রফিক শেষ পর্যন্ত ঠিক করল শফিকের অফিসেই যাবে। ভাইয়ার আফসে গিয়ে টাকা চাওয়ার একটা সুবিধা আছে। ভাইয়া কখনো না বলবে ওঁঠা। সঙ্গে টাকা না থাকলে বলবে-ঘণ্টাখানিক পরে আয়। এই এক ঘণ্টায় কোনো-না কোনোভাবে সে ম্যানেজ করবেই।
রফিকের জন্যে বড়ো রকমের বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। শফিক অফিসে নেই। যে-ঘরটায় বসত, সেখানে অপরিচিত এক ভদ্রলোক বসে আছেন। তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, কাকে চাই?
শফিক সাহেবকে, এখানে বসতেন।
তাঁর সঙ্গে আপনার কী দরকার?
উনি আমার বড়োভাই।
ও আচ্ছা, আসুন, বসুন। এখানে।
ভদ্রলোক অতিরিক্ত রকমের ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সরু গলায় বললেন, আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ নেই?
যোগাযোগ থাকবে না কেন? আমরা তো একসঙ্গেই থাকি।
ও আচ্ছা।
ভদ্রলোক খুবই অবাক হলেন। তারপর যা বললেন, তা শুনে রফিকের মাথা ঘুরতে লাগল। কী সর্বনাশের কথা। শুনেও বিশ্বাস হতে চায় না।
ভাইয়াকে সাসপেণ্ড করা হয়েছে?
জ্বি।
তিনি অফিসে আসেন না।
জ্বি-না। আপনারা এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না?
জ্বি-না। এই প্রথম জানলাম। ভাইয়া খুব চাপা স্বভাবের মানুষ।
আমার বোধহয় এটা আপনাকে বলা ঠিক হল না। অফিসের আমরা সবাই ব্যাপারটায় খুব আপসেট।
ওর বিরুদ্ধে অভিয়োগটা কী?
বেশ কিছু অভিযোগ আছে।
আমার বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছে। কোনো রকম অন্যায় করার ক্ষমতাই ভাইয়ার নেই। নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে।
তা তো হচ্ছেই। অভিযুক্ত হবার জন্যে সব সময় কিন্তু অন্যায় করতে হয় না। নিন, সিগারেট নিন। চাখাবেন?
জ্বি-না। চা-সিগারেটকিছুই খাব না। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ঠাণ্ডা একাগ্রাস পানি খাওয়াতে পারেন?
নিশ্চয়ই পারি।
ভদ্রলোক কোন্ড ড্রিংক আনালেন। রফিক দীর্ঘ সময় ভদ্রলোকের সামনে বসে রইল। উঠে যাবার মতো শক্তিও তার নেই। এই বিশাল সমস্যার কি সমাধান হবে?
সে সেখান থেকে সরাসরি নীলুর অফিসে চলে গেল। নীলু কী একটা ফাইল নিয়ে খুব ব্যস্ত। চোখে চশমা। এই চশমা সে বাসায় পরে না। অফিসে এলে চোখে দেয়, তখন তাকে একবারেই অন্য রকম লাগে। নীলু হাসিমুখে বলল, কী খবর রফিক?
কোনো খবর নেই ভাবী। আমি যখনই আসি, তখনই দেখি তুমি কী ব্যস্ত। একটা দিন দেখলাম না তুমি কলিগদের নিয়ে জমিয়ে গল্প করছ।
কী করব, তুমি বেছে–বেছে কাজের দিনগুলোতেই শুধু আস। আজ কী ব্যাপার?
তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে ভাবী। চল, তোমাদের ক্যান্টিনে যাই।
এখানে বলা যাবে না?
না।
ক্যান্টিন পুরো ফাঁকা। চা পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ আওয়ার শুরু হবে। এখানে লাঞ্চ আওয়ারে চা হয় না। নীলু বলল, কী বলবে তাড়াতাড়ি বল। জরুরি কথার নাম দিয়ে তুমি যা বল, সেটা কখনো জরুরি হয় না।
এবারেরটা হবে।
বল, শুধু—শুধু দেরি করবে না।
তার আগে একটা হাসির গল্প শুনে নাও, ভাবী। এতে খারাপ খবর সহ্য করা সহজ হবে। গল্প হচ্ছে-এক লোক এক্সিডেন্ট করেছে। গাড়ি নিয়ে খাদে পড়ে গেছে। ট্রাফিক সার্জন বলল, তুমি গাড়ি নিয়ে খাদে পড়ে গেলে, ব্যাপারটা কি-
নীলু বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি কী বলতে এসেছ বলে চলে যাও।
ভাইয়াকে সাসপেণ্ড করা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে। তদন্ত কমিটি বসেছে, তদন্ত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ভাইয়া অফিসে যায় নি। ঘর থেকে বের হয়ে পার্কে-টার্কে কোথাও বসে সময় কাটাচ্ছে হয়তো।
নীলু হতভম্ব হয়ে গেল। অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
যা বলছি, ঠিক বলছ?
সব জিনিস নিয়ে কি ভাবী রসিকতা করা যায়?
এত বড়ো একটা ঘটনা, সে আমাকে বলবে না?
কী করবে বল, স্বভাব।
স্বভাব-টভাব কিছু না, এত দিন হয়েছে আমাদের বিয়ের, এখনও সে আমাকে দূরে-দূরেই রেখেছে। কেন, আমি কি এতই তুচ্ছ, এতই ফেলনা?
নীলু ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। ক্যান্টিনের বয়গুলি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, কী শুরু করলে এসব। তোমাদের এই জিনিসটা দুচোখে দেখতে পারি না। এটার মধ্যে কেঁদে ফেলবার কী আছে?
নীলু, চোখ মুছে বলল, না, কাঁদবার তো কিছুই নেই। খুব আনন্দের সৃংবাদ। মনিপুরী নাচ শুরু করলে তুমি বোধহয় খুশি হও।
রফিক হেসে ফেলল। লাঞ্চের আগেই নীলু ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে এল। শফিক নেই। হোসেন সাহেব মনোয়ারাকে নিয়ে খিলগাঁয়ে গিয়েছেন। টুনি, বাবলু স্কুল থেকে ফেরেনি। বাড়ি খা-খী করছে। বিকেল পর্যন্ত নীলু বিছানায় শুয়ে রইল। মাঝখানে শারমিন এক বার এসে জিজ্ঞেস করল, তোমার কি শরীর খারাপ ভাবী?
নীলু সে-কথার জবাব দিল না। তার আজ কথা বলতেই ইচ্ছা করছে না। শারমিন আবার বলল, কী হয়েছে ভাবী? নীলু তিক্ত গলায় বলল, প্লাজ, আমাকে বিরক্ত করবে না। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
ও সরি। তোমার কাডটা নাও।
কিসের কার্ড?
শাহানা পাঠিয়েছে। ভিউকার্ড।
টেবিলে উপর রেখে দাও।
শারমিন চলে যেতে গিয়ে আরেক বার জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে, বল। এস, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।
ডাক্তারের কাছে নেওয়ার মতো কিছু হয় নি।
এ বাড়িতে শরীর খারাপ বেশিক্ষণ শুষে থাকার কোনো উপায় নেই। হোসেন সাহেব তাঁর হোমিওপ্যাথির বাক্স নিয়ে এসে পড়লেন।
মা দেখি, উঠে বস তো।
আমার তেমন কিছু হয় নি, বাবা। মনটা শুধু খারাপ।
হোসেন সাহেব বিজ্ঞের হাসি হাসলেন।
মনখারাপও একটা অসুখ। সব অসুখের মূলে হচ্ছে এই অসুখ। ইংরেজিতে একে বলে মেলাংকলি। মনখারাপ সারাতে পারলে সব অসুখই সারান যায়। মাথাব্যথা আছে?
