তিনি গোলাপ-হাতে নিচে নেমে এলেন।
রাতের বেলা তাঁর জ্বর এসে গেল। রফিককে যেতে হল ডাক্তারের খোঁজে। শাহানা কপীনা টিপে দিতে বসল।
শাহানা শাড়ি পরেছে। মনোয়ারা কামিজ পরার উপর কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। দু দিন পর বিয়ে হচ্ছে যে-মেয়ের সে ফ্রক পরে ধেইন্ধেই করবে। কেন?
শাড়িতে শাহানাকে অপূর্ব লাগছে। ঘরে আলো কম! কবির মামার চোখে আলো লাগছে বলেই বাতি নেভানো। খোলা দরজা দিয়ে সামান্য কিছু আলো এসে পড়েছে শাহানার মুখে। কী সুন্দর লাগছে তাকে! যেন এক জন কিশোরী দেবী।
শাহানা বলল, এখন কি একটু ভালো লাগছে মামা?
লাগছে। তোর বিয়ের ব্যাপারে কত দূর কি হল?
জানি না।
খামোকা এটা ঝুলিয়ে রেখেছে কেন বুঝলাম না। এসব তো ঝুলিয়ে রাখার জিনিস না।
শাহানা কিছু বলল না। কবির মামা বললেন, ছেলেটিকে পছন্দ হয়েছে তো?
শাহানা জবাব দিল না। খুব লজ্জা পেয়ে গেল। তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, লজ্জা পাস কেন? এক জন মানুষকে পছন্দ হয়েছে কি পছন্দ হয় নি, এটা বলার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই।
পছন্দ হয়েছে।
ভালো। যে কথাটা মনে আসে, সে কথাটা মুখেও আসতে পারে। এবং আসাই উচিত। তোর বরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ভালো ছেলে। সব সময় হাসছে।
সব সময় হাসলেই বুঝি ভালো ছেলে হয়?
হ্যাঁ, হয়। কুটিল মনের মানুষ সব সময় হাসতে পারে না। গম্ভীর হয়ে থাকে।
তুমিও তো সব সময়, গম্ভীর হয়ে থাক। তুমি কি কুটিল মনের মানুষ?
গম্ভীর হয়ে থাকি আমি?
হ্যাঁ।
কখনো হাসি না?
কবির মামাকে দেখে মনে হল, তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। শাহানা হাসতে শুরু করল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করল হাসির বেগ সামলাবার জন্যে, সেটা সম্ভব হল না। সে ছুটে চলে গেল বারান্দায়। বারান্দায় কিন্নরকণ্ঠের হাসি দীর্ঘ সময় ধরে শোনা গেল। টুনী যোগ দিল সেই হাসিতে, তারপর বাবলু। শিশুরা যাবতীয় সুখের ব্যাপারে অংশ নিতে চায়।
শারমিনের গায়ে-হলুদ
আগামীকাল শারমিনের গায়ে-হলুদ।
শারমিন আয়নার সামনে অনেকক্ষণ ধরেই বসে আছে। অয়নায় নিজেকে চেনা যাচ্ছে না। কোথায় যেন পড়েছিল, বিয়ের ঠিক আগে আগে সব মেয়েই অচেনা হয়ে যায়। তাদের চোখ হয় আরো কালো। চেহারায় সম্পূৰ্ণ ভিন্ন ধরনের ঔওফুল্য আসে। বিয়ে হবে-হবে মেয়েরা বারবার আয়নায় নিজেদের দেখে। কথাটা আংশিক সত্যি।। শারমিন আয়নায় নিজেকে চিনতে পারছে না, তবে আয়নার সামনে বসে থাকতে ও ভালো লাগছে না।
জামিলার মা এসে বলল, আপনারে ডাকে?
কে ডাকে?
বড়ো সাহেব।
বল, আসছি।
শারমিন নড়ল না। যেভাবে বসে ছিল ঠিক সেভাবেই বসে রইল। বাড়িভতি মানুষ! কিছুক্ষণ আগেই দুটি মেয়ে বারান্দায় ছোটাছুটি করছিল। শারমিন শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছে, তোমরা নিচে যাও কিংবা ছাদে যাও, আমার মাথা ধরেছে। বাবার উপর রাগ লাগছে খানিকটা। এক মাস আগে থেকে লোকজন দিয়ে বাড়ি ভর্তি করবার কোনো দরকার ছিল না। এবং এদের কাণ্ডজ্ঞানও নেই, এত দিন আগে কেউ আসে। অন্যের বাড়ি?
আফা।
শারমিন বিরক্ত মুখে তাকাল। জামিলার মা আবার এসেছে। তার মুখ হাসি-হাসি। ঠোঁট লাল টুকটুক করছে। গায়ের লালপেড়ে সাদা শাড়িটিও নতুন। বিয়ে উপলক্ষে সবাই নতুন শাড়ি পেয়েছে। দুটি করে শাড়ি। একটি সাধারণ লালপেড়ে সাদা শাড়ি, অন্যটি দামী শাড়ি।
আফা, আপনেরে ডাকে।
বলছি তো যাব।
বড়োসাবোচা লইয়া বইস্যা আছে।
শারমিন উঠে দাঁড়াল। এমন বিরক্তি লাগছে! শুধু বিরক্তি নয়, মাথাও ধরেছে। তীব্র ও তীক্ষ্ণ ব্যথা। চারটা প্যারাসিটামল খাওয়া হয়েছে ছ ঘণ্টার মধ্যে। যন্ত্রণা ভোঁতা হয়ে এসেছে, কিন্তু তবু মাঝে মাঝে চিড়িক দিয়ে উঠছে।
রহমান সাহেব চায়ের পট নিয়ে হাসিমুখে বসে আছেন। শারমিনকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, এমন একটা সাধারণ শাড়ি পরে ঘুরছি কেন মা?
শারমিন জবাব দিল না।
নাও, চা নাও।
চা খেতে ইচ্ছা করছে না।
ইচ্ছা না করলেও খাও! বাবাকে কম্প্যানি দাও! এখন তো আর আগের মতো তোমাকে পাব না।
পাবে, সব সময়ই পাবে। আমি সব সময় তোমার মেয়েই থাকব বাবা।
বলতে বলতে শারমিনের গলা ভারি হয়ে এল। রহমান সাহেব দেখলেন, শারমিন কাঁদছে। তিনি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। বাবার কাছে মেয়ের বিয়ে কোনো আনন্দের ব্যাপার নয়। বিয়ের দিনটি হচ্ছে বাবা-মার জীবনের গভীরতম বিষাদের দিন। এই বিষাদ ভোলবার জন্যেই আনন্দ ও উল্লাসের একটা ভান করা হয়। রহমান সাহেব গাঢ় স্বরে বললেন, মা-মনি, চা খাও।
শারমিন পেয়ালা হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই টুপ করে এক ফোঁটা চোখের জল পড়ল কাঁপে। রহমান সাহেব দৃশ্যটি দেখলেন। তাঁর নিজেরও ইচ্ছা করল। ছুটে কোথায়ও পালিয়ে যেতে। মানুষের বেশির ভাগ ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকে। ছুটে যেতে ইচ্ছা করলেও ছুটে যাওয়া যাবে না। তাঁকে বসে থাকতে হবে এখানেই।
শারমিন।
বল বাবা।
তোমাকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছি। মা।
শারমিন তাকাল।
পুলিশের ব্যাণ্ড পার্টি আনিয়েছি। গ্রাম থেকে অনেকেই এসেছে, ওরা খুশি হবে। ব্যাণ্ড পার্টির অনেক কায়দা কানুন আছে তো। এক জন ব্যাণ্ড মাস্টার থাকে, সে রুপো-বাঁধানো লাঠি নাড়াচাড়া করে। আমার নিজেরই দেখতে এমন চমৎকার লাগে!
রহমান সাহেব হাসলেন। হাসল শারমিনও।
ওরা কখন আসবে?
আজ বিকেলে আসবে। আবার কালও আসবে। কেমন হবে বল তো মা?
ভালোই হবে।
মোতারের সাহেব বলছিলেন ব্যাণ্ড না এনে সানাইয়ের ব্যবস্থা করতে। একটা স্টেজের মতো থাকবে, সেখানে বসে বসে সানাই বাজাবে। কাউকে সে-রকম পাওয়া গেল না। তা ছাড়া সানাই বড়ো মন খারাপ করিয়ে দেয়। মেয়ে বিয়ে এমনিতেই বাবা-মার জন্যে যথেষ্ট মন খারাপ করার মতো ব্যাপার, সেটাকে আর বাড়ানো ঠিক না, কী বল মা?
