শারমিন কোনো জবাব দিল না।
তাদের অবাক করে দিয়ে নীলু গুনগুন করে উঠল, আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে। তার গলা তেমন কিছু আহামরি নয়।
কিন্তু তবু কী অপূর্বই শোনাল সেই গান!
অবাক হয়ে চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরিয়ে এল আনিস।
হোসেন সাহেব ফিসফিস করে বললেন, কে গাইছে? আমাদের বড় বৌমা? বড়ো মিঠা গলা তো আমার মার।
গাইতে গাইতে নীলু, শাড়ির আঁচলে তার চোখ মুছল। শারমিনের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। তার মন বলছে, আজকের এই চোখের জলে জীবনের সমস্ত দুঃখ ও বেদনা ধুয়ে-মুছে যাবে। সে হাত বাড়িয়ে রফিককে স্পর্শ করল। ভালবাসার স্পর্শ, যার জন্যে প্রতিটি পুরুষ হৃদয় তৃষিত হয়ে থাকে। রফিক তাকাল আকাশের দিকে। আহ, কী চমৎকার জোছনা। এত সুন্দর কেন পৃথিবীটা?
একটা অদ্ভুত কাণ্ড
আজ একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে।
হোসেন সাহেবের কাছে এক রোগী এসে উপস্থিত। সাফারি গায়ে লম্বা-চওড়া এক জন মানুষ। দরজা খুলতেই জিজ্ঞেস করলেন, ডাক্তার সাহেব কি আছেন? হোসেন সাহেব নিজেই দরজা খুলেছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, কোন ডাক্তার?
ডঃ হোসেন, হোমিওপ্যাথ। হোসেন সাহেবের বিস্ময়ের সীমা রইল না। কয়েক মিনিট বুঝতেই পারলেন না, কী করবেন কী বলবেন। শেষ পর্যন্ত রোগী এসে পড়েছে! রোগীদের সঙ্গে ডাক্তাররা কীভাবে কথা বলে, কে জানে? খুব বেশি খাতির করতে নেই বোধহয়। তাতে রোগী মনে করতে পারে ডাক্তারটা কিছু জানে না। আবার খুব গম্ভীর হয়ে থাকলে পরের বার আসবে না।
জ্বি ভাই, জ্বি। আমিই ডঃ হোসেন। বসুন, আরাম করে বসুন। চায়ের কথা বলে আসি।
না না, চা লাগবে না।
লাগবে। অবশ্যই লাগবে।
অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে তিনি চায়ের কথা বলতে গেলেন। ফিরে এলেন হোমিওপ্যাথির বাক্স নিয়ে। স্টেথিসকোপ একটা কেনা দরকার। থাৰ্মেমিটারটা নষ্ট। টুনি ভেঙেছে। এইসব যন্ত্রপাতি এখন দরকার। প্রেসার মাপুর ঐ জিনিসও কিনতে হবে।
অসুখটা কী, ভাই বলুন।
আমার কিছু না। আমার স্ত্রীর গলায় মাছের কাঁটা বিধেছে। সে বলল, হোমিওপ্যাথিতে নাকি এর ওষুধ আছে। আপনার সাইনবোর্ড দেখলাম। ভাবলাম
ভালো করেছেন, খুব ভালো করেছেন। এক্ষুণি, ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। কোনো অসুবিধা নেই। মাছের কাঁটা পালাবার পথ পাবে না। কী মাছ?
কৈ মাছ।
ও আচ্ছা, কৈ মাছ। ছোট কৈ না বড়ো কৈ?
ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বললেন, এসবও কি ওষুধ দিতে লাগে!
হ্যাঁ, লাগে। হোমিওপ্যাথি খুবই জটিল চিকিৎসা। মনে হয় সোজা। সোজা মোটেই না।
ভদ্রলোক ওষুধ নিয়ে যাবার সময় ওষুধের দাম এবং ভিজিট বাবদ দুটি চকচকে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে গেলেন। বিস্ময়ের উপর বিস্ময়। হোসেন সাহেব হড়বড় করে বললেন, গলার কাঁটাটা গেল। কিনা একটু খবর দিয়ে যাবেন। না গেলে কড়া ডোজের আরেকটা ওষুধ দেব।
হোসেন সাহেব লক্ষ করলেন, জীবনের প্রথম বেতন পেয়ে যেমন আনন্দ হয়েছিল, আজ তার চেয়েও অনেক বেশি আনন্দ হচ্ছে। চেঁচিয়ে সবাইকে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হল, বাসায় কেউ নেই। বড়ো বৌমা অফিসে, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। শাহানা গেছে তার কোনো বান্ধবীর বাড়ি। ছোট বৌমা এবং রফিকও নেই। হোসেন সাহেব নোট দুটি হাতে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন।
মনোয়ারার মেজাজ। আজ অন্য দিনের চেয়েও খারাপ। দাঁতের ব্যথা শুরু হয়েছে। রান্না করতে গিয়ে জেনেছেন, ঘরে লবণ নেই। রহিমার মাকে লবণ আনতে পাঠিয়ে তিনি রানাঘরে বসে আছেন। হোসেন সাহেবকে ঢুকতে দেখে চট করে জ্বলে উঠলেন।
এখানে কী চাও?
না, কিছু চাই না।
যাও, রান্নাঘর থেকে যাও। পুরুষমানুষকে রান্নাঘরে দেখলেই আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়।
হোসেন সাহেব ক্ষীণস্বরে বললেন, মাথায় রক্ত তো তোমার উঠেই আছে, নতুন করে আর কী উঠবে। বলেই তিনি অপেক্ষা করলেন না, অত্যন্ত দ্রুত বসার ঘরে চলে এলেন। এ-রকম একটা সুসংবাদ কাউকে দিতে না-পারার কস্টে তাঁর মন খারাপ হয়ে গেল। অবশ্য বাড়িওয়ালার বাসা থেকে বৌমার অফিসে টেলিফোন করা যায়। সেটাই বোধহয় সবচে নিরাপদ।
বীণা মেয়েটি বড়ো ভালো। দেখতে পেয়েই বলল, টেলিফোন করতে এসেছেন, তাই না চাচা?
হ্যাঁ, কী করে বুঝলে?
আপনি যখন লজ্জা—লজ্জা মুখে আসেন, তখনই বুঝতে পারি।
বীণা হাসতে লাগল। হোসেন সাহেব গলা নিচু করে বললেন, আমার এখন একটা টেলিফোন নিতে হবে। রোগী-টোগী আসছে। ওরা খোঁজখবর করে।
কিসের রোগী?
হোসেন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, হোমিওপ্যাথি করছি তো! জোন না তুমি? সাইন বোর্ড দেখ নি–এম. হোসেন! গলিটায় ঢুকতেই সাইনবোর্ড। নারকেল গাছে লাগানো।
টেলিফোনে নীলুকে পাওয়া গেল। নীলু উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, কোনো খারাপ খবর নাকি বাবা?
না, না, খবর সব ভালো। এমনি টেলিফোন করলাম। তুমি ভালো তে মা?
জ্বি, ভালো।
কাজের চাপ খুব বেশি নাকি?
না, খুব বেশি না।
আসার পথে একটা থামোমিটার নিয়ে এসে তো। থামোমিটার ছাড়া বড্ড অসুবিধা হচ্ছে। রোগীপত্র আসতে শুরু করেছে। আজ এক জন এসে কুড়ি টাকা ভিজিট দিল।
কুড়ি টাকা ভিজিট, বলেন কি বাবা!
না, মানে, কুড়ি টাকা দিতে চেয়েছিল, আমি দশ টাকা রাখলাম। এরচে বেশি রাখলে জুলুম হয়ে যায়, কী বল মা?
হ্যাঁ, তা তো হয়ই।
ডাক্তার হয়েছি বলে তো রোগীর চামড়া খুলে নিতে পারি না। কী বল মা?
জ্বি, তা তো ঠিকই।
আর শোন মা, ঐ সাইনবোর্ডটা বদলে একটা বড়ো সাইনবোর্ড করাতে হবে। এত ছোট অনেকের চোখে পড়ে না। বীণা তো দেখেই নি।
