা কথা তোর মাকে লিখেছে–ওর ফ্ল্যাটের ভাড়া না-কি খেয়ে ফেলেছি। নিজের বাবা প্রসঙ্গে এই বক্তব্য। ধরে চাবাকানো দরকার।
বিজ্ঞাপনটা কি লেখা আছে?
হ্যাঁ, লেখা আছে। আমার টেবিলের উপর আছে।
বিজ্ঞাপন ছাপাতে বাবা টাকা লাগবে।
টাকা তো লাগবেই। তোর মুখ দেখে তো আর বিজ্ঞাপন ছাপবে না। আয় টাকা নিয়ে যা।
আতাহার টাকা নেয়ার জন্যে বাবার পেছনে পেছনে গেল। রশীদ পাঁচটা একশ টাকার নোট দিলেন। বিরস মুখে বললেন, যা লাগবে দিয়ে বাকিটা আমাকে ফেরত দিবি।
জ্বি আচ্ছা।
পত্রিকা অফিস থেকে ফেরার পথে নাখালপাড়া হয়ে ফিরবি।
নাখালপাড়ায় কি?
আমার এক পুরানো ছাত্রী, ফরিদা নাম, তাকে এই চিঠিটা দিবি। তার হাতেই দিবি–অন্য কারো হাতে না। খামের উপরে ঠিকানা লেখা আছে।
জ্বি আচ্ছা।
আতাহার ঘর থেকে বের হয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মুক্তির আনন্দ পুরোপুরি পাওয়ার জন্যে চায়ের সঙ্গে বিদেশী একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। পকেটে টাকা আছে। খাওয়া যেতে পারে। আতাহারের বাধা চায়ের দোকান আছে। দোকানের মালিক ফরিদ আলির সঙ্গে তার বেশ ভাল খাতির। শুধু চা খাওয়া বাবদ ফরিদ আলি পঁচিশ টাকার মত পায়, এই নিয়ে আতাহারকে সে কখনো কিছু বলেনি। ভবিষ্যতেও কিছু বলবে মনে হয় না।
ফরিদ আলি আতাহারকে দেখে ক্যাশব্যাক্স ছেড়ে উঠে এল। আতাহারের সামনে বসতে বসতে বলল, খবরটা শুনে মনে বড় ব্যথা পেয়েছি আতাহার ভাই। আতাহার
আপনার ছোট ভাই নাকি পরীক্ষা দিতে পারে নাই। মাথা ঘুরে হলের মধ্যে পড়ে গেছে। ঘটনা কি সত্য?
ঘটনা সত্য তো বটেই। প্রশ্ন খুব সহজ ছিল। সহজ প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।
ফরিদ গম্ভীর গলায় বলল, হাসেন কেন ভাইজান? এটা তো হাসির কোন বিষয় না।
আতাহার বিরক্ত গলায় বলল, সহজ প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে এই ঘটনা যদি হাসিয়া না হয় তাহলে হাসির ঘটনা কোনটা? যাই হোক, আপনি আমার এখানে বসে প্যাঁচাল পারবেন না। আপনি ক্যাশবাক্সে গিয়ে বসুন। আর আমাকে চা দিতে বলুন। পিচ্চি পাঠিয়ে সিগারেট আনিয়ে দিন। বেনসন।
আপনি না-কি জাপান চলে যাচ্ছেন আতাহার ভাই?
হুঁ।
জাপানে গিয়ে কি করবেন?
ওদের ফুটপাত ঝাড় দিব। ঝাড়ুদার হব। আর কি করব?
জাপানের ফুটপাত ঝাড় দেয়ার মধ্যেও আনন্দ আছে ভাইসব। এইগুলা হল সোনার দেশ। ভাইজান, আমারেও সাথে করে নিয়ে যান। দোকান দিয়ে পুষে না। লোকসানের উপরে লোকসান।
অনেক পাঁচ্যাল পেরেছেন। এখন যান তো–আমাকে আরাম করে চা খেতে দিন।
এক কাপ চায়ে মেজাজটা ঠিক আসে না। প্রথম কাপ খেতে হয় সিগারেট ছাড়া। দ্বিতীয় কাপে সিগারেট ধরাতে হয়। আতাহার দেয়াশলাইয়ের জন্যে পকেটে হাত দিল। খামের চিঠিটায় হাত পড়ল। ইংরেজিতে সুন্দর করে নাম লেখা–Farida Hoque. বাবার হাতের লেখা সুবিধার না–এই নামটা বোধহয় যত্ন করে লেখা। কারণ কি কে জানে?
পুরানো ছাত্রীর সঙ্গে বাবার ব্যাপারটা কি আতাহারের মাথায় আসছে না। সাহস থাকলে চিঠিটা খুলে পড়ে ফেলা যেত। আতাহারের এত সাহস নেই।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার ব্যাপারেও ঘুষের ব্যাপার আছে। বিজ্ঞাপন ম্যানেজার বললেন, সাড়ে তিনশ টাকা লাগবে। বিজ্ঞাপন যেতে দেরি হবে, হেভী বুকিং। তবে ইয়ে, এক্সট্রা কিছু দিন–দেখি ইমিডিয়েট কিছু করা যায়। কিনা। আতাহার বলল, এক্সট্রা কত?
শখানিক দিন।
আতাহার বলল, পঞ্চাশ দিলে হয় না?
ঘুষের ব্যাপারে দরদাম করার দস্তুর আছে। দরদাম করে ঘুষ দিলে যিনি ঘুষ নেন তিনি ভাল বোধ করেন। ঘুষ নেয়ার লজ্জাটা কমে যায়।
পঞ্চাশ টকা ঘুষ দিয়ে আতাহার হৃষ্টচিত্তে রিকশায় উঠল। নাখালপাড়ায় যেতে হবে পিতার ছাত্রীর সন্ধানে। রিকশায় চড়ায় একটা রাজকীয় ব্যাপার আছে। মাথা সামান্য উঁচু করলেই আকাশ দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। গাড়ির যাত্রীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আকাশ দেখতে হলে তাদের অনেক ঝামেলা করে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকাতে হয়।
আকাশ বা ঝাঁঝাঁ করছে। চোখের দৃষ্টি পিছলে আসছে। এক-আধ টুকরা শাদা মেঘ হলে তাকিয়ে আরাম পাওয়া যেত। আতাহার তারপরেও দৃষ্টি নামালো না। ভাল না। লাণুক, তারপরেও চোখ থাকবে আকাশে। তার চোখ তো আর সাধারণ মানুষের চোখ না–কবির চোখ। এই চোখে সারাক্ষণ ছায়া পড়বে আকাশের।
রিকশায় ট্রেনের মত দুলুনি থাকলে কবিদের জন্যে ভাল হত। ছন্দ চলে আসত। আতাহার সিগারেট ধরানোর জন্যে দেয়াশলাই হাতে নিল। চলন্ত রিকশায় সিগারেট ধরানোরও আলাদা মজা আছে। বিরুদ্ধ বাতাসে আগুন জ্বালানো সহজ ব্যাপার না। একের পর এক দেয়াশলাইয়ের কাঠি নিভে যাবে। দেয়াশলাইয়ের কাঠির সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকবে। মনের ভেতর তৈরি হবে টেনশান–শেষ পর্যন্ত ধরানো যাবে তো? টেনশনেরও মজা আছে। আতাহারকে কোন টেনশনের ভেতর দিয়ে যেতে হল না—প্রথমবারেই সিগারেট জ্বলে উঠল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় কবিতার লাইন চলে এল।
