টুনীর মানসিক বিকাশ হচ্ছে না?
আমি ইন জেনারেল বলছি। চাকরিজীবী মহিলার কাছে ঘর-সংসারের চেয়ে তাদের ক্যারিয়ারই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অফিসের এক জন কলিগের অসুস্থতা তার কাছে বিরাট ব্যাপার মনে হয়। যেমন তোমার উদাহরণটাই ধরা যাক।
আমার কী উদাহরণ?
সুইডেনের ব্যাপারটায় তুমি কী রকম উল্লসিত হয়ে উঠলে। এক বারও ভাবলে না, এই ছয় মাস টুনী কীভাবে থাকবে।
ভাবি নি তোমাকে কে বলল?
ভাবলেও সেটাকে তেমন গুরুত্ব দাও নি। পাসপোর্ট করা, এই করা সেই করাতেই ব্যস্ত।
তুমি চাও না। আমি যাই?
শফিক, জবাব দিল না।
বল তুমি চাও না?
না।
চাকরি করি, তাও চাও না?
আমি না-চাইলেই তুমি ছেড়ে দেবে? তা পারবে না। এক বার যখন ঢুকেছ, সেখান থেকে কিছুতেই বেরুতে পারবে না। সংসার যদি ভেসে যায়, তাতেও না।
এতটা নিশ্চিত হয়ে কথা বলছি কীভাবে?
নিশ্চিত হয়ে বলছি, কারণ আমি জানি। যে মেয়ে চাকরি করে, সে কিছু পরিমাণে স্বাধীন। সেই স্বাধীনতা কোনো মেয়েই ছাড়বে না। সে সংসার ছেড়ে দেবে, কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়বে না।
মেয়েরা স্বাধীন হোক, সেটা তুমি চাও না?
শফিক বলল, যথেষ্ট তর্ক হয়েছে, এখন ঘুমুতে যাও।
নীলু ঘুমতে পারল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান শোনা গেল। ভোর হচ্ছে। শুরু হচ্ছে আরেকটি দিন। এই দিন অন্যসব দিনের মতো নয়। এটি একটি বিশেষ দিন। এই দিনে সাত বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
বৈশাখ মাস
বৈশাখ মাস।
আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। ধরন দেখে মনে হয় কালবৈশাখী হবে। পাখিরা অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করছে। ওরা টের পায়। কবির মাস্টার দ্রুত পা চালাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আছে শওকত। শওকতের মাথায় বিছানার চাদর দিয়ে বাঁধা গাদাখানেক বই। বইগুলি যোগাড় হয়েছে নীলগঞ্জ পারলিক লাইব্রেরির জন্যে। পারলিক লাইব্রেরি আপাতত তাঁর শোবার ঘরে। খুব শিগগিরই ঘর তোলা হবে। জমি খানিকটা পেলেই হয়। জমি পাওয়া যাচ্ছে না!
কবির মাস্টার আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন, তাড়াতাড়ি পা চালা শওকত। তুই দেখি বইগুলি ভেজানোর মতলব করছিস!
আর কত তাড়াতাড়ি যাইতাম কিন? আমি তো আর ঘোড়া না। মাথার উপরে আছে তিনিমুণি বোঝা।
লম্বা লম্বা পা ফেল রে বাবা। বই ভিজিলে সৰ্ব্বনাশ!
লম্বা লম্বা পা ফেলেও রক্ষা হল না। কালী মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই চেপে বৃষ্টি এল। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বাতাস। তারা ছুটতে ছুটতে কালী মন্দিরে উঠল। মন্দিরটি জরাজীর্ণ। পূজা-টুজা হয় না। দীর্ঘ দিন। কালীমূর্তির মাথা নেই। মন্দিরের চাতাল গোবরে ভর্তি। কবির মাস্টারের এক পা গোবরে ড়ুবে গেল।
এহ, কী কাণ্ড রে শওকত!
পাকা দালানের বাড়ি। ছাদ ফেটে গেছে। পানি আসছে ভাঙা ছাদ থেকে। শওকত বলল, হাত তালি দেন স্যার।
কেন?
জায়গাটা সাপে ভর্তি।
বলিস কী!
দুইটা ছাগল মরাল সাপের কামড়ে।
আরো ব্যাটা, আগে বলবি তো!
কবির মাস্টার এই একটি প্রাণীকে ভয় করেন। এই প্ৰাণীটির সঙ্গে কেন যেন তাঁর বারবার দেখা হয়।
শওকত!
জ্বি স্যার।
চল, রওনা দিই।
এই তুফানের মইধ্যে কই যাইবেন? জবর তুফান হইতাছে।
বাতাসের বেগক্রমেই বাড়ছে। মন্দিরের দরজা-জানালা কিছু নেই। বৃষ্টির ঝাপটায় দু জনেই কাকতেজা হয়ে গেল। কবির মাস্টার একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। এক কালে কত জাঁকজমক ছিল মন্দিরের। প্রতি অমাবস্যায় ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পূজা হত। এখন কিছুই হয় না। গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। বিত্তশালী হিন্দুদের কেউই নেই। সবার ধারণা হয়েছে, সীমান্ত পার হতে পারলেই মহা সুখ।
পালবাবুরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর একটি ছেলে মারা গেল। পালিয়ে যাবার সময় তাঁর বড়ো ছেলের বৌ বরুণা রহস্যময়ভাবে মিলিটারিদের হাতে পড়ল। তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। মেয়েটি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
পালবাবু প্ৰায় জলের দরে বিষয়সম্পত্তি বিক্রি করলেন। সবাই বলল, এখন আর ভয় কী? এখন কেন যাবেন? পালবাবু থাকলেন না। দেশ ছাড়ার আগে কবির মাস্টারকে বলে গেলেন, মাস্টার, বসতবাড়ি আর দশ বিঘা ধানী জমি বিক্রি করি নাই, এইগুলি আমি তোমারে দিয়া যাইতাছি।
কবির মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, কেন?
আমার বৌমা যদি কোনো দিন আসে এগুলি তুমি তারে দিবা। আমার কেন জানি মনে হয় বৌমা বাঁইচা আছে। সে একদিন-না-একদিন আসব নীলগঞ্জে।
সে বেঁচে আছে, এটা মনে করার কারণ কী?
আমি স্বপ্নে দেখছি মাস্টার।
সে যদি আসে, আমি নিজে পৌঁছে দেব আপনার কাছে।
না মাস্টার, তার দরকার নাই।
কেন? দরকার নেই কেন?
পালবাবু জবাব না দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
বরুণা ফিরে আসে নি। দশ বিঘা জমি এবং বসতবাড়ি আছে আগের মতোই। এক বার ফজল মিয়া দলিল বের করল একটা, বসতবাড়ি এবং জমি তাকে দলিল করে দিয়ে গেছে। পালরা। সেই দলিল আদালতে টিকল না। কিছু দিন হল ফজল আলির ভাগ্নে মিম্বর মিয়া একটি হ্যাণ্ডনেট বের করেছে, যার মর্মার্থ হচ্ছে, উনিশ শ সত্ত্বর সনে পালবাবু তার কাছে এগার হাজার বত্ৰিশ টাকা কার্জ নিয়েছে। সে টাকা শোধ হয় নি। টাকা শোধ কিংবা অনাদায়ে বাড়িঘর নিলামে তোলার জন্যে সে চেষ্টা-তদবির করছে।
কবির মাস্টার মিম্বর মিয়ার সঙ্গে দেখা করে ঠাণ্ডা, গলায় বলে এসেছেন, দেখ মিম্বর, উনিশ শ সত্ত্বর সনে তুমি হাফপ্যান্ট পরতে। দাড়িগোঁফও জ্বালায় নি। তোমার কাছ থেকে এগার হাজার টাকা কার্জ নিল পালরা! জালিয়াতি করতে হলে বুদ্ধি লাগে, তোমার মতো বেকুবের কাজ না।
