শুধু শুধু আসবে কেন? নিশ্চয়ই কোনো কাজ আছে। টুনীকে কার কাছে রেখে এসেছ?
কার কাছে আর রাখব, মার কাছে। তুমি কি আজ ছুটি নিতে পার?
কেন?
খিদে লেগেছে খুব। কোনো একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ খাওয়া যেত। আজকের তারিখটা তোমার মনে নেই, তাই না?
তারা প্ৰায় আধা ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে রইল। নীলুর বাস এল না। শফিক বলল, চল যাই, ঠাণ্ডা লাগছে।
একটু দাঁড়াও ভাইয়া, এসে পড়বে।
শফিক কোনো জবাব না দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। শাহানা বলল, আর একটুখানি থাকি না ভাইয়া। আমার মনে হচ্ছে পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে এসে পড়বে।
আসুক। দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।
এল নটার একটু আগে। তাদের এক কলিগ অফিস ছুটির আগে
আগে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। অফিসের মিনিবাসে করে তাকে শেরে বাংলা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অন্য সবাইও গিয়েছে সেখানে। ডাক্তাররা বললেন, হাট এ্যাটাক। ভদ্রলোকের এখনো জ্ঞান ফেরে নি। তার স্ত্রী এবং দুটি ছেলে হাসপাতালে এসে খুব কান্নাকাটি করছে।
শফিক কোনো রকম উৎসাহ দেখাল না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, খবর তো দেবে।
কীভাবে দেব খবরটা? সারাক্ষণ তো হাসপাতালে ছিলাম।
তুমি তো হাসপাতালে থেকে কিছু করতে পারছিলে না। শুধু শুধু আমাদেরকে দুশ্চিন্তায় ফেললে।
এক জন কলিগের এত বড়ো দুঃসময়ে আমি যাব না?
শফিক গম্ভীর গলায় বলল, তৰ্ক পরে করবে, এখন দেখ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। কিনা। রান্নাবান্না কিছুই তো হয় নি।
নীলুর প্রচণ্ড মাথা ধরেছিল। সে মাথাধরা নিয়েই রান্নাঘরে ঢুকল। শাশুড়ি খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফিরবেন। কিনা কে জানে।
দুপুরের তরকারি নেই। রাতের বেলার জন্যে কী রাঁধবে, নীলু ভেবে পেল না। রফিককে ডিম কিনে আনার জন্যে পাঠাতে হবে।
রফিক ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। নীলু ডাকতেই সে ক্লান্তস্বরে বলল, ভাবী, আমার জ্বর। হঠাৎ করে জ্বর এসে গেছে। বিশ্বাস না হলে কপালে হাত দিয়ে দেখ।
নীলু আনিসের খোঁজে ছাদে গেল। আনিস ছিল না! নীলু ফিরে এল মন খারাপ করে। ডাল-ভাতই খেতে হবে। রান্নাঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না, খুব ক্লান্তি লাগছে। নীলু, শাহানাকে ডেকে বলল, তুমি রফিকের পাশে বসি, মাথায় হাত-টাত বুলিয়ে দাও। ওর জ্বর।
শাহানার ইচ্ছা করছিল নীলুর সঙ্গে গল্প-টল্প করে। কিন্তু সে গেল রফিকের ঘরে। জ্বরে সত্যি সত্যি রফিকের গা পুড়ে যাচ্ছে। শাহানা বলল, চুল টেনে দেব? রফিক বলল, চুল ধরে টানাটানি করার কোনো দরকার নেই। তুই নিজের কাজে যা।
জ্বরের সময় কোনো একটা কথা কানে গেলে সেটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। চুল টানার ব্যাপারটা রফিকের মাথায় ঘুরতে লাগল। তার মনে হতে লাগল। তিন-চার জন অল্পবয়েসী মেয়ে একঘেয়ে গলায় তার কানের
কাছে চেঁচাচ্ছে–
চুল টানা, বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।
সাহেব বলেছে যেতে
পান সুপারি খেতে
পানের ভেতর মৌরি বাটা।
ইস্ক্রুপের চাবি আঁটা।।
চুল টানা বিবিয়ানা
চুল টানা বিবিয়ানা।
হোসেন সাহেবরা এলেন রাত এগারটায়। সে-সময় রফিকের মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। গ্রিন ফার্মেসির ডাক্তার অজয় বাবু চিন্তিত মুখে বসার ঘরে বসে আছেন। আনিস আছে, রশিদ সাহেব আছেন। জ্বর উঠেছে এক শ পাঁচ পর্যন্ত। রফিক বিড়বিড় করে ছড়াজাতীয় কী যেন বলছে। শাহানার বুক ধড়ফড় করছে। একি কাণ্ড! সুস্থ মানুষ। এসে চা খেল, গোসল করল আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে আকাশ-পাতাল জ্বর! মনোয়ারা কাঁদতে শুরু করলেন। হোসেন সাহেবের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেল। অজয় বাবু বললেন, ভয়ের কিছু নাই, জ্বর রেমিশন হবে। অস্থির হবার কিছু নাই।
রাত তিনটার দিকে রফিকের জ্বর অনেকখানি কমল। সে উঠে বসে ལྟ་ স্বরে বলল, কিছু খেতে— টোতে দাও ভাবী। মুড়ি ভেজে আন ঝাল দিয়ে।
নীলু ঘুমুতে গেল রাত চারটার দিকে। শফিক তখনো জেগে আছে। নীলু ক্লান্ত স্বরে বলল, ঘুমুবে না?
রাত তো বেশি বাকি নেই, ঘুমিয়ে কী হবে?
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।
শুয়ে পড়।
নীলু শুয়ে পড়ল। টুনী আজ তাদের সঙ্গে ঘুমিয়েছে। অনেক বড়ো হয়ে গেছে মেয়েটা। দেখতে দেখতে কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছে। নীলু টুনীকে বুকের কাছে টেনে আনল। টুনী ঘুমের মধ্যেই মাকে জড়িয়ে ধরল। আহা, সারা দিন দেখা হয় নি মেয়েটিকে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছে কিনা কে জানে। কেমন রোগা— রোগ লাগছে হাত-পা। কপালের কাছে লাল একটা দাগ, ফুলে উঠেছে। পড়ে গিয়ে ব্যথাট্যাথা পেয়েছে নিশ্চয়ই। নীলু চুমু খেল কপালের কাটা দাগে।
শফিক বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে এল। নীলু বলল, টুনী কেমন ব্যথা পেয়েছে দেখেছ? কপাল ফুলে উঠেছে।
শফিক কিছু বলল না। নীলু বলল, আরেকটু হলে চোখে লাগত।
যাদের বাবা-মা দুজনেই ব্যস্ত তাদের ছেলেমেয়েরা অবহেলার মধ্যেই বড়ো হবে। এটা নিয়ে দুঃখ করা ঠিক না। তুমি ঘুমাও।
নীলু মৃদুস্বরে বলল, আমার চাকরিটা তোমার পছন্দ না, তাই না?
শফিক চুপ করে রইল।
বল, তোমার কি ইচ্ছা না। আমি চাকরি করি?
শফিক শান্ত স্বরে বলল, আমার কাছে মনে হয়, পরিবারের প্রতি মেয়েদের দায়িত্ব অনেক বেশি।
সেই দায়িত্ব আমি পালন করছি না?
রাত-দুপুরে এ নিয়ে তর্ক করতে ভালো লাগছে না।
তর্ক না। তোমার মতামতটা শুনি।
মতামত তো দিলাম। টুনী বড়ো হচ্ছে অযত্ব অবহেলায়। যার ফল হিসেবে তার মানসিক বিকাশ অন্যসব শিশুদের মতো হবে না।
