শাহানা বলল, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে।
দুটা প্যারাসিটামল খাও। ব্যাগে আছে না? আমি পানি এনে দিচ্ছি।
শুধু পানি নয়, জহির একটা পানও নিয়ে এসেছে। মাইকে বলা হচ্ছে-ফ্লাইট নাম্বার বি জি ২০৭, কাঠমুণ্ডুগামী যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে। অদ্ভুত এক ধরনের উচ্চারণ। যেন অর্ধেক যন্ত্র এক জন মানুষ কথা বলছে। শাহানার মনে হল এই কথাগুলি সহজ স্বাভাবিকভাবে বলা যায় না?
তোমার গা তো বেশ গরম মনে হচ্ছে শাহানা।
জ্বর আসছে বোধহয়।
তোমার খুব বেশি খারাপ লাগলে না হয় বাদ দেওয়া যাক। এখন টিকিট ক্যানসেল করলে অবশ্যি পয়সাকড়ি কিছুই পাওয়া যাবে না।
শাহানা যন্ত্রের মতো বলল, ক্যানসেল করতে হবে না। চল যাই।
শাহানা বসেছে জানালার পাশে, এক বারও জানালা দিয়ে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। তার কেবলি ভয়, এই বুঝি সে বমি করে ফেলবে। বমি আসার আগে আগে মুখে। যেমন টকটক স্বাদ চলে আসে, সে-রকম চলে এসেছে। তার সামনের এক ভদ্রলোক সিগারেট ধরিয়েছেন, কী কুৎসিত কটু গন্ধ! শাহানার ইচ্ছে করছে এই টেকো লোকটার গালে ঠাস করে একটা চড় মারতে।
জহির বলল, খুব বেশি খারাপ লাগছে?
হুঁ।
প্ৰায় এসে গেছি। প্লেন নামতে শুরু করেছে। কান ভোঁ-ভোঁ করছে না?
হুঁ, করছে।
ঢোক গোল কমে যাবে।
ঢোক গিলতে পারছি না।
তাকাও জানালা দিয়ে। দেখ, প্লেনের চাকা নামছে। তুমি তো কিছুই দেখছিনা।
শাহানা ক্লান্ত গলায় বলল, পানি খাব।
জহির হোত ইশারায় এক জন এয়ার হোস্টেসকে ডাকল। কোনো লাভ হল না। এক্ষুণি প্লেন নামরো। ওরা তাই নিয়ে ব্যস্ত। নো ম্মোকিং সাইন বারবার জ্বলিছে। কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। সমানে সিগারেট টানছে। জহির এয়ার সেইফটির উপর একটি প্রবন্ধ পড়েছিল নিউজ উইকে। সেখানে বলা হয়েছে-এশিয়া মহাদেশের বিমানযাত্রীরা বিমান ভ্রমণের আইনকানুন ভঙ্গ করে এক ধরনের মজা পায়। যে সময় সিট-বেল্ট বাঁধার কথা, সে-সময় সিট-বেল্ট খুলে ফেলে। নো ম্মোকিং সাইন দেখলেই তাদের সিগারেটের পিপাসা পেয়ে যায়। তারা সবচে পছন্দ করে বিমানের করিডরে। হাঁটতে। যেন এটা প্লেন নয়, বাস।
প্লেন বেশ বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়ে ভূমি স্পর্শ করল। জহির হাসিমুখে বলল, এসে গেছি শাহানা। পৌঁছেই ডাক্তার ডাকব।
বড়ো হোটেলের নিয়মকানুনগুলি বেশ চমৎকার। দশ মিনিটের মাথায় ডাক্তার এসে উপস্থিত। কুড়ি মিনিটের মাথায় এলেন খোদ হোটেলের ম্যানেজার। পরনে হাফপ্যান্ট, কড়া লাল রঙের স্পোর্টস শার্ট। মুখভর্তি হাসি। সে হাসিমুখে যে কথা বলল, তা শুনে জহিরের মুখ শুকিয়ে গেল। রুগিণীকে হোটেলে রাখা যাবে না। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। জহির বলল, পেশেন্টকে হোটেলে রেখে চিকিৎসা হবে না?
না।
কেন?
কারণ হোটেল কোনো হাসপাতাল নয়।
তাহলে আমি অন্য কোনো হোটেলে চেষ্টা করতে চাই, যেখানে আমাকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে দেবে।
নতুন বিয়ে?
হ্যাঁ।
হানিমুন?
হ্যাঁ, বলতে পার। লেট হানিমুন।
আমার সমস্ত সহানুভূতি তোমার জন্যে। কিন্তু আমার উপদেশ শোন। আমি যে ব্যবস্থা নিচ্ছি, তা আমাকে নিতে দাও। বিশ্বাস কর আমি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আমি যত ঠাণ্ডা মাথায় একটি সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানও তা পারেন না! এ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে যাও, তাকে ভর্তি করিয়ে ফিরে এস।
জহির চুপ করে রইল। ম্যানেজার হাসিমুখে বলল, কী আমার কথায় আপসেট হচ্ছে নাকি? আমার পরামর্শ কিন্তু চমৎকার। স্ত্রীকে হাসপাতালে দিয়ে ফিরে এসে একটা হট শাওয়ার নাও, এবং দুটি বিয়ার খাও।
জহিরের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। শাহানা প্ৰায় অচেতন। জ্বর এক শ তিন পয়েন্ট পাঁচ। জহির শুকনো গলায় বলল, খুব বেশি খারাপ লাগছে?
শাহানা কাতর গলায় বলল, খুব খারাপ লাগছে।
নেপালের হাসপাতালটির অবস্থা খুবই মলিন। নোংরা, অপরিচ্ছন্ন। ফিনাইলের গন্ধের বদলে কেমন একটা টক গন্ধ। একটা ডেডবডি পড়ে আছে বারান্দায়। কেউ তার মুখ ঢেকে দেবার প্রয়োজনও বোধ করে নি। নীল রঙে ড়ুমো ড়ুমো মাছি মৃত মানুষটির উপর ভিনভন করে উড়ছে। জহিরের অন্তরাত্মা পর্যন্ত শুকিয়ে গেল। ডাক্তার ভদ্রলোক হেসে ইংরেজিতে বললেন, অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেছেন মনে হচ্ছে।
তা, কিছু ঘাবড়ে গেছি তো বটেই।
বাংলাদেশের হাসপাতাগুলি কি এর চেয়ে ভালো?
হ্যাঁ, ভালো। অনেক ভালো।
আমি যখন ছিলাম, তখন কিন্তু ভালো ছিল না।
আপনি বাংলাদেশে ছিলেন?
হ্যাঁ। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছি! আমাদের দেশে মেডিকেল কলেজ নেই। ডাক্তারি পড়তে হলে আমাদের বাইরে যেতে হয়।
রোগী ভর্তির ব্যাপারটি অতি দ্রুত শেষ হল। শাহানাকে নিয়ে যাওয়া হল কেবিনে। জহির বলল, আমি কি ঐ কেবিনে রাতটা কাটাতে পারি?
না, পারেননা।
হাসপাতালে কোথাও অপেক্ষা করতে পারি?
তা নিশ্চয়ই পারেন। আমার এই ঘরেই বসতে পারেন। তার কি কোনো প্রয়োজন আছে? আপনার কষ্ট হবে। প্রচণ্ড মশা।
না, আমার কষ্ট হবে না।
আপনার রাতের খাওয়া কি হয়েছে?
না, হয় নি।
আমি কিছুক্ষণ পর পাশের একটি হোটেলে খেতে যাব। পাশেই একটা
ভালো হোটেল আছে। ইচ্ছে করলে আপনি আসতে পারেন।
জহির বলল, তার আগে জানতে চাই, আমার স্ত্রীর চিকিৎসা কি শুরু হয়েছে।
এখনও শুরু হয় নি, হবে। থ্রোট কালচার করা হচ্ছে। হানিমুনে এসেছেন, তাই না?
