এই যে শারমিন, এখানে বসে আছ? আসি আমার সঙ্গে।
কোথায় যাব?
এক গ্রেট পামিস্ট এসেছে। ভূত-ভবিষ্যৎ-বৰ্তমান সব ফড়ফড় করে বলে দেয়। তাকে হাত দেখাবে।
আমাকে বিরক্ত করবে না, একা থাকতে দাও।
সে কী! তুমি তোমার ভবিষ্যৎ জানতে চাও না?
না।
জানতে চাও না যে, স্বামীর সঙ্গে জীবন কেমন কাটবে?
কেমন কাটবে তা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তার জন্যে জ্যোতিষীকে হাত দেখাতে হবে না।
তোমার হয়েছে কী বল তো?
কিছুই হয় নি।
এটা তো সত্যি বললে না। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে। আমেরিকার চিঠি আসার পর থেকেই মেজাজ ফোর্টিনাইন।
শারমিন কড়া গলায় বলল, কী হয়েছে সত্যি জানতে চাও?
হ্যাঁ, চাই।
তাহলে এস আমার সঙ্গে, ঘরে এস। এখানে বলব না।
কী এমন কথা যে মন্দিরের ভেতর গিয়ে বলতে হবে। চল যাই।
শারমিন দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, বস এখানে।
রফিক বসল। তার বেশ মজা লাগছে। শারমিনের প্রচণ্ড রাগের কারণটা ধরতে পারছে না। রাগে শারমিনের মুখ লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে।
তুমি আমেরিকার চিঠিটা গতকাল আমাকে দিয়েছ।
হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে খাম খুলে তুমি চিঠি পড়েছি।
মুখবন্ধ খামই তোমাকে দিয়েছি।
তা দিয়েছ। কিন্তু খাম খুলে চিঠি পড়ে তারপর আবার মুখ বন্ধ করেছ।
এ-রকম সন্দেহ হবার কারণ?
কারণ খামের মুখ ভাত দিয়ে বন্ধ করা ছিল। আমেরিকা থেকে কেউ ভাত দিয়ে মুখ বন্ধ করে খাম পাঠায় না।
রফিক চুপ করে রইল। কথা সত্যি। শারমিন বলল, আমার চিঠি তুমি কেন পড়লে?
হাসবেণ্ড তার স্ত্রীর চিঠি পড়তে পারবে না?
নিশ্চয়ই পারবে। কিন্তু চুরি করে না।
আমার ভুল হয়েছে, এ-রকম আর হবে না।
শারমিন ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। শোকের এমন তীব্র প্রকাশ রফিক আগে দেখে নি। তার লজ্জার সীমা রইল না। সে নরম স্বরে বলল, শোন শারমিন, এই যে, তাকাও আমার দিকে।
প্লিজ, আমার সঙ্গে কথা বলবে না।
কথা না-বলে আমি থাকতে পারি না।
শারমিন জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেল।
বাবুলকে কোথাও পাওয়া গেল না। ছাদে ছিল, এখন নেই। আশেপাশে কোনো বাড়িতেও নেই। টুনি খুঁজে এসেছে।
সোভাহান বলল, থাক, বাদ দাও। আরেক দিন নাহয় আসব।
নীলু বলল, ঢাকাতেই থাকেন তো?
হ্যাঁ।
তাহলে নাহয় ছেলের জন্যেই আরেক বার কষ্ট করে আসুন। দেখে যান সে কেমন আছে!?
সে ভালোই আছে। ওকে নিয়ে আমি ভাবি না।
কাউকে নিয়েই ভাবেন না। এটা কোনো গুণ না দুলাভাই।
সোভাহান তার ঝুলির ভিতরে হাত দিয়ে প্লাস্টিকের সস্তা ধরনের একটা খেলনা বের এগিয়ে দিল টুনির দিকে। নীলু বলল, টুনিকে দিতে হবে না দুলাভাই। বাবলুর জন্যে এনেছেন, রেখে দিন, বাবলুকেই দেবেন।
সোভাহান হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতেই বলল, এইখানে তুমি একটা ভুল করলে নীলু এটা আমি টুনির জন্যেই এনেছি। দেখ, এটা একটা পুতুল। মেয়েরাই পুতুল খেলে। বাবলুর জন্যে আমি একটা পিস্তল এনেছি। নাও, এটা ওকে দিও।
নীলু বেশ লজ্জা পেল। সোভাহান হাসছে। নীলুর এই লজ্জা সে যেন উপভোগ করছে।
যাই, নীলু।
আমার কথায় কিছু মনে করবেন না, দুলাভাই।
যাদের আমি পছন্দ করি, তাদের খুব কড়া কথাও আমার ভালো ब्लाटुনা।
সোভাহান রাস্তায় নেমে গেল। নীলু অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তার খুব খারাপ লাগছে। শুধু—শুধু এতগুলি কঠিন কথা বলা হল। সে কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। ভেতর থেকে মনোয়ারা ডাকছেন, বৌমা, ও বৌমা।
কোন বৌকে ডাকছেন কে জানে। দুই ছেলের বৌকেই তিনি বৌমা ডাকেন–বড়ো বৌমা বা ছোট বৌমা নয়। কিন্তু এক জনের জায়গায় অন্য জন এলে রেগে আগুন হন। বিরক্ত গলায় বলেন-তোমাকে তো ডাকি নি বৌমা। তুমি এসেছি কেন?
এখন তিনি কাকে ডাকছেন কে জানে? নীলু ক্লান্ত পায়ে ভেতরে ঢুকল। মনোয়ারা বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর মুখ থাথম করছে।
আমাকে ডেকেছেন মা?
হ্যাঁ। কে এসেছিল?
আমার বড়ো দুলাভাই, বাবলুর বাবা।
আমাকে ডাকলে না কেন? আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে না যে! নাকি আমাকে তোমরা মানুষ বলে মনে কর না।
আপনি শুয়ে ছিলেন, তাই।
শুয়ে ছিলাম–মরে তো যাই নি? নাকি তোমার ধারণা মরে গিয়েছি?
ছিঃ মা, কী বলছেন এসব!
আত্মীয়স্বজন এলে দেখাসাক্ষাতের একটা ব্যাপার আছে!
তা তো আছেই।
ঠিক আছে মা, তুমি যাও। বেশি দিন বেঁচে থাকার এইটাই সমস্যা। কেউ মানুষ মনে করে না। মনে করে ঘরের আসবাবপত্র। ছিঃ ছিঃ! ছিঃ ছিঃ। দাঁড়িয়ে আছ কেন, যাও।
মনোয়ার রাগ করে রাতের বেলা ভাত খেলেন না।
বায়োডাটা দিয়ে চাকরির দরখাস্ত
রফিকের আজ হঠাৎ করে তিন শ টাকার দরকার হয়ে পড়েছে। বায়োডাটা দিয়ে চাকরির দরখাস্ত করবে জাপানের এক ফার্মে। দরখাস্তের সঙ্গে ওদের দশ ডলার পাঠাতে হবে। দশ ডলার কেনার জন্যেই টাকাটা দরকার। ব্যাপারটা হয়তো পুরোপুরি ভাঁওতা। তবে কোম্পানিটা বিদেশি। বিদেশিরা এতটা চামার নাও হতে পারে। হয়তো সত্যি-সত্যি কিছু হবে।
মুশকিল হচ্ছে তিন শ টাকার জোগাড় এখনো হয় নি। নীলুর কাছে চেয়েছিল। নীলু দিতে পারে নি। পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেছে, বেতন পেলে বাকিটানিও। টাকা আমার কাছে কিছু ছিল, বাবা নিয়ে নিয়েছেন। রফিক বিরক্ত হয়ে বলেছে, বাবার আবার টাকার দরকার কী?
তোমার দরকার থাকলে তাঁরও থাকতে পারে।
তাঁর তো পেনশনই আছে।
পেনশনের টাকার সবটা তোমাকে দিয়ে দিতে হয়।
রফিক রীতিমত চিন্তায় পড়ে গেল। শারমিনের কাছে হয়তো কিছু টাকা আছে, কিন্তু এখন চাওয়া যাবে না। কথাবার্তা পুরোপুরি বন্ধ। সামান্য এক চিঠি নিয়ে এই কাণ্ড। কত দিন এরকম চলবে কে জানে। রফিকের মাঝে-মাঝে মনে হয়, এ রকম আবেগপ্রবণ একটি মেয়েকে বিয়ে করে সে বোধহয় ভুল করেছে। তার জন্য দরকার ছিল হাসিখুশি ধরনের একটি মেয়ে, যে খুব রাগ করবে, আবার পরমুহূর্তেই সব কিছু ভুলে হেসে ফেলবে। রাত একটার সময় ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজতে যার কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু শারমিন মোটেই সে-রকম নয়।
