নীলু হেসে ফেলল। রফিক সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বলল, হাসপাতাল নিয়ে একটা জোক শুনবো? খুব হাসির।
ঘটনার উত্তেজনায় মনোয়ারা এখন খানিকটা ক্লান্ত। ডাক্তাররা ঘুমের ওষুধ দিয়েছে, তাতে ঘুম ঠিক আসছে না। ঝিমুনির মতো আসছে। নীলুকে ন তাঁর সঙ্গে নিয়ে শুয়েছেন। জেগে আছে নীলুও। কিছুতেই তার মনের పోప్గా এক সময় মনোয়ারা বললেন, বৌমা, ঘুমিয়ে পড়েছ?
জ্বি-না।
তোমার শ্বশুরের কাণ্ডটা দেখেছি? তার উচিত ছিল না হাসপাতালে থাকা? একটা মানুষ মরে যাচ্ছে, আর সে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। ছিঃ ছিঃ। বৌমা ঘুমিয়ে পড়লে?
জ্বি-না।
রফিক আছে তো?
জ্বি, বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছে।
ব্যাটাছেলে এক জন থাকা ভালো। কখন কী দরকার হয়, তাই না? হার্টের অসুখ।
জ্বি। আপনি ঘুমান মা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিই?
নীলু মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। অনেক দিন পর গভীর তৃপ্তি নিয়ে মনোয়ারা ঘুমুতে গেলেন।
সাত দিন হাসপাতালে
সাত দিন হাসপাতালে কাটিয়ে মনোয়ারা আজ বাড়ি ফিরবেন। এই উপলক্ষে রফিকের ইচ্ছা ছিল একটা নাটকের মতো করা। দরজার বাইরে লেখা থাকবে শুভ প্রত্যাবর্তন। ফুলটুল দিয়ে ঘর সাজানো হবে। রাতে ছোট্ট একটা ঘরোয়া গানের আসর। রফিক তার এক বন্ধুকে খবর দিয়েছে, সে সন্ধ্যাবেলায় এসে গজল গাইবে। এই জিনিসটির আজকাল বেশ প্রচলন হয়েছে। ঘরে ঘরে গজল।
কিন্তু অবস্থা গতিকে মনে হচ্ছে সেটা সম্ভব হবে না। ভোরবেলায় ভাবী এবং ভাইয়ার মধ্যে তুমুল ঝগড়া। এরা দুজন যে এভাবে ঝগড়া করতে পারে, তা রফিক কল্পনাও করে নি। এক বার ভেবেছিল ঝগড়ার ধাক্কাটা কমানোর জন্যে সে কিছু বলবে। শারমিন তাকে বেরুতে দেয় নি! ব্যাপারটা শুরু হয়েছে এভাবে।–অফিসের সময় শফিক যথারীতি কাপড় পরছে। কাপড় পরতে–পরতে বলল, এক কাপ চা দিতে পার নীলু?
নীলু চা এনে দিয়ে শান্তগলায় বলল, আজ মা হাসপাতাল থেকে ফিরবেন জানি বোধহয়।
হ্যাঁ, জানি। আমিও সকাল-সকাল ফিরব।
কোথায় যাচ্ছে তা জানতে পারি কি?
তোমার কথা বুঝতে পারছি না। রোজ যেখানে যাই, সেখানে যাচ্ছি।
অফিসে যাচ্ছ?
শফিক এই প্রশ্নের জবাব না-দিয়ে জুতো ব্ৰাশে অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়ল। নীলু বলল, কী কথা বলছি না কেন? অফিসে যাচ্ছ?
না।
কোথায় গিয়ে বসে থাক জানতে পারি?
আস্তে কথা বল, চেঁচাচ্ছ কেন?
তোমার চাকরি নেই, এই খবরটা আমাকে কেন অন্যের কাছ থেকে শুনতে হল? কেন তুমি বলতে পারলে না?
চাকরি নেই এই কথাটা তো ঠিক না। তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলেই আমি আগের জায়গায় ফিরে যাব।
ফিরে যাবে ভালো কথা। আমাকে কেন বলবে না?
কী মুশকিল, তুমি চেঁচাচ্ছ কেন?
চেঁচাব। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলব।
ঝগড়ার এই পর্যায়ে শারমিনের আপত্তি সম্পূৰ্ণ অগ্রাহ্য করে রফিক এসে বলল, ভাবী একটু শুনে যাও তো, খুব দরকার।
নীলু মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিল! শান্তমুখে ঘর থেকে বেরিযে এল। রফিক বলল, তোমার অফিসের গাড়ি অনেকক্ষণ হল দাঁড়িয়ে আছে। হর্ন দিচ্ছে। যাও, অফিসে যাও। এইসব কী হচ্ছে?
আজ অফিস যাব না।
সেই খবরটা গাড়িতে যারা আছে, তাদের দিয়ে আসতে হবে তো। নাকি তোমার একার জন্যে সবাইকে লেট করাবে?
নীলু খবর দিতে গেল, কিন্তু ফিরে এল না। শেষ মুহূর্তে মনে হল, বাসায় ফিরে কী হবে? এরচে অফিসে সময় কাটানোই ভালো। তার শাশুড়ি সন্ধ্যার আগে—আগে বাসায় আসবেন। তার আগে ফিরে এলেই হবে।
শফিক আজ প্রথম অফিসে গেল। বিনা প্রয়োজনে নয়, প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে টাকা তুলতে হবে। বাড়িভাড়া, হাসপাতালের খরচ–নানান ফ্যাকড়া। অফিসে ঢুকতে তার লজ্জা–লজ্জা লাগছে। নিজের অফিস, অথচ নিজের মনে করে আসতে পারছে না। অফিসের কর্মচারীরাও কেউ এই কদিন তার সঙ্গে দেখা করতে আসে নি। সিঁড়ির মাথায় সিদ্দিক সাহেবের সঙ্গে দেখা।
আরে শফিক সাহেব, আপনি? আসুন আসুন। আজ কেন জানি মনে হচ্ছিল। আপনি আসবেন।
তাই নাকি। আপনার যে সিক্সথ সেন্স ডেভেলপ করছে, তা তো জানতাম না সিদ্দিক সাহেব।
আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, তাই না? আপনার সামনেই আমি মুজিবুরকে ডেকে জিজ্ঞেস করছি। আধা ঘণ্টা আগে আমি মুজিবুরকে বলেছি যে আপনি আজ আসবেন। আসুন, আমার ঘরে আসুন। প্লিজ!
আমি একটু ক্যাশ সেকশনে যাব, কিছু টাকা তুলব।
ক্যাশ সেকশনের পাখা গজায় নি, পালিয়ে যাচ্ছে না। তা ছাড়া টাকা আপনি আমার ঘরে বসেও তুলতে পারবেন।
অফিসের খবর কী?
তদন্তের খবর জানতে চাচ্ছেন তো?
হ্যাঁ।
তদন্ত পরশু শেষ হয়েছে। সাহেবদের তদন্ত একটা দেখবার জিনিস রে ভাই। চা খেতে খেতে চার-পাঁচ জন লোককে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করল, ব্যাস, তদন্ত শেষ।
ফলাফল কী?
তাও তো জানি না। ব্যাটা কিছু বলে না। আমি গতকাল জিজ্ঞেস করলাম, সে বকের মতো ঠোঁট সরু করে বলল, এই খবরের জন্যে তোমার এত আগ্রহ কেন? ব্যাটার কথায় গা জ্বলে যায়। অফিসের খবরে আমার আগ্রহ থাকবে না? আপনি কী খাবেন, চা না কফি?
আমি কিছুই খাব না।
এসব বলে কোনো লাভ হবে না। খেতেই হবে। ক্যাশিয়ারকে ডাকাচ্ছি, টাকা-পয়সার ব্যাপার সেরে নিন। ইন্টারকমের ব্যাবস্থা হয়েছে, দেখেছেন? টলম্যান ব্যাটা দারুণ অ্যাকটিভ। ছ কোটি টাকার একটা নতুন প্লান্ট হচ্ছে। ঝাটার এক চিঠিতে হেড অফিস প্ল্যান স্যাংশন করে দিয়েছে।
কিসের প্লান্ট?
সালফিউরিক অ্যাসিড প্রান্ট। বাংলাদেশ গভর্নমেন্টের সঙ্গে জয়েন্ট কোলাবরেশন। সিক্সটি-ফোটি শেয়ার। সিক্সটি কোম্পানি, আর ফটি লোকাল গভর্নমেন্ট।
