যেন নীলুর কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না। নীলু বলল, স্যার, আমি খুব লজ্জিত। শেষ মুহূর্তে জানালাম।
বড়ো সাহেব বললেন, লজ্জিত হওয়াই উচিত। অন্তত এক মাস আগে জানলেও আমরা অন্য কাউকে পাঠাতে পারতাম।
নীলু মাথা নিচু করে বসে রইল। বড়োসাহেব বললেন, আপনার সুইডেনে যেতে না পারার পেছনে কারণগুলি কী?
আমার একটা ছোট বাচ্চা আছে। ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না।
কত ছোট?
সাড়ে তিন বছর বয়স।
এই প্রবলেমটা আগে লক্ষ করলেন না কেন?
আগে ভেবেছিলাম সম্ভব হবে। দেখতে দেখতে ছ মাস কেটে যাবে।
বড়ো সাহেব যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন। নীলু তার মুখ দেখেই সেটা বুঝতে পারছে। কিন্তু তার করার কিছুই নেই।
টেনিং হবে দুই পর্যায়ে। তিন মাস অফিস ম্যানেজমেন্ট এবং পরের তিন মাস সেলস অ্যাণ্ড প্রমোশন। আপনি না-হয় প্রথম তিন মাসের ট্রেনিংটা শেষ করে চলে আসুন। নাকি সেখানেও অসুবিধা?
মেয়েদের স্যার অনেক অসুবিধা।
তিন মাস আপনার বাচ্চাকে দেখবার কেউ নেই? তার দাদী, কিংবা খালা, ফুপু?
মৃদুস্বরে বলল, আমি একা একা এত দূর যাই এটা আমার স্বামীর পছন্দ নয়।
আই সি।
আপনি যদি মনে করেন আমি কথা বললে তিনি কনভিন্সড হবেন, তাহলে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি।
দরকার নেই স্যার।
নীলু উঠে দাঁড়াল। এখন সাড়ে বারটা বাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ ব্রেক হবে। তার আজ আর কাজ করতে ইচ্ছা করছে না। সে ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।
কেন জানি বাসায় যেতেও ইচ্ছা করছে না। আবার একা একা ঘুরে বেড়াতেও ইচ্ছা করছে না। বন্যা তার অফিসে, নয়তো তার বাসায় গিয়ে আড্ডা দেওয়া যেত। অনেক দিন বন্যার সঙ্গে দেখা হয় না। তার অফিসে চলে গেলে কেমন হয়? আগে কোনো দিন যায় নি। ঠিকানা আছে, খুঁজে বেঃ করতে অসুবিধা হবে কেন?
বন্যা খুবই অবাক হল। দু বার বলল, একা একা খুঁজে বের করলি? তুই তো দারুণ স্মার্ট হয়ে গেছিস? অল্প কিছু দিন চাকরি করেই তোর তো ভালো উন্নতি হয়েছে! তবে ভালোমতো বুদ্ধি খেলাতে পারিস নি। তোর প্রথমে উচিত ছিল টেলিফোন করে দেখা আমি আছি কিনা।
তোর এখানে আসব, এমন কোনো প্ল্যান ছিল না। হঠাৎ ঠিক করা।
আর মিনিট দশেক দেরি হলেই আমার সঙ্গে দেখা হত না।
এই সময় ছুটি হয়ে যায় নাকি তোদের?
না, ছুটি হয় চারটায়। আজ একটু সকাল-সকাল ফিরছি, বাড়ি দেখতে যাব।
বাড়ি বদলাচ্ছিস?
না। ঘরের সঙ্গে বনিবন। একেবারেই হচ্ছে না। আমি আলাদা বাসা নিচ্ছি। তোকে সব বলব। দাঁড়া একটু, বসকে বলে আসি। তুই কিছু খাবি?
না।
নীলু অবাক হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কী সব পাগলামি যে করছে বন্যা! বনিব্যুনা না হলেই আলাদা বাসা ভাড়া নিতে হবে? তাছাড়া এই শহরে একটি মেয়েকে কেউ বাসা ভাড়া দেবে না। এই শহরে কেন, কোনো শহরেই দেবে না।
বন্যা নীলুকে নিয়ে রিকশায় উঠল। হালকা গলায় বলল, তোর হাতে সময় আছে তো?
আছে।
তাহলে চল আমার সঙ্গে। এক জন কেউ সঙ্গে থাকলে সাহস হয়। নিউ এ্যালিফেন্ট রোডে একটা মহিলা হোস্টেলের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম, কম্পাউণ্ডের ভেতর ঢুকেই কেমন গা ছমছম করতে লাগল। সুন্দর সুন্দর সব মেয়েরা ঘুরঘুর করছে। ববক্যাট চুল, ঠোঁটে লিপস্টিক। বেশ ভদ্রঘরের মেয়ে বলে মনে হয়, কিন্তু কেমন একটু খটকা লাগল। হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে কথা বললাম। বিশাল মৈনাক পর্বতের মতো এক মহিলা। প্রথমে বলল সীট আছে। তারপর যখন শুনল আমি একটা এ্যাম্বেসিতে চাকরি করি, তখন বলল সীট নেই।
তুই কী বললি?
কিছু বলিনি, চলে এসেছি। জায়গাটা ভালো না।
নীলু ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এখন কি আবার ঐখানেই যাচ্ছিস নাকি?
না, আরেকটা মহিলা হোস্টেল আছে। শুনেছি, সেটা ভালো। অনেক চাকরিজীবী মহিলা থাকে। তবে সীট পাওয়া মুশকিল।
হাসবেণ্ডের সঙ্গে কী হয়েছে, সেটা শুনি।
রিকশায় বসে বলার মতো কোনো স্টোরি না। নিরিবিলিতে বলব। আর ঐসব শুনে কী করবি?
হোস্টেল-টোস্টেল খোঁজার চেয়ে ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলা ভালো না? আমি কিছু মেটাব না। ও যদি মেটাতে চায়, মেটাবে। দোষটা ওর, আমার না।
রিকশাতেই বন্যা নিচু গলায় তার সমস্যার কথা বলতে শুরু করল।
তোকে তো আগেই বলেছি, আমার চাকরি করাটা ও পছন্দ করে না। মাসখানেক আগে আমাদের এক জন অফিসার বেড়াতে এসেছেন আমার বাসায়। কাটিসি ভিজিট। এতেই তার মুখ গম্ভীর-কেন এসেছে? মহিলা কলিগদের বাসায় ঘুরঘুর করার দরকারটা কী? এইসব। তারপর কী হল শোন। সেই ছেলেটা আরেক দিন এল। আর ওর মাথায় একদম রক্ত উঠে গেল—কেন বারবার আসবে?
নীলু ক্ষীণস্বরে বলল, সত্যি তো, কেন আসবে বারবার?
বারবার কোথায় দেখলি? দু বার এসেছে মাত্র। আর আমি কি তাকে বলতে পারি, আপনি আসবেন না। আমার এখানে?
নীলু চুপ করে রইল। বন্যা গম্ভীর গলায় বলল, তারপর কী হল শোন, ও বলল, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমার সঙ্গে যদি থাকতে চাও, তাহলে চাকরি ছাড়তে হবে। তুই কী বললি? আমার রাগ উঠে গেল। আমি বললাম, তুমি এমন কি রসোগোল্লা যে, তোমার সঙ্গে থাকতেই হবে।
কী সৰ্ব্বনাশ!
সর্বনাশের কী আছে? সত্যি কথা বললাম। মেয়ে হয়েছি বলে সত্যি কথা বলতে পারব না?
সত্যি-মিথ্যা এখানে কিছু নেই। তুই তোর বরকে রাগিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলি।
তা করেছিলাম। ও আমাকে রাগিয়ে দিতে পারবে, আমি পারব না? খুব পারব।
কত দিন থাকবি আলাদা?
