শফিক পা ঝুলিয়ে খাটে বসেছে। তার মুখ দেখে মনের আঁচ পাওয়া যায় না। তবু নীলুর মনে হল শফিক কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত।
নীলু বলল, শাহানার কাণ্ড শুনেছ?
না। কী কাণ্ড?
আজ জহিরকে নিয়ে কাঠমুণ্ড চলে গিয়াছে। কাউকে কিছু বলে নি। রফিক টুনি আর বাবলুকে নিয়ে ও বাড়িতে গিয়ে শোনে, কিছুক্ষণ আগে এযারপোর্ট রওনা হয়েছে।
ভালোই তো।
আমাদের কাউকে কিছু জানাল না কেন কে জানে। আসুক জহির, ওকে ধরব শক্ত করে।
টুনি, বাবলু ওরা কোথায়?
ছাদে। এখন ওদের ডাকাডাকি করবে না। বেরুচ্ছি। দেখলে আর রক্ষা থাকবে না, সঙ্গে যাবার জন্যে হৈচৈ শুরু করবে। তুমি কি এক কাপ চা খাবে?
না।
আচ্ছা শোন, তুমি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত নাকি? কেমন যেন অন্য রকম লাগছে তোমাকে?
না, চিন্তিত না।
এই শাড়িতে কি আমাকে ভালো দেখাচ্ছে?
হাঁ দেখাচ্ছে। কোথায় যাবে কিছু ঠিক করেছ?
আমার এক বান্ধবীর বাসা আছেনয়া পন্টনে, যাবে?
চল যাই।
নয়া পল্টনের বাসায় নীলুর বান্ধবীকে পাওয়া গেল না। তারা ঘরে তালা দিয়ে কোথায় যেন গিয়েছে। নীলুর অসম্ভব মন খারাপ হল।
শফিক বলল, অন্য কোথাও চল। তোমার আরো বান্ধবী আছে নিশ্চয়ই।
থাক, এমনি চল রাস্তায় একটু হাঁটি।
শফিক তাতেও রাজি। তারা কিছুক্ষণ হাঁটল। নীলু একটি মিষ্টি পান কিনল। রাস্তায় দু টাকা করে বেলি ফুলের মালা বিক্রি হচ্ছে। নীলুর একটা কিনতে ইচ্ছা হচ্ছে, আবার বলতে লজ্জাও লাগছে। আশ্চর্য কাণ্ড, নীলুকে অবাক করে দিয়ে শফিক বেলি ফুলওয়ালার দিকে এগিয়ে গেল। কত সামান্য ব্যাপার, অথচ এতেই নীলুর হৃদয় আবেগে পূর্ণ হল। তার মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীতে তার মতো সুখী মেয়ে আর একটিও নেই। তার ইচ্ছে করছে শফিকের হাত ধরে হাঁটতে। আজকাল ছেলেমেয়েরা কেমন সুন্দর হাত ধরাধরি করে হাঁটে। দেখতে ভালো লাগে। দিন বদলে যাচ্ছে। নতুন দিনের সবই যে ভালো তা নয়, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস ভালো।
শফিক বলল, আরো হাঁটবো?
তোমার হাঁটতে ভালো লাগছে না?
লাগছে।
জান, আজ শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে সকাল—সকাল চলে এসেছিলাম, এখন এত চমৎকার লাগছে!
হাসলে এই গম্ভীর মানুষটাকে এত সুন্দর লাগে! অথচ এই একেবারেই হাসে না।
নীলু নরম সুরে বলল, আমার একটা কথা শুনবে?
হ্যাঁ, শুনব।
চল না। আজ আমরা বাইরে কোথাও খাই। কোনো নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে। যাবে?
চল যাওয়া যাক।
তোমার মন থেকে ইচ্ছে না করলে থাক।
শফিক হেসে বলল, আমার ইচ্ছে করছে। টাকা আছে তো তোমার কাছে? আমার মানিব্যাগ ফাঁকা।
টাকা আছে। বেশি কিছু তো আর খাব না।
রেস্টুরেন্টে বসে নীলুর একটু খারাপ লাগল। বেচারি টুনিকে ফেলে একা-একা খাওয়া। সে হয়তো না খেয়ে বাবা-মার জন্য বসে থাকবে।
নীলু বলল, কিছু খাওয়ার দরকার নেই, চল বাসায় চলে যাই। বরং দুটো কোন্ড ড্রিংকের অর্ডার দাও, নয়তো এরা আবার কী ভাববে।
শফিক মেনু দেখে একগাদা খাবারের অর্ডার দিল।
নীলু বলল, এত কে খাবে?
টুনি খাবে। প্যাকেটে করে বাসায়নিয়ে যাব।
এটা ভালোই করেছ, টাকায় শর্ট পড়বে না তো? আমার কাছে তিন শ টাকা আছে।
শর্ট পড়লে কোটি খুলে রেখে দেব।
বলতে-বলতে শফিক শব্দ করে হাসল। খাবারগুলি চমৎকার। কিংবা কে জানে অনেক দিন পর বাইরে খেতে এসেছে বলেই হয়তো এত ভালো লাগছে। মাঝে মাঝে এমন এলে হয়। তা কি আর সম্ভব হবে? কতগুলি টাকা আজ দিতে হবে! হিসেবের টাকা।
শফিক বলল, চুপচাপ খােচ্ছ কেন, কথা বল।
কী বলব?
মজার মজার কিছু গল্প বল।
মজার গল্প বুঝি আমি জানি? তুমি বরং একটা গল্প বল।
শফিক কি একটা বলতে গিয়ে বলল না। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, খেতে ইচ্ছা করছে না।
কেন?
জানিনা। শরীরটা বোধহয় খারাপ। শরীর খারাপ, তাহলে এলে কেন? তোমার সঙ্গে কখনো আসা হয় না। সুযোগ হল একটা। নীলু দেখল, শফিক আবার হাসছে। কী চমৎকারই না তাকে লাগছে। গ্রে কালারের এই কোটটায় কী সুন্দর মানিয়েছে! নীলুর খুব ইচ্ছা করছে শফিকের কোলে একটা হাত রাখে। মজার কোনো একটা গল্প বলে শফিককে আবার হাসিয়ে দেয়। তার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে।
প্রথম প্লেনে চড়া
শাহানার এই প্রথম প্লেনে চড়া।
আকাশে ওড়বার মতো বিরাট একটা ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্যে যতটা উত্তেজিত হওয়া উচিত ততটা উত্তেজিত সে হচ্ছে না। অথচ প্রথম টেনে চড়ার উল্লাস তার এখনও মনে আছে।
প্রথম প্লেনে চড়া সেই রকমই তো হওয়া উচিত। তা না, কেমন যেন ভয়-ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে। তার সবচে মন খারাপ হল প্লেনের সাইজ দেখে। এত ছোট? সত্যি-সত্যি পাখির মতো লাগছে। শাহানা বলেই ফেলল, প্লেন এত ছোট হয়?
জহির হাসতে-হাসতে বলল, ছোট কোথায়, দ্য শ ত্ৰিশ জন যাত্রী যেতে পারে। বেশ বড়ো। দূর থেকে দেখছ তো, তাই এ রকম লাগছে।
খুব দূর থেকে তারা দেখছে না। বসে আছে ডিপারচার লাউঞ্জে। কী-একটা সমস্যা হয়েছে। প্লেন ছাড়তে এক ঘণ্টা দেরি হবে। সময় কাটানোর জন্যে চা-টা খাচ্ছে। যাত্রীরা।
জহির বলল, কিছু খাচ্ছ না কেন শাহানা?
ভালো লাগছে না। ঢোক গিলতে পারছি না।
সে কী! টনসিলাইটস নাকি?
জানি না। কাঠমুণ্ড না গেলে কেমন হয় বল তো? আমার একটুও যেতে ইচ্ছে করছে না।
এক বার পৌঁছে দেখ, ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে না। তোমার কি প্লেনে চড়তে ভয় লাগছে?
হুঁ।
ওটা কাটতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগবে। প্লেনত্রমণ হচ্ছে পৃথিবীতে সবচে নিরাপদ ভ্রমণ।
