শারমিন জবাব দিল না। রহমান সাহেব সিগারেট ধরালেন। কয়েক দিন ধরেই তিনি খুব সিগারেট খাচ্ছেন। প্রায় চেইন ক্ষোকার হয়ে গেছেন!
শারমিন বলল, আমি এখন উঠি বাবা?
এখনই উঠবে কী, বস একটু।
ভালো লাগছে না। বাবা। জ্বর-জ্বর লাগছে।
তিনি মেয়ের হাত ধরলেন। জ্বর নেই, গা ঠাণ্ডা হয়ে আছে।
শারমিন।
কি বাবা?
তিনি খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, একটা কথার ঠিক জবাব দাও তো মা। তাকাও আমার চোখের দিকে। তাকাও, তারপর বল!
শারমিন তাকাল তার বাবার চোখের দিকে। রহমান সাহেব থেমে থেমে বললেন, সাব্রিরিকে কি তোমার পছন্দ হচ্ছে না?
পছন্দ হবে না কেন? তাঁকে পছন্দ না করার মতো কিছু নেই।
আমিও তাই বলি। জমিলার মা বলল, তুমি গতকাল সারা রাত ঘুমেও নি। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছিলো।
ঘুম আসতে একটু দেরি হয়েছে। যা গরম!
আমাকে ডাকলে না কেন?
তোমাকে ডাকলে কী হত?
দুজনে মিলে গল্প করতাম।
আজ যদি ঘুম না আসে তোমাকে ডাকব। বাবা, এখন যাই?
আচ্ছা, যাও। জমিলার মা বলছিল, ছেলেপুলেরা নাকি তোমাকে খুব বিরক্ত করছে। বারান্দায় ছোটাছুটি করছে।
না, তেমন কিছুনা।
শারমিন নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে রইল। এবং এক সময় ঘুমিয়েও পড়ল। জামিলার মা তাকে জাগাল না। দুপুরে খাবার সময় রহমান সাহেব বললেন, ওর ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই, ঘুমুক।
পুলিশের ব্যাণ্ড পার্টি চলে এল তিনটায়। শারমিনের ঘুম ভাঙল ব্যাণ্ডের শব্দে। তারা বাজাচ্ছে আনন্দের গান, উৎসবের গান। কিন্তু তবু কেন বারবার চোখ ভিজে উঠছে? কেন বারবার মনে হচ্ছে চারপোশ অসম্ভব ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। কেন এত কষ্ট হচ্ছে?
দরজায় টুকটুক আওয়াজ হল। শারমিন ক্লান্ত গলায় বলল, কে?
আফা আমি।
কী চাও?
আপনার সাথে দেখা করতে আইছে।
কে?
ঐ দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক, রফিক সাব।
শারমিন চুপ করে রইল। তার এক বার ইচ্ছা হল বলে-ওকে চলে যেতে বল। কিন্তু সে কিছুই বলল না। জামিলার মা দ্বিতীয় বার ডাকল, ও আফু, আফা। শারমিন তারও জবাব দিল না। কিন্তু জামিলার মা নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেও নিচে নেমে এল।
ব্যাণ্ড পাটির চারদিকে সবাই ভিড় করে আছে। রহমান সাহেবও এতক্ষণ ছিলেন। একটু আগেই গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। বলে গেছেন শারমিন ঘুম থেকে উঠেই যেন কাপড় পরে তৈরি থাকে। সন্ধ্যার পর তাকে নিয়ে বেরুবেন।
রফিক ব্যাণ্ড পাটির বাজনা শুনছে খুব উৎসাহ নিয়ে। তার মুখ হাসি-হাসি। শারমিনকে আসতে দেখে সে এগিয়ে গেল।
শারমিন বল তো, কি গান বাজছে?
জানি না।
কাম সেপ্টেম্বর। আমার খুব প্রিয় গান।
তাই নাকি?
হুঁ! দারুণ মিউজিক। তোমার ভালো লাগছে না?
লাগছে।
আজ তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হল। আমি নিজেই এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম।
কী পরিচয় দিলে?
নিজের তো কোনো পরিচয় নেই। তোমার পরিচয়েই পরিচয় দিলাম। বললাম, আমি আপনার মেয়ে শারমিনের সঙ্গে পড়তাম।
শারমিন তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। রফিক হাসতে হাসতে বলল, একবার ভাবছিলাম বলি, আমি শারমিনের বন্ধু।
বললে না কেন?
সাহস হল না। যদি রেগে যান। উৎসবের দিনে তোমাকে এমন পেত্নীর মতো লাগছে কেন?
পেত্নীর মতো লাগছে?
হুঁ। চুলে চিরুণি পড়ে নি। চোখ লাল এবং বেছে বেছে সবচে ময়লা শাড়িটাই আজ পরেছ। আচ্ছা, তোমার কি একটাও ভালো শাড়ি নেই?
শারমিন বলল, তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজনা শোন। আমি এক্ষুণি আসছি। কাপড় বদলে আসছি। তোমার হাতে কি কোনো কাজ আছে?
না। কেন?
তোমাকে নিয়ে যাব এক জায়গায়।
কোথায়?
বলছি, বাস তুমি। চা খাবে?
হ্যাঁ, খাব। চায়ের সঙ্গে আর কিছু আছে?
দেখি আছে কিনা।
ঝাল কিছু। নো সুইটস।
শারমিন অতি দ্রুত কাপড় বদলাল। পাতলা একটা চেইন পরল গলায়। হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি পরল। একটা হ্যাণ্ডব্যাগ নিল হাতে।
জামিলার মা বলল, যান কই আফা?
একটা কাজে যাচ্ছি। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বল। ইয়াসিন আছে। না?
জ্বি আছে।
কোন সময় আইবেন আফা?
শারমিন তার জবাব দিল না! নেমে এল নিচে। তার মুখ অস্বাভাবিক বিবর্ণ।। যেন খুব বড়ো ধরনের কোনো একটা অসুখ থেকে সে উঠেছে। রফিকের মনে হল, শারমিন যেন ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না।
না, আমার শরীর ভালোই আছে। চল তুমি।
চা খাই নি তো এখনো, চা আসে নি।
চা পরে খাবে।
রফিক অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না; ব্যাণ্ড বাজছে। দলটিকে ঘিরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের হৈচৈ করছে। ওদের আনন্দের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ইলেকট্রিশিয়ানরা ব্যস্ত আলোকসজ্জা নিয়ে। আলোকসজ্জা শুরু হবে। আজ সন্ধ্যা থেকে।
গাড়ি পুরানো ঢাকা ছাড়িয়ে আসার পরপরই রফিক লক্ষ করল, শারমিন কাঁদছে। অত্যন্ত অস্বস্তিকর অবস্থা। কোথায় তারা যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কে জানে? দ্রাইভার নিজেও বেশ কয়েক বার তাকাল পেছনের দিকে। রফিকের সিগারেট ধরাবার ইচ্ছা হচ্ছে, কিন্তু কেন জানি ধরাতেও সাহস পাচ্ছে না।
রাফিক।
বল।
কটা বাজে দেখ তো?
চারটা দশ। কোথায় যাচ্ছি। আমরা?
শারমিন শান্তস্বরে বলল, আমি এখন তোমাকে কয়েকটা কথা বলব। তুমি শুধু শুনে যাবে, কোনো প্রশ্ন করবে না। ড্রাইভার সাহেব।
জ্বি আপা।
আপনি গাড়ি একটু আস্তে চালান।
জ্বি আচ্ছা।
কথাবার্তা যা শুনবেন, নিজের মধ্যে রাখবেন।
জ্বি আচ্ছা!
শারমিন ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। রফিক অপেক্ষা করতে লাগল।
রাফিক।
বল শুনছি।
তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছ?
