রাগ করবে। কেন? রাগ, হিংসা, দ্বেষ এইসব ভাবীর মধ্যে নাই। শী ইজ এন একসেপশনাল লেডি। তারপর তোমার কী খবর বল।
কোন খবর জানতে চাও?
ভদ্রলোক কবে আসছেন?
এপ্ৰিল।
বিয়েটা হচ্ছে কবে?
মে মাসে।
মহানন্দে আছি।
হু! তোমার কি হিংসা হচ্ছে নাকি?
একটু যে হচ্ছে না তা না। ভালো কথা, তোমার কাছে টাকা পয়সা আছে।
কেন?
দি থাকে, তাহলে এক প্যাকেট দামী সিগারেট কিনে দাও। ফতুর হয়ে গেছি।
শারমিন হেসে বলল, ভিক্ষা?
হ্যাঁ, ভিক্ষা।
ভিক্ষাই যখন চাইছ, তখন ছোট জিনিস চাইছ কেন? বড়ো কিছু চাও।
পাওয়া যাবে না, এমন কিছু আমি চাই না।
দুপুরবেলা তারা দু জন সত্যি সত্যি নীলুর অফিসে উপস্থিত হল। নীলু বেশ অবাক হল। যে মেয়েটির কিছু দিনের মধ্যেই বিয়ে হচ্ছে, সে একটি ছেলের সঙ্গে এমন সহজভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কীভাবে?
ভাবী কেমন আছেন?
ভালো। তুমি কেমন আছ? তুমি বললাম, রাগ কর নি তো?
হ্যাঁ, খুব রাগ করেছি।
শারমিন হেসে ফেলল। নীলুর মনে হল, এই মেয়েটি বড়ো ভালো। কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের সব সময় কাছের মানুষ মনে হয়। এই মেয়েটি সেই দলের।
শারমিন বলল, আসুন ভাবী, আজ দুপুরে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গেচ খাব। নতুন একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট হয়েছে, খুব ভালো খাবার।
আজ তো যেতে পারব না। আমাদের বোর্ড মিটিং আছে। সবাইকে থাকতে হবে। বৎসর শেষ হচ্ছে তো।
আজ তাহলে আপনি খুব ব্যস্ত?
হ্যাঁ। অন্য কোনো দিন সবাই মিলে একসঙ্গে খাব।
তার মানে আপনি এখন আমাদের বিদায় হতে বলছেন?
নীলুহাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ। আজ আমাদের খুব ঝামেলা।
কিন্তু আপনাকে এত খুশি-খুশি লাগছে কেন?
আমার একটা সুখবর আছে।
রফিক অবাক হয়ে বলল, কী সুখবর, প্রমোশন হয়ে গেছে নাকি তোমার? চাকরি তো এক বছরও হয় নি!
নীলু কিছু না বলে অত্যন্ত রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। সে নিজেও তার সুখবর সম্পর্কে কিছু জানে না। সকালবেলা অফিসে আসতেই সালাম সাহেব বলেছেন, আপনার জন্যে সুখবর আছে। বোর্ড মিটিংয়ের পর জানতে পারবেন। নীলুভয়ে-ভয়ে বলেছে, সুখবরটা কী?
জানবেন, জানবেন। এত ব্যস্ত কেন? দুঃসংবাদ তাড়াতাড়ি শোনা ভালো, কিন্তু সুসংবাদের জন্যে অপেক্ষা করাতেও আনন্দ।
কথাটা ঠিক, নীলুর আনন্দই লাগছে। কী হতে পারে খবরটা? প্রমোশন হবে না। সেটা সম্ভব না। চাকরি এক বছরও হয় নি। কিন্তু এছাড়া আর কী হতে পারে?
শারমিন বাসায় ফিরল সন্ধ্যাবেলা। সমস্তটা দিন বাইরে কেটেছে, কিন্তু এতটুকুও ক্লান্তি লাগছে না। বরং বেশ ঝরঝরে লাগছে।
রহমান সাহেব বাসায় ছিলেন। তিনি অনেক দিন পর শারমিনের উৎফুল্ল চোখ-মুখ দেখলেন। তিনি বললেন, চল মা, বাগানে হাঁটতে হাঁটতে চা খাই।
এই শীতের মধ্যে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে চা খাবে কি!
খুব শীত না! চল যাই। চাদর-টাব্দর কিছু গায়ে দিয়ে নাও।
রহমান সাহেব গোলাপঝাড়ের দিকে এগুলেন। এই বাগানের পেছনে অনেক শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু বাগান প্রাণহীন। প্রচুর গোলাপ গাছ আছে, কিন্তু বেশির ভাগ গাছই ফুল ফোটাতে পারে না। হয়তো মাটি ভালো না। কিংবা মালী ফুলগাছের কিছু জানে না। বাগানে হাঁটতে হাঁটতে রহমান সাহেবের একটু মন খারাপ হল।
কী করলে আজ সারা দিন?
তেমন কিছু না। ঘুরলাম, কেনাকাটা করলাম।
কী, কিনলে?
সুতির শাড়ি কিনেছি দুটি। ঘরে পরার, ফ্যান্সি কিছু না।
ফ্যান্সি কিছু কিনলেই পারতে।
কিনব এক সময়।
রহমান সাহেব হাসিমুখে বললেন, তাড়াতাড়িই কেনা উচিত। উৎসবের দিন তো এগিয়ে আসছে।
শারমিন কিছু বলল না।
শুনেছি, অনেকেই বিয়ের শাড়ি-টাড়ি কোলকাতা থেকে কেনে, তুমি যেতে চাও কোলকাতায়?
না।
আমি আগামী সপ্তাহে যাচ্ছি কোলকাতায়, ইচ্ছা করলে তুমি যেতে পারে।
না অত শখ নেই আমার।
এটা তো শখেরই বয়স। তোমার শখ নেই কেন?
ভেতরে চল বাবা। ঠাণ্ডা লাগছে।
রহমান সাহেব হালকা স্বরে বললেন, একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বল শারমিন, সাব্বিরকে বিয়ের ব্যাপারে তোমার মনে কি কোনো দ্বিধা দেখা দিয়েছে?
না, শুধু শুধু দ্বিধা দেখা দেবে কেন?
আজ তার একটি চিঠি পেলাম। তোমার কাছে চিঠি লিখে লিখে নাকি জবাব পাচ্ছে না।
মাঝে মাঝে আমার চিঠি লিখতে ভালো লাগে না। আলসে লাগে।
আজ তাকে চিঠি লিখে দিও।
হ্যাঁ, দেব।
আর ঐ ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?
না।
রোববারের প্রোগামটা ঠিক আছে?
না।
না, কেন?
এখন আর ইচ্ছা করছে না।
রহমান সাহেব মেয়ের দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইলেন। শারমিনকে তিনি বুঝতে পারছেন না। বাবারা হয়তো সবসময় তা পারে না। মারা পারে। শারমিনের মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই শারমিনকে বুঝতে পারত। রহমান সাহেব অনেক দিন পর নিজের স্ত্রীর কথা মনে করলেন।
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল, তবু নীলু জানত্বে পারল না, ভালো খবরটি কি? ম্যারাথন বোর্ড মীটিং হচ্ছে। চারটার পর তিন বার চা দেওয়া হয়েছে ভেতরে। ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শেষ বারের চা আনতে হল বাইরে থেকে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে মীটিং চলবে রাত নটা-দশটা পৰ্যন্ত।
নীলু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। বাসায় বলে আসা হয় নি। সবাই নিশ্চয়ই চিন্তা করবে। কিন্তু মীটিংয়ের মাঝখানে চলে যাওয়া যায় না। কেউই যায় নি। আজ বোনাস ঘোষণা হবার কথা। এ বছর কোম্পানি দু কোটি টাকার কাছাকাছি লাভ করেছে। বড়ো রকমের বোনাস হবার কথা। একটা গুজব শোনা যাচ্ছে, চার মাসের বেসিক পে বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে। গুজবটা এসেছে খুব উঁচু লেভেল থেকে, সত্যি হলেও হতে পারে।
