ভালোই তো।
আমাদের জন্যে ভালো। কোম্পানি গ্রো করবে, আমরাও গ্রো করব।
সিদ্দিক সাহেব ইন্টারকমের বোতাম টিপে ক্যাশিয়ারকে আসতে বললেন। তার এক মিনিট পরই টলম্যান খবর পাঠাল–শফিককে যেন তার ঘরে পাঠান হয়। সিদ্দিক সাহেব মুখ বিকৃত করে বললেন, আপনি এসেছেন ব্যাটার কাছে খবর চলে গেছে। নাৎসি জার্মানির অবস্থা হয়েছে, বুঝলেন। জীবন অতিষ্ঠ। চারদিকে ব্যাটার স্পাই!
টলম্যান হাসিমুখে বলল, কেমন আছ শফিক?
ভালো আছি, স্যার।
অফিসে এসেছিলে কেন?
প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা কিছু তুলব।
তুলেছ?
না, এখনও তোলা হয় নি।
বস। আরাম করে বস। অফিসের খোঁজখবর কিছু রাখ?
না। তবে আজ কিছু শুনেছি। কোম্পানি বড়ো হচ্ছে।
হ্যাঁ! বড়ো হচ্ছে। বিগ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি। কিন্তু তোমাদের সরকারী অফিস কুমিরের মতো হাঁ করে আছে। সারাক্ষণ এদের মুখে কিছু-না কিছু দিতে হচ্ছে। হা হা হা। চা খাবে?
না।
তদন্তের রিপোর্ট জানতে চাও?
হাঁ, চাই।
তোমার কী ধারণা, বল। তুমি কি মনে কর, তদন্তে তোমাকে নির্দোষ বলা হবে?
আমার তাই ধারণা। আমি কোনো অন্যায় করিনি। এসবের কিছুই আমি জানি না।
যে এসবের কিছুই জানে না, অথচ যার সিগনেচার নিয়ে এত চুরি-জুয়াচুরি হয় সে কি বড়ো রকমের একজন অপদাৰ্থ নয়?
শফিক চুপ করে রইল। টলম্যান থেমে থেমে বলল, নিতান্তই অক্ষম ব্যক্তিদের এইভাবে ব্যবহার করা হয়। ঠিক না?
হ্যাঁ, ঠিক।
তদন্তে তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। যদিও আমি এবং তদন্ত কমিটির মেম্বাররা ভালোই জানি-অন্যায়টা তোমার করা নয়।
তদন্ত কমিটি দোষী ব্যক্তিদের বের করতে পারে নি, এটা কি কমিটির একটা বড়ো রকমের ব্যর্থতা নয়?
হ্যাঁ, ব্যর্থতা তো বটেই। বিগ ফেইলিয়ুর।
স্যার, আমি কি এখন উঠব?
না, একটু বস। আমি হাতের কাজ সেরে নিই। ধর দশ মিনিট।
ঠিক আছে স্যার, বসছি।
কিংবা আরেকটা কাজ করতে পার। যে কাজে এসেছিলে সেটা শেষ করে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
আর দেখা করে কী হবে?
কথাবার্তা বলব। আজ আমার কাজ করার মুড নেই। কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
শফিক বের হয়ে গেল। টলম্যান দুটি অর্ডারে সই করল। একটি হচ্ছে সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্টের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর হিসেবে শফিকের নিয়োগপত্র। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঢাকা জোনাল অফিসের জি. এম. পদে শফিকের পদোন্নতি।
তদন্ত কমিটি শফিকের কোন ত্রুটি ধরতে পারে নি। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে টলম্যান তার রিপোটে লিখেছে-সৎ এবং দক্ষ, এই দুই ধরনের গুণের সমন্বয় সাধারণত হয় না। শফিকের মধ্যে তা লক্ষ করেছি। বড়ো রকমের দায়িত্বপূর্ণ কাজ একে দেয়া যেতে পারে। তা ছাড়া শফিক আহমদের বিপুল জনপ্রিয়তাও আমি সর্বশ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে লক্ষ করেছি। কোম্পানির স্বার্থেই এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানো উচিত।
শফিক বাড়ি ফিরে যাবার আগে টলম্যানের সঙ্গে দেখা করতে গেল। সে নেই, লাঞ্চ করতে চলে গিয়েছে। টলম্যানের পি এ দুটি খাম এগিয়ে দিল। নরম গলায় বলল, বড়ো সাহেব আপনাকে দিতে বলেছেন। আর আপনার জন্যে এই চিঠি লিখে রেখে গেছেন। চিঠিটা আগে পড়তে বলেছেন।
শফিক চিঠি পড়ল। চিঠির রক্তব্য হচ্ছে আজ রাতে অবশ্যই তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে কোনো একটা ভালো রেস্তোরীয় খেতে যাবে। খাবার এবং পানীয়ের অর্ডার দেবার পর খাম দুটি খুলে পড়বে। আশা করি এর অন্যথা হবে না।
শফিক অফিসে বসেই খাম খুলে পড়ল। তার বেশ মন খারাপ হল। টলম্যান যেভাবে বলেছিল, কাজটা সেভাবেই করা উচিত ছিল। নীলুকত খুশি হত। আনন্দ একা ভোগ করা যায় না।
সিদ্দিক সাহেব বললেন, কী ব্যাপার, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছেন? স্যারের সঙ্গে দেখা হয় নি?
হয়েছে।
ব্যাটা কী বলল?
তেমন কিছু না।
শফিক একটা রিকশা নিল। যাবে মতিঝিল। নীলুর অফিসে। নীলুর অফিস এখনো দেখা হয় নি। নীলু আজ অফিসে গিয়েছে কিনা কে জানে। আজ হয়তো অফিসেই যায় নি। ঝগড়া-টগড়া করে বাসায় বসে আছে।
নীলু, অফিসেই ছিল। শফিককে ঢুকতে দেখে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কী ব্যাপার, তুমি
দেখতে এলাম তুমি কী কর না-কর। নিজের কিছু করার নেই, সময়টা তো কাটাতে হবে!
শফিক নীলুর সামনে চেয়ার টেনে বসল। পকেটে হাত দিয়ে হাসিমুখে বলল, সিগারেট খেতে কোনো বাধা নেই তো?
অফিসের অনেকেই কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছে। নীলুর কেন জানি খুব লজ্জা লাগছে। শফিকের হঠাৎ এখানে আসার কারণটা ধরতে পারছে না। সে চাপা গলায় বলল, সত্যি করে বল, কী জন্যে এসেছি।
তোমার যখন কাজকর্ম ছিল না, তখন তুমি আসতে না আমার অফিসে?
অকারণে যেতাম না, কোনো একটা কাজ নিয়ে যেতাম।
বেশির ভাগ সময়ই যেতে টাকার জন্যে, হঠাৎ টাকার দরকার হয়ে পড়লে তখন–
তুমি নিশ্চয়ই সেই উদ্দেশ্যে আস নি।
শফিক গম্ভীর হয়ে বলল, আমার উদ্দেশ্যও তাই। গোটা পাঁচেক টাকা দিতে পারবে?
শফিক হাসছে। সমস্ত রহস্য নীলুর কাছে এখন পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। ভালো খবর আছে। নিশ্চয়ই খুব ভালো খবর। আজ সকালে এই নাটকটা সে যদি না করত। বেচারা জানাতে চায় নি, কেন সে জোর করে জানল? জানাতে চায় নি লজ্জায় এবং অপমানে। সে স্ত্রী হয়ে স্বামীর লজ্জা এবং অপমানকে সবার সামনে প্রকাশ করে দিল। তার পরও এই লোকটি রাগ করে নি। ভালো খবরটি নিয়ে হাসি-মুখে এসেছে তার কাছে। রহস্য করার চেষ্টা করছে। রহস্য করার তার ক্ষমতা নেই। মোটেই জমাতে পারছে। না। নীলুর চোখ ভিজে উঠল।
