হ্যাঁ, তা তো করাতেই হবে।
হোসেন সাহেব প্ৰায় পনের মিনিট কথা বললেন। বীণা এর মধ্যে চা এবং জেলি-মাখানো টেস্ট বিসকিট নিয়ে এসেছে। চা খেতে-খেতে বীণার সঙ্গেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বললেন। হোমিওপ্যাথি জিনিসটা যে অসম্ভব জটিল, সেটা জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন। পাওয়ার ২০ এবং পাওয়ার ২০০-এর পার্থক্যটা কী, তাও বললেন। তাঁর আজ বড়ো আনন্দ হচ্ছে। এই আনন্দ পৃথিবীর সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলে ভালো হত। তাৰ্থকরা যাচ্ছে না। হাতের কাছে যে কজনকে পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরকেই আপাতত বলা যাক।
তিনি সারা দুপুর ভাবলেন, প্রথম রোজগারের টাকাটা দিয়ে কী করবেন। সবাইকেই একটা কিছু কিনে দিতে পারলে ভালো হত। সেটা বোধহয় সম্ভব নয়, তবু বিকেলে একবার নিউ মার্কেটে গিয়ে দেখা যেতে পারে। তিনি সাধারণত দুপুরে খানিকটা ঘুমান। আজমানসিক উত্তেজনায় ঘুমুতেও পারলেন না। শুয়ে—শুয়ে বিকাল পর্যন্ত হোমিওপ্যাথির বইয়ে লক্ষণ-বিচার চ্যাপ্টারটা দু বার পড়লেন। সন্ধ্যাবেলা নিউ মার্কেট থেকে সবার জন্য একটা করে কাঠ পেনসিল কিনে আনলেন।
মনোয়ারা তিক্ত গলায় বললেন, পেনসিল দিয়ে আমি কী করব?
লিখবো। আর কি করবে?
লেখালেখির কোন কাজটা আমি করি?
বেশ তো, লিখতে না চাও কান চুলকাবে।
মনোয়ারা রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন ঠিক তাঁর মতো একটি পেনসিল রহিমার মা ও পেয়েছে। সে বটিতে তার পেনসিলটি চাঁচতে চেষ্টা করছে।
হোসেন সাহেব অনেক রাত পর্যন্ত বসার ঘরে বসে রইলেন। ঐ ভদ্রলোক যদি খবর দিতে আসেন–সেটা শোনা দরকার। ওষুধ দিয়েই কর্তব্য শেষ এ-রকম ডাক্তার তিনি হতে চান না।
শাহানা একমনে কী-একটা বই পড়ছে। এত মনোযোগ দিয়ে যখন পড়ছে নিশ্চয়ই গল্পের বই। মাঝে মাঝে আবার চোখ মুছছে। চোখ মোছার দৃশ্যগুলি দেখতে হোসেন সাহেবের বড়ো ভালো লাগছে। এত সুন্দর হয়েছে মেয়েটা। মনেই হয় না। তাঁর মেয়ে, যেন অচিন দেশের কোনো এক রাজকন্যা পথ ভুলে এ বাড়িতে এসে পড়েছে। টাঙ্গাইলের সাধারণ একটি সূতি শাড়ি পরে বসে আছে তাঁর সামনে। আবার যেন কিছুক্ষণ পরই চলে যাবে।
ও শাহানা!
কি বাবা?
এত মন দিয়ে কী পড়ছিস? গল্পের বই?
হুঁ।
বই পড়তে পড়তে কেউ এত কাঁদে? গল্পটা কী রে?
শাহানা বই থেকে মুখ না তুলেই বলল, একটা মেয়ে একই সঙ্গে দুটি ছেলেকে পছন্দ করে। যখন যার কাছে যায়, তাকেই ভালো লাগে। এই নিয়ে গল্প।
হোসেন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ঐ কী অসম্ভব কথা! একই সঙ্গে দুটি ছেলেকে পছন্দ করবে। কীভাবে? আজেবাজে একটা কিছু লিখলেই হল?
শাহানা কপাল কুঁচকে বলল, বিরক্ত করো না তো বাবা, পড়ছি দেখছি କn1।।
হোসেন সাহেব চুপ করে গেলেন।
দেয়াল-ঘড়িতে বারটার ঘণ্টা পড়ল, তার মানে এখন বাজছে এগারটা। ঘড়িতে একটা ঘণ্টা কম পড়ে। রাত যখন ১টা হয় তখন আবার ঘণ্টা পড়ে বারটা।
খামোকা বসে আছ কেন বাবা, শুয়ে পড় না।
বসি খানিকক্ষণ। তোকে তো বিরক্ত করছি না।
কতক্ষণ বসে থাকবে?
তোর পড়া শেষ হোক, তারপর যাব।
আমি তো বাবা বই শেষ না করে উঠব না।
না উঠলে না। উঠবি, আমি কি উঠতে বলছি?
বাইরে ঝিঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। এবার বর্ষা অনেক দেরিতে শুরু হল। আজ আষাঢ়ের মাঝামাঝি, বর্ষণ হচ্ছে এই প্রথম।
শাহানা।
কি?
তোর বিয়ে যেন কবে, বিশে আষাঢ় না একুশে?
জানি না বাবা।
সে কি! নিজের বিয়ের তারিখ নিজে জনিস না?
তুমিও তো নিজের মেয়ের বিয়ের তারিখ জান না। আর একটি কথাও বলবে না। বাবা, প্লিজ!
আচ্ছা, বলব না। কত পাতা বাকি?
এই তো আবার কথা বলছি।
আর বলব না। জানালাটা বন্ধ করে দে, বৃষ্টির ছাঁট আসছে।
তুমি বন্ধ করে দাও না কেন? তুমি তো আর কিছু করছ না, বসেই আছ।
হোসেন সাহেব উঠে জানালা বন্ধ করলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হল, সোফায় পিঠ বাঁকা করে বসে থাকা এই অসম্ভব রূপবতী মেয়েটি এক দিন বুড়ি হয়ে যাবে। চুলে পাক ধরবে। চোখের কালো রঙ হবে ঘোলাটে। কী প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা! তাঁর মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, শাহানা আবার চোখ মুছছে।
ও শাহানা!
কি।
শব্দ করে পড় না। আমিও শুনি কী লিখেছে।
তোমার ভালো লাগবে না। বাবা। এটা আমাদের গল্প। তোমাদের না। ঠিক ঠিক, খুব ঠিক। সময় আলাদা করে রেখেছে তাদের দু জনকে। চেষ্টা করেও হয়তো একে অন্যকে ছুঁতে পারবে না। ঢালা বর্ষণ হচ্ছে বাইরে। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বড়ো সৌমার ঘরে টুনি জেগে উঠেছে। বাথরুম করবে। হয়তো। শোবার আগে ভালোমতো বাথরুম করিয়ে নিল রাত—দুপুরে ঝামেলা করতে হয় না।
নীলু টুনিকে কোলে করে বের হল। অবাক হয়ে বলল, রাতি-দুপুরে কী করছেন। বাবা?
কিছু না, এই বসে আছি। বৃষ্টির নমুনোটা দেখেছি মা? ভাসিয়ে দেবে। তুমি কি মা একটু কষ্ট করে–
হোসেন সাহেব কথা শেষ করলেন না। নীলু, শান্ত স্বরে বলল, দিচ্ছি। চায়ের সঙ্গে আর কিছু দেব?
এক স্লাইস রুটি দিতে পার যদি থাকে; মাখন দিও না। এই বয়সে মাখনটা সহ্য হয় না।
নীলু মুহূর্তের মধ্যেই চা-রুটি নিয়ে এল। মুখে একটি বিরক্তির রেখাও পড়ল না। ঠোঁট বাকল না। পরের ঘরের একটি মেয়ে কত যত্বই না করল! এই ঋণ তো কখনো শোধ হবে না। পবের বাড়ির একটি মেয়ের কাছে আকাশপ্রমাণ ঋণ রেখে তাঁকে মরতে হবে।
বৌমা, একটু বস না। এই দু মিনিট।
নীলু বসল। হোসেন সাহেব হাসিমুখে বলতে লাগলেন, গ্রামের বাড়িতে প্রথম বর্ষণে কত মাছ মেরেছি। প্রথম বর্ষণে কী হয় জান? মাছগুলি সব মাথা খারাপের মতো হয়ে যায়। পানি ছেড়ে শুকনোয় উঠে আসে, স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতরায়। কত কী যে করে!
