মিম্বর মিয়া কোনো উত্তর দেয় নি, কিন্তু এমনভাবে তাকিয়েছে-যার মানে সে সহজে ছাড়বে না।
কিছু দিন হল, কবির মাস্টার ভাবছেন, গার্লস স্কুলটা পালদের বসতবাড়িতে শুরু করলে কেমন হয়? নাম দেবেন-বরুণাবালিকাবিদ্যালয়। বরুণা যদি সত্যি সত্যি ফিরে আসে, সে খুশিই হবে। আর, এক বার স্কুল চালু হয়ে গেলে সহজে কেউ হাত ব্লাড়াবে না।
ঝড় ভালোই হয়েছে। গাছপালা পড়ে চারদিক লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। অধিকাংশ কাঁচা বাড়ি ঝড়ে উড়ে গেছে। মানুষজন মারা যায় নি। তবে বদিউজ্জামানের মার পা ভেঙেছে দু জায়গায়। সে চিৎকার করছে গরুর মতো। বদিউজ্জামানের সেদিকে লক্ষ নেই। সে তার ঝড়ে উড়িয়ে নেওয়া ঘরের শোকে কাতর। সে উঠোনে বসে আছে মাথা নিচু করে। মায়ের চি ৎকারে বিরক্ত হয়ে এক বার ধমকে উঠেছে, আরে, খালি চিল্লায়। চুপ করেন।
ডাক্তারের কাছে আমারে লইয়া যা রে বদিউজামান।
সকাল হউক।
সকালতক বাঁচতাম না।
না বাঁচলে নাই।
বদিউজ্জামানের স্ত্রী হাঁস-মুরগির খবর নিতে ছোটাছুটি করছে।
আকাশের অবস্থা ভালো নয়। সাধারণত কালবৈশাখীর পরেপরেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। এবার সে-রকম হচ্ছে না। টিপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বাড়িঘর-ভাঙা মানুষগুলির জন্যে রাতের একটা আশ্রয় দরকার। এতগুলি
আশ্রয় দেবার মতো ব্যবস্থা হঠাৎ করা মুশকিল।
কবির মাস্টার ছাতা মাথায় দিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালেন। এত বড়ো একটা ঝড় হয়ে গেল, কিন্তু এক জন মানুষও মারা গেল না-এই ব্যাপারটি তাঁকে অভিভূত করল। ঝড়ের মধ্যে বেঁচে এদের অভ্যাস আছে।
বদিউজ্জামানের মাকে সদরে পাঠানো দরকার। বদিউজ্জামানের সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ঘরের শোকেই সে কাতর।
কবির মাস্টার বিরক্ত হয়ে বললেন, মাথায় হাত দিয়ে বসে আছিস কেন? মাকে হাসপাতালে নিয়ে যা।
সকাল হউক, সকালে নিমু।
সকালে নিবি কিরে ব্যাটা? অবস্থা তো খুবই খারাপ।
এখন রওনা দিলে শেষ রাইতে পৌঁছমুসদরে। কেউ পুছত না আমারে।
রুয়াইল বাজারে নিয়ে যা। ডাক্তার দেখা।
পয়সা নাই মাস্টার সাব। হাঁস মারা গেছে দুইটা। তুফানে ফতুর হইছি।
বদিউজ্জামান থুক করে এক দল থুথু ফেলল। তার মা প্ৰাণপণে চিৎকার শুরু করল। কবির সাহেব বললেন, ডাক্তারের খরচ আমার কাছ থেকে নে!
তিনি তাঁকে পঞ্চাশটা টাকা দিলেন। এদের এত খারাপ অবস্থা! দুঃসময়ের জন্যে কোনো সঞ্চয় নেই। একটা নীলগঞ্জ তহবিল করা দরকার। যেখান থেকে দুঃসময়ে টাকা পয়সা নেওয়া যাবে। তবে যথাসময়ে সে টাকা ফেরত দিতে হবে। তাতে সবার মনে একটা সাহস হবে।
বদিউজ্জামান।
জ্বি।
টাকাটা ফেরত দিবি মনে করে। আমার নিজের টাকা না। সুখী নীলগঞ্জের টাকা।
কবির সাহেব রাতে আর ঘুমুতে গেলেন না। সমস্ত গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। না। তিনি তাঁর চিঠিপত্র নিয়ে বসলেন। চিঠিপত্র আসতে শুরু করেছে। ছাত্রদের কাছ থেকে যে-রকম সাড়া পাওয়া যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, সে-রকম সাড়া পাওয়া যায় নি। চিঠির উত্তর সবাই দিচ্ছে, কিন্তু আসল জায়গায় পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। যেসব চিঠি পাচ্ছেন তার একটির নমুনা এরকম
শ্রদ্ধেয় স্যার,
আমার সালাম জানবেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও যে আপনি একটা কিছু করতে যাচ্ছেন, তা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। আশা করি আপনার স্বপ্ন সফল হবে। সুখী নীলগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। আমি কতটুকু সাহায্য করতে পারব তা জানি না। কারণ বৰ্তমানে কিছু আর্থিক সমস্যা যাচ্ছে। সমস্যাটা ঘটলেই আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।
ইতি
আপনার স্নেহধন্য
আমীরুল ইসলাম
এই জাতীয় চিঠিগুলির উপর তিনি লাল কালি দিয়ে লেখেন-সাক্ষাৎ যার মানে হচ্ছে, চিঠিতে এর কাছে কোনো কাজ হবে না, দেখা করতে হবে। অবশ্যি মাঝে মাঝে দু-একটা এমন চিঠি পান যে আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে। রংপুর থেকে ওহীদুল আলম বলে একটি ছেলে লিখল—স্যার, আমি ভাবতেও পারি নি আমার কথা আপনার মনে আছে। কী যে খুশি হয়েছি চিঠি পড়ে! অতি নিকৃষ্ট ছাত্র হয়েও আপনার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হই নি, এই আনন্দ আমার রাখার জায়গা নেই। স্যার, আমি জীবনে তেমন কোনো সাফল্য লাভ করতে পারি নি। মোটামুটি একটি টানাটানির সংসার বলতে পারেন। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আমি আপনাকে সাহায্য করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। পাঁচ শ টাকা মনিঅৰ্ডার করে পাঠালাম। আমি আমার বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে আপনাকে পাঠাব। এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমার মহা সৌভাগ্য যে আপনার জন্যে কিছু করতে পারছি। স্কুলে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে এক দিন একটা বড়ো অপরাধ করেছিলাম। আপনি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে এক লাইনের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমার তা এখনো মনে আছে। যত দিন বেঁচে থাকব। তত দিন তা মনে থাকবে।…
এই জাতীয় চিঠিগুলি তিনি আলাদা করে রাখেন। কোনো কারণে মন খারাপ হলে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয় সুখী নীলগঞ্জ প্রকল্প নিশ্চয়ই এক দিন শুরু হবে।
তিনি ফজরের আজান পড়ার আগ পর্যন্ত চিঠিপত্র নিয়ে ব্যস্ত রইলেন। তারপর রুটিনমতো বেড়াতে বেরুলেন। দক্ষিণপাড়া থেকে কান্নার শব্দ আসছে। ব্যাপার কী? তিনি দ্রুত দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
কাঁদছে বদিউজ্জামান এবং তার স্ত্রী। বদিউজ্জামান তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় নি। তার মা কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে।
নীলু খুব লজ্জিত
তিনি অবাক হয়ে নীলুর দিকে তাকালেন।
