কী যে তুমি বল ভাইয়া!
শাহানার লজ্জা করতে লাগল। ভাইয়া গভীর ধরনের মানুষ, ঠাট্টা-তামাশা কখনো করে না। কিন্তু শাহানা লক্ষ করেছে, বিয়ের প্রসঙ্গে সে মাঝে মাঝে হালকা কথাবার্তা বলে।
কয়েক দিন আগে তারা খেতে বসেছে। খাবার তেমন কিছু নেই। ভাইয়া হঠাৎ বলল, এত বড়ো লোকের স্ত্রী এক জন খেতে বসেছে, আর এই খাওয়া! শাহানার লজ্জায় মরে যাবার মতো অবস্থা। সবাই খুব হাসাহাসি করল। বাবার হাসি তো আর থামেই না। শেষটায় বিষম খেয়ে ফেললেন।
আজ শফিকের মুখ অন্ধকার হয়ে আছে। একটু আগে সে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার মন পড়ে আছে। অন্য কোথাও। শফিক বলল, তোর ভাবী কখন আসে?
পাঁচটার মধ্যে এসে পড়ে। চারটা পর্যন্ত অফিস। ওদের গাড়ি এসে দিয়ে যায়।
গাড়ি এসে দিয়ে যায়? জানতাম না তো। আমাকে তো কিছু বলে নি!
এই মাস থেকেই নিয়ে যাচ্ছে, দিয়ে যাচ্ছে।
শাহানার মনে হল, শফিক আরো গম্ভীর হয়ে গেছে। এতে তো হবার কথা, গভীর হবে কেন? শাহানা বলল, ভাইয়া, আমি একটু ঘুরে আসি।
কোথায় যাবি?
ছাদে।
ছাদ ফাঁকা। শাহানার মনে হচ্ছিল, আনিস ভাইকে তার ঘরে পাওয়া যাবে। কিন্তু ঘর তালাবন্ধ। কাপড় শুকোবার দড়িতে ধবধবে সাদা রঙের কয়েকটা কবুতর। এদের পোষ মানানো হচ্ছে ম্যাজিকে লাগবে। শাহানা কবুতরের খাঁচায় হাত রাখতেই একটি কবুতর ঘাড় বাঁকিয়ে তার হাতে ঠোকর দিল। এই বুঝি পোষ্যমান কবুতরের নমুনা!
শাহানা একা এক ছাদে হাঁটতে লাগল। শীত লাগছে। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। কেমন মন খারাপ করিয়ে দেবার মতো একটা সন্ধ্যা নামছে। কোনো রকম কারণ ছাড়াই শাহানার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে। খাচার কবুতরগুলি আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছে।
ছাদ থেকেই দেখা গেল। রফিক আসছে। সে চার দিনের জন্যে যশোর গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল, কী, কাউকে বলে যায় নি। চাকরির কোনো ব্যাপার হবে বোধহয়। আজকাল চাকরির ব্যাপারে সে কারো সঙ্গে কথা বলে না। শাহানা নিচে নেমে এল। রফিক তার দিকে তাকিয়ে হাসল। কেমন রোগা লাগছে রফিককে।
কেমন আছেন শাহানা বেগম?
ভালো আছি। তুমি কেমন?
ভালোই।
কেমন খুশি-খুশি লাগছে তোমাকে। চাকরি-টাকরি কিছু হয়েছে?
না। আমার ঐসব হবে না। বিজনেস করব ঠিক করেছি। বাসায় কেউ নেই নাকি?
না। খিলগাঁয়ে গিয়েছে। ভাবী এখনো ফেরেনি।
চট করে চা বানা। খুব কড়া করে। হাই পাওয়ারড্ টী দরকার। কেউ কি আমার খোঁজ করেছিল?
না কারোর খোঁজ করার কথা?
উঁহু।
নীলু আজও ফিরতে দেরি করছে। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে-সাড়ে ছটা বাজে। এতটা দেরি করার কথা না। শফিক শাহানাকে বলল, তোর ভাবী কি দেরি হবার কথা কিছু বলে গেছে?
না।
প্রায়ই কি সন্ধ্যা পার করিয়ে আসে?
না। বীণাদের বাসা থেকে অফিসে টেলিফোন করে দেখব?
দরকার নেই।
শাহানা বলল, আরেক কাপ চা বানিয়ে দেব ভাইয়া?
না।
শফিকের সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। কোনো কাজের মানুষ নেই বাড়িতে। রফিককে বললে সে এনে দেবে। বলতে ইচ্ছা করল না। শফিক নিজেই চাদর গায়ে দিয়ে বেরুল। শাহানা বলল, যাচ্ছ কোথায় ভাইয়া?
সিগারেট কিনব।
আমিও আসি তোমার সাথে?
আয়।
সারাটা পথ শাহানা কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। শফিক হাঁটছে। অন্যমনহঙ্ক ভঙ্গিতে। শাহানা কী বলছে, তার কানে যাচ্ছে কিনা সন্দেহ। সে অবশ্যি হ্যাঁ হুঁ দিয়ে যাচ্ছে।
ভাবীর সঙ্গে তুমিও চলে যাও না কেন সুইডেনে। সে যা এ্যালাউন্স পাবে তাতে তোমরা দু জন দিব্যি থাকতে পারবে। আমরা রাখব টুনীকে। কোনোই অসুবিধা হবে না। তা ছাড়া টুনী তো রাতে থাকে। বাবার সাথে। তোমাদের জন্যে সে খুব কাঁদবে-টাদৈবে বলে মনে হয় না। আসবার সময় তার জন্যে একগাদা খেলনা নিয়ে আসবে। শোন ভাইয়া, বিদেশে ডিল হাউস বলে একটা খেলনা পাওয়া যায়। যা সুন্দর। চমৎকার একটা বাড়ি। সব রকম আসবাবপত্র আছে। এমনকি বাথরুমে বেসিন, কমোড সব আছে। ঐ একটা নিয়ে আসবে।
শফিকের মনে হল, শাহানা মানসিক দিক দিয়ে এখনো বড় হয় নি! ছোটই রয়ে গেছে। হুঁট করে তার বিয়ে ঠিক করাটা বোধহয় ভালো হয় নি।
ভাইয়া, সিগারেট কিনেই কি তুমি বাসায় চলে আসবে?
হ্যাঁ, কেন?
চল না। ঐ বাসষ্ট্যাণ্ড পর্যন্ত যাই।
সেখানে কী?
ভাবীর মাইক্রোবাস সেখানে থামে। তাবী বাস থেকে নেমেই আমাদের দেখবে। খুব অবাক হবে। যাবে ভাইয়া?
চল যাই।
দু জনে হাঁটতে শুরু করল। শাহানা মৃদুস্বরে বলল, তোমাকে একটা গোপন খবর দিতে পারি ভাইয়া!
কী খবর?
খুবই গোপন। কাউকে কিন্তু বলতে পারবে না।
গোপন খবর হলে না-বলাই তো ভালো। গোপন খবর তো বলে দেয়ার জন্যে না।
শাহানা চুপ করে গেল। ভাইয়ার সঙ্গে অন্য কোনো মানুষের কোনো মিল নেই। অন্য কেউ হলে বলত, কাউকে বলব না, খবরটা কী বল। ভাইয়া সেটা বলবে না। শাহানার খুব ইচ্ছা করছে খবরটা বলে। ভাবী সতের শ টাকা দিয়ে একটা ঘড়ি কিনেছে শফিকের জন্যে। ম্যারেজ এ্যানিভারসারি উপলক্ষে সেটা শফিককে দেওয়া হবে। এই হচ্ছে খবর।
ঘড়ি কেনার সময় নীলু শাহানাকে নিয়ে গিয়েছিল। শাহানা অবাক হয়ে বলেছিল, এত দাম দিয়ে ঘড়ি কিনবে! নীলু লাজুক হেসে বলেছে, ওকে ভালো কিছু দিতে চাই।
কিন্তু ভাইয়া তো তোমাকে কখনো কিছু দেয় নি।
কোত্থেকে দেবে? ওরা কি টাকা আছে?
টাকা থাকলেও দিত না। এসব দিকে তার কোনো নজরই নেই। কথাটা খুবই সত্যি। গত ম্যারেজ এ্যানিভারসারিতে নীলু, দুপুরবেলা শফিকের অফিসে উপস্থিত হল। শফিক অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার, তুমি! নীলু হেসে বলেছে, এমনি দেখতে এলাম কী করছ।
