রামেশ্বর বাবু কাগজের উপরে চোখ বুলিয়ে গেলেন। কিছু পড়লেন বলে মনে হল না।
ঠিক আছে, এখন যেতে পারেন।
তিনি নিজের চেয়ারে এসে পানের কোটা খোলামাত্র টলম্যানের চিঠি চলে এল যার রক্তব্য হচ্ছে-এই অফিস মনে করছে তোমার চাকরি অফিসের কল্যাণে আসছে না। সম্ভবত অফিসের কাজে তোমার মন বসছে না। কাজেই-। সার কথা চাকরি শেষ।
রামেশ্বর বাবুর জন্যে সুপারিশ নিয়ে অনেকেই গিয়েছিল টলম্যানের কাছে। সেই অনেকের এক জন হচ্ছে শফিক। টলম্যান হাসিমুখে বলেছে, দয়া দেখাবার কথা তুমি বলছি কেন? দয়া দেখাবে দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি। এটা কোনো দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। আমরা এদেশে টাকা কামাতে এসেছি। এই সহজ। সাধারণ সত্যটি তোমরা যত তাড়াতাড়ি পার ততই ভালো।
রামেশ্বর বাবু অনেক দিন এই র জন্যে কাজ করেছেন। কোম্পানির তাঁর প্রতি দায়িত্ব আছে।
উনি বিনা বেতনে চাকরি করেন নি। কাজেই কোম্পানির দায়িত্বের প্রশ্নটা কেন আসছে? এই ব্যাপারটি নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। তুমি অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করলে করতে পার। তোমাদের দেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি বল তো? সুন্দরবনের কথা খুব শুনছি। কীভাবে যাওয়া যায়?
টলম্যানের নোটটি শফিকের সামনে। এগারটা বাজতে এখনও দশ মিনিট। শফিক লক্ষ করল, তার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে।–যার কোনো কারণ নেই। সে চা দিতে বলল। না বললেও হত। টলম্যানের কাছে যাওয়া মানেই প্রথম এক কাপ চা খাওয়া। এই চা সে নিজে বানায়। পানি গরম করা থেকে দুধ চিনি মেশানো পর্যন্ত সে নিজেই করে। অধস্তন যে-মানুষটির জন্যে চা বানান হচ্ছে, সে অস্বস্তি বোধ করে। এটাও বোধহয় অফিস ম্যানেজমেন্টের একটা অঙ্গ।
আজ টলম্যান চায়ের কথা বলল না। ফুর্তিবাজের ভঙ্গিতে বলল, দুপুরে আজ তুমি আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবে। অসুবিধা আছে?
না স্যার।
কোনো একটা ভালো রেস্তোরাঁয় যাই চল। তুমি কি মদ্য পান কর?
না।
আমিও করি না, তবে কোনো স্পেশাল অকেশন হলে খানিকটা করি।
আজ কি কোনো স্পেশাল অকেশন?
না। স্পেশাল কিছু না। আর দশটা দিনের মতো সাধারণ একটা দিন। ভালো রেস্তোরী কি আছে এখানে? মেক্সিকান ফুড পাওয়া যায়?
না। তবে বড়ো হোটেলগুলি মাঝে মাঝে মেক্সিকান নাইট, স্প্যানিশ নাইট এইসব করে, তখন পাওয়া যায়।
চল, ভালো, একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাওয়া যাক।
আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন?
হ্যাঁ, বলব। খেতে-খেতে বলব।
খেতে-খেতে যে কথাগুলি টলম্যান বলল, শফিক তার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।
প্রায় দু বছর আগে আগস্ট ফিফটিনথ এক ব্যাচ ওষুধ তৈরি হয়েছিল, যা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বাতিল করে দেওয়া হয়। তোমার মনে আছে?
মনে নেই। কাগজপত্র দেখতে হবে।
কাগজপত্র আমার সঙ্গে আছে, তুমি দেখতে পার! তুমি ছিলে প্রডাকশান সুপারভাইজার, তোমার সই আছে।
সই থাকলে ঠিক আছে।
না, ঠিক নেই। কারণ কারখানার লগবুকে ঐ দিন ঐ তারিখে কোনো গুয়ারির কথা নেই। ঐ দিন কোনো ওষুধ তৈরি হয়। নি। নষ্ট করার প্রশ্নই ওঠে না।
শফিক তাকিয়ে রইল। টলম্যান ঠাণ্ডা গলায় বলল, তার তিন মাস পর তুমি আশি হাজার টাকার একটা চেক ইসু করেছ স্টোরের দুটি এয়ারকুলার কেনার জন্যে। সেই এয়ার কুলার কেনা হয় নি, চেক কিন্তু ভাঙানো হয়েছে।
শফিক কিছু বলল না। টলম্যান বলল, ঐ মাসেই তার দিন দশকের ভেতর মিডার্ন কার নামের এক এজেন্সিকে গাড়ি কেনা বাবদ অগ্রিম এক লক্ষ টাকা দেওয়া হয় ফরেন করেন্সিতে-ছ হাজার ডলার। মডার্ন কার বলে কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, ঐ ঠিকানারও কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি কিছু বলবে?
না।
কাগজপত্র সব নিয়ে এসেছি, দেখতে পার। প্রয়োজন বোধ করলে আমার সঙ্গে ডিসকাস করতে পার। তুমি কি দায়িত্ব অস্বীকার করতে চাও?
না। অস্বীকার করার পথ কোথায়?
দ্যাট্স রাইট, অস্বীকার করবার পথ নেই। এটা একটি জটিল চক্রান্ত। আমার ধারণা, তোমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। চিংড়ি মাছটা খাও, ভালো বানিয়েছে। এতটা স্পাইসি না করলেও পারত। আমার তো জিব পুড়ে গেছে।
টলম্যান রুমালে মুখ মুছল। চেয়ারে বুলিয়ে রাখা কোটের পকেট থেকে মুখবন্ধ একটা খাম বের করে এগিয়ে দিল শফিকের দিকে। সহজ গলায় বলল, সরি। আই হ্যাভ টুবি ক্রুয়েল ওনলি টু বি কাইণ্ড। তোমাকে আপাতত সাসপেও করা হল। পুরো তদন্ত হবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার।–তদন্ত হবে নিরপেক্ষ। চিঠিটা খুলে পড়। হাতে নিয়ে বসে আছ কেন?
শফিক চিঠি খুলল, মূল সাসপেনশন অর্ডারের সঙ্গে পেনসিলে টলম্যানের লেখা একটা নোট। নোটের ভাবাৰ্থ হচ্ছে, আমি খুবই দুঃখিত। এই ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে চেষ্টা কর।
শফিক অসময়ে বাড়ি ফিরেছে। নীলুও সকাল-সকাল এসেছে। তার শরীর ভালো লাগছিল না।–ছুটি নিয়ে এসেছে। শফিককে দেখে হঠাৎ তার মনটা ভালো হয়ে গেল। সে খুশি-খুশি গলায় বলল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল বাসায় এসে তোমাকে দেখব।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আচ্ছা চল না একটা কাজ করি, কোথাও বেড়াতে যাই। যাবে?
নীলুকে অবাক করে দিয়ে শফিক বলল, চল যাই। কোথায় যেতে bia?
সত্যি যাবে?
হ্যাঁ, যাব।
নীলু তৎক্ষণাৎ চুল বাঁধতে বসিল, শফিক যাতে মত বদলাবার সময় না। পায়। আগে এ-রকম হয়েছে, বেড়াতে যাবার জন্যে রাজি হয়ে শেষ মুহূর্তে বলেছে, আজ না গেলে হয় না? শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে।
