হ্যাঁ, থাকে।
তাকে ডেকে আনতে পারবে?
না, পারব না। বাবলুছাদে। আমি ছাদে যাই না।
যাও না কেন? ছাদে কি ভূত আছে?
আছে। দিনের বেলা থাকে না। রাতে আসে।
তাই নাকি?
ই। রাতের বেলা এরা ছাদে লাফালাফি করে।
তুমি শুনেছ?
হুঁ।
ভেতর থেকে নীলু বলল, কার সঙ্গে কথা বলিস রে? টুনি বলল, সোভাহানের সঙ্গে। এই কথায় লোকটি শব্দ করে হেসে উঠল। নীলু পর্দার ফাঁক দিয়ে বসার ঘরের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে বিস্ময়। সে কঠিন গলায় বলল, আপনি কী মনে করে?
তোমাদের দেখতে এলাম। ভালো আছ নীলু?
আমাদের দেখতে এসেছেন?
হ্যাঁ।
দুলাভাই, আপনার অসীম দয়া। আমরা ধন্য হলাম।
কেন ঠাট্টা করছ নীলু?
ঠাট্টা? ঠাট্টা করব কেন? আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করবার মতো সাহস কি আমার আছে? আপনি হচ্ছেন মহাপুরুষ ব্যক্তি। সাধারণ প্রেম-ভালোবাসা আপনাকে আকর্ষণ করে না। আপনার ছেলে কোথায় আছে, কী করছে, তা জানারও আপনার আগ্রহ নেই। আপনার মতো মহাপুরুষকে ঠাট্টা করব?
বস নীলু বস আমার সামনে।
নীলু বসল না। তার রাগ সামলাবার চেষ্টা করতে লাগল। সোভােহান বলল, একসঙ্গে অনেকগুলি কথা বলে মনে হয়। হাঁপিয়ে গেছে।
চা খাবেন?
যদি দাও, তাহলে খাব।
নীলু রান্নাঘরে আসতে আসতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। এই লোকটির সঙ্গে রাগার।াগি করা অর্থহীন। রান্নাঘরের সামনে রফিক দাঁড়িয়ে আছে। সে কৌতূহলী গলায় বলল, কার সঙ্গে কথা বলছিলে ভাবী?
কারে সঙ্গে না।
স্বাগত ভাষণ? কিন্তু আমি যেন পুরুষের গলা শুনলাম।
আমার বড়ো দুলাভাই।
বাবলুসাহেবের গ্রেট ফাদার?
হ্যাঁ।
আমি কি ওনার সঙ্গে কথা বলতে পারি? মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার।
এটা আবার কী ধরনের কথা রফিক? তোমার কথা বলতে ইচ্ছে করলে তুমি কথা বলবে।
মেজাজ মনে হচ্ছে নট, গুড।
নীলু রান্নাঘরে ঢুকল! শুধু চা দিতে ইচ্ছে করছে না, অথচ ঘরে কিছু নেই। বিসকিটের টিনে আধা খানা বিসকিট, সেখানে পিঁপড়া ধরেছে। অথচ দুলাভাইকে শুধু চা দিতে ইচ্ছে করছে না। নীলু আনিসের খোঁজে দোতলায় গেল। আনিস নেই। বাবলু ছাদে একা একা কী যেন করছে। হাত-পা নাড়ছে। নিজের মনে বিড়বিড় করছে।
বাবলু।
কী?
কত বার বলেছি, জ্বি বলবে। একটা জিনিস ক বার বলতে হয়? যাও, নিচে যাও। তোমার আব্ৰা এসেছে। এক্ষুণি নিচে যাও। এই শার্টটা বদলে একটা ভালো শাট পরে যাও।
একটা মানুষ নেই, যাকে পাঠিয়ে দোকান থেকে কিছু আনাবে। এত দিন পর এসেছে মানুষটা, শুধু চা খাবে? নিজে গিয়ে নিয়ে এলে কেমন হয়? শফিক বাসায় নেই, নয়তো শফিককে বলা যেত। দুলাভাইয়ের সঙ্গে একটু আগেই খুব কড়া-কড়া কথা সে বলেছে। মনটা এই জন্যেই বেশি খারাপ লাগছে। এই দুঃখী মানুষটিকে সে খুব পছন্দ করে।
বসার ঘরে রফিক খুব জমিয়ে গল্প করছে। সোভাহান কিছু বলছে না। তবে তার মুখও হাসি—হাসি। রফিক বলল—
তারপর ভাই, কিছু মনে করবেন না, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি।–আপনি করেন কী?
কিছুই করি না।
বলেন কী। না-করলে আপনার চলে কী করে? আপনি কি সন্ন্যাসী? অবশ্যি তারাও তো কিছু একটা করেন। ভিক্ষা করেন।
আমি মানুষের হাত দেখে ভাগ্য বলি।
ভাগ্য বলেন?
হ্যাঁ।
আপনি একজন পামিস্ট?
জ্বি।
বিশ্বাস করেন এসব?
জ্বি-না। বিশ্বাস না করেও তো আমরা অনেক কিছু করি।
উদাহরণ দিন।
দেশের কিছু হবে না, এই জেনেও আমরা দেশের জন্যে জীবন দিয়ে দিই। দিই না?
গুড। আপনি তো ভাই ফিলাসফার কিসিমের মানুষ। নিন, আমার হাত দেখে নিন।
আজ থাক। আরেক দিন দেখব।
অসম্ভব, আজই দেখতে হবে। হাত দেখে শুধু বলুন-টাকা পয়সোহবে কিনা। আর কিছু জানতে চাই না। সুখ-টুখ কিছু আমার দরকার নেই, টাকা থাকলেই হল।
সোভাহান রফিকের হাতের দিকে তাকাল। মৃদুস্বরে বলল, বুধের ক্ষেত্র প্রবল। চন্দ্র শুভ মঙ্গলে আছে ত্রিভুজ চিহ্ন। আপনি অত্যন্ত ধনবান হবেন। তবে তা নিজের চেষ্টায় হবে না। হৃদয়রেখা থেকে একটি রেখা ভাগ্যরেখাকে স্পর্শ করেছে। কাজেই আপনি ধনবান হবেন স্ত্রীভাগ্যে।
বেইজাতি কথা বলছেন ভাই।
স্ত্রীভাগ্যে ধন?
হ্যাঁ, তাই। একটু আগে বললেন আপনি হাত দেখায় বিশ্বাস করেন না, কিন্তু এখন এত জোরের সঙ্গে কথা বলছেন কেন?
জোর দিয়ে বলারই নিয়ম। যে হাত দেখাতে আসে, সে এতে মনে করে এই লোক বড়ো জ্যোতিষী।
তার মানে এটা হচ্ছে আপনার একটা ব্যবসায়িক চাল?
হ্যাঁ, তাই।
তাহলে আমি কি ধরে নিতে পারি যে নিজের ভাগ্যেও আমি বড়োলোক হতে পারব?
না, পারবেন না। আপনার যা হবার তা হবে স্ত্রীভাগ্যে।
আরে, আপনাকে নিয়ে তো মহা মুশকিল!
হাতে যেমন দেখছি তেমনি বলছি।
এক মিনিট দাঁড়ান, আমার স্ত্রীর হাতটা দেখে দিন। পালিয়ে যাবেন না যেন।
রফিক সাহেব, আজ থাক।
অসম্ভব। আজই দেখবেন। এক্ষুণি নিয়ে আসছি। যাব আর আসব।
শারমিন ভেতরের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে। গতকাল সকালে সে একটি চিঠি পেয়েছে। আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছে সাব্বির। চিঠির বিষয়বস্তু হচ্ছে নতুন জীবন কেমন লাগছে তাই জানতে চাওয়া এবং সে যে একটি চাকরি পেয়েছে, এই খবর জানানো। চিঠি পাওয়ার পর থেকে শারমিন অস্বাভাবিক গভীর। রাতে রফিকের সঙ্গে একটি কথাও বলে নি। রফিক একবার হাত ধরতেই ঝাঁকি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছে, হাত ধরবে না।
রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, হাত ধরব না কেন? এই হাত কি আমেরিকায় বন্ধক?
কী কুৎসিত কথা। এর জবাব দিতে ইচ্ছা করে নি। আজ বারান্দায় এক-একা বসে তার রীতিমতো কান্না পাচ্ছে। কাঁদতে পারলে মন হালকা হত, কিন্তু বাড়িটা এত ছোট যে কাঁদবার জন্যে গোপন জায়গাও নেই।
