আছে অল্প।
চাপা ব্যথা, নাকি সূচের মতো ব্যথা?
চাপাব্যথা।
দেখি মা, জিব দেখি। হাঁ, হজমেরও অসুবিধা হচ্ছে। হাতের তালুকি খুব ঘামে?
একটু একটু ঘামে।
যা ভেবেছি তাই। তোমার কি মৃত্যুচিন্তা হয়? চট করে উত্তর দিও না, ভালো করে ভেবে বল।
এত দুঃখেও নীলু হেসে ফেলল। হোসেন সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, লক্ষণ বিচারটাই হচ্ছে আসল। ঠিকমতো লক্ষণবিচার করে একটা ডোজ দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। এই যে দেখ তোমার শাশুড়ির মেজাজ। এরও ওষুধ আছে। তিনটা ডোজ দিতে পারলে মেজাজ কনটোল হয়ে যাবে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে।
দিচ্ছেন না কেন তিনটা ডোজ?
দিলেই কি সে খাবে? তাকে চেন না তুমি? সকাল থেকে হৈচৈ করছে। দুপুরেও কিছু খায় নি।
কেন?
জানি না কেন। তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ তো মা। আমি এই ফাঁকে তোমার অসুখটা নিয়ে একটু ভাবি। এটা তো আর এ্যালোপ্যাথি না যে চোখ বন্ধ করে ব্রড স্পেকট্রােম এন্টিবায়োটিক দিয়ে দেব। লক্ষণ বিচার করতেই দুই-তিন ঘণ্টা লাগবে। বইপত্র দেখতে হবে। বড়ো কঠিন জিনিস মা হোমিওপ্যাথি। বড়ো কঠিন।
মনোয়ারার আজকের রাগের কারণ হচ্ছে-শাহানা সবাইকে কার্ড পাঠিয়েছে, তাঁকে পাঠায় নি। নিজের পেটের মেয়ে এই কাণ্ড কী করে করল? তিনি কি তাকে অন্যদের চেয়ে কম ভালোবাসেন? সবাই তাঁকে অপছন্দ করে কেন? অপছন্দ করার মতো কী আছে তাঁর মধ্যে?
নীলু দরজার কাছে এসে বলল, মা আসব?
আসতে ইচ্ছে হলে আস।
আপনি নাকি দুপুরে কিছু খান নি?
তাতে কি তোমাদের কোনো অসুবিধা হয়েছে? আমি খেলেই কী না-খেলেই কী?
খাবার গরম করে টেবিলে দিয়েছি মা।
খামোকা আগ বাড়িয়ে কাজ করতে যাও কেন? কে তোমাকে টেবিলে খাবার দিতে বলেছে?
নীলু বেশ কড়া করে বলল, আপনি মা শুধু—শুধু অশান্তি করেন, সবাইকে বিরক্ত করেন।
মনোয়ারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়ে তাঁর মুখের উপর এসব কী বলছে। এত সাহস এই মেয়ে পেল কোথায়? তিনি রাগে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, নীলু, এই ঘর থেকে বের হয়ে যাও।
এই প্রথম তিনি বৌমা না বলে নীলু বললেন। তাঁর মনে হল তাঁর চারপাশের ঘরবাড়ি থরথর করে কাঁপছে। চোখে তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। নীলু ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেলল। হোসেন সাহেব ডাক্তার আনতে ছুটলেন। ডাক্তার বলল, প্ৰেশার খুবই হাই। এক বার সোহরাওয়াদিতে নিয়ে যাওয়া উচিত।
সোহরাওয়াদি হাসপাতালে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করিয়ে নিল। এতগুলি ঘটনা ঘটল খুব দ্রুত। নীলু বলল, বাবা, রাতে আমি থাকব। যুগ্ম-আপনি পারছিনাক দিয়ে চলে যান। ডাক্তার তো বলেছেন ভয়ের কিছু নেই।
হোসেন সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, এত বড়ো একটা ঝামেলা, রফিক-শফিকের কোনো খোঁজ নেই। রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে মা।
ওরা বোধহয় এতক্ষণ এসে পড়েছে। ওদের গিয়ে খবর দিন।
যাচ্ছি। তোমার একা-একা খারাপ লাগবে না তো?
একা কোথায়? মা আছেন। তাছাড়া হাসপাতাল-ভর্তি রোগী।
রাতে তুমি ঘুমুবে কোথায়?
এক রাত না ঘুমুলে কিছু হবে না। বাবা, আপনারা একটা বেবি ট্যাক্সি নিয়ে চলে যান।
মনোয়ারা বেশ খুশি। তাঁকে নিয়ে যে এত বড়ো একটা হৈচৈ হচ্ছে, এই আনন্দে তিনি উৎফুল্ল। নীলুকে ডেকে এক বার বললেন, আত্মীয় সবাইকে তো খবরটা দেওয়া দরকার। কখন কী হয়! হাটের ব্যাপার।
হার্টের আপনার কিছু হয় নি, মা। খুব প্ৰেশার ছিল, তাতেই…
তুমি কি ডাক্তারদের চেয়ে বেশি জান? যা করতে বলেছি কর।
সবাইকে খবর দাও। ঢাকার বাইরে যারা, তাদের চিঠি দিয়ে দিও।
জ্বি আচ্ছা।
রফিক-শফিকের কাণ্ডটা দেখ তো! নিজের মা মরে যাচ্ছে, কোনো খেয়াল নেই।
এখনও খবর পায়নি।
তোমার কি ধারণা, খবর পেলেই ছুটতে—ছুটতে চলে আসবে? নিজের ছেলেদের আমি চিনি না? খুব চিনি।
নীলু তার শাশুড়ির পাশে বসে মৃদুস্বরে বলল, মা, আপনি আমার কথায় রাগ করে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। আমার কী যে খারাপ লাগছে!
বলতে-বলতে নীলুর চোখ ভিজে উঠল। গলা ভার-ভার হল। মনোয়ারা বিরক্ত গলায় বললেন, বলেছ ভালো করেছ। আমি দিনে এক হাজার কড়া কথা বলি, আর তুমি একটা বলতে পারবে না? কাঁদতে শুরু করবে না তো মা। গায়ের মধ্যে কুটকুট করছে। বিছানায় ছারপোকা আছে কিনা কে জানে। মুটুমি ঐ নার্সটাকে জিজ্ঞেস করে আস তো, বিছানায় ছারপোকা আছে কিনা।
নীলু বাধ্য মেয়ের মতো উঠে গেল। মনোয়ারা মনে মনে বললেন, আল্লাহ, তুমি আমার এই লক্ষ্মী বৌটাকে সুখে রেখা। কোনো রকম দুঃখ তাকে দিও না।
রফিক এল রাত নটার দিকে। নীলু অবাক হয়ে বলল, তুমি একা? তোমার ভাই আসে নি?
সকালে আসবে।
বল কী তুমি! সকালে আসবে মানে? অসুস্থ মাকে দেখতে আসবে না?
রফিক চুপ করে গেল। সে টিফিন কেরিয়ারে করে খাবার নিয়ে এসেছে। ভাত, কৈ মাছ ভাজা, ফুলকপির ভাজি।
খেয়ে নাও ভাবী। খিদে লেগেছে নিশ্চয়ই।
খিদে লেগেছে, কিন্তু খেতে ইচ্ছা করছে না। তোমার ভাইয়ের কি মন-টন বলে কিছু নেই?
সেটা ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে। আমাকে জিজ্ঞেস করে তো লাভ নেই।
তুমি এখানে আর রাত করে কী করবে? মাকে দেখে চলে যাও।
আমিও আছি তোমার সঙ্গে। হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকব। তুমি এক-একা রাত জগবে, তা হয় নাকি? একটা চায়ের দোকান দেখে এসেছি, সারা রাত খোলা থাকে। ঐখানে গিয়ে এক ঘণ্টা পরপর চা খাব আর হাসপাতালের বারান্দায় বসে মশার কামড় খাব। রাতটা ভালোই কাটবে।
