সত্যি হলেও অবশ্যি নীলুর কোনো লাভ নেই। যাদের চাকরি এক বছরের কম, তারা বোনাস পাবে না-নিয়ম নেই। নীলুর চাকরির এক বছর হতে এখনো তিন মাস বাকি। সবাই বোনাস পাবে, নীলু পাবে না। ভাবতে একটু খারাপ লাগে। টাকাটা পেলে সে টিভি কিনে ফেলত। বাসার সবাইকে দারুণ একটা চমক দেওয়া যেত।
রাত আটটায় নীলুর টেলিফোন এল। রফিক টেলিফোন করেছে।
হ্যালো ভাবী? ব্যাপার কী, এত দেরি!
বোর্ড মীটিং হচ্ছে।
বোর্ড মীটিং করবে ডিরেক্টররা। তুমি চুনোপুটি, তুমি বসে আছ কেন?
আমি একা না। সবাই অপেক্ষা করছে।
এত রাতে বাসায় ফিরবে কীভাবে? এটা নীলু ভাবে নি। বাসায় ফেরা একটা সমস্যা হবে। দশটা পর্যন্ত অবশ্যি বাস চলাচল করে। বাসে করে ফিরে যেতেও ঘণ্টাখানিক লাগবে।
হ্যালো ভাবী।
বল
তুমি অপেক্ষা কর আমার জন্যে। আমি নিতে আসছি, এক্ষুণি রওনা দিচ্ছি।
ঠিক আছে। তোমার ভাই এসেছে?
হ্যাঁ, এসেছে। তুমি এখনো ফেরনি শুনে ভাম হয়ে আছে। আজ মনে হয় গরম বক্তৃতা দেবে। ভাবী, আমি রাখলাম।
নীলু টেলিফোন নামিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে খবর পাওয়া গেল মীটং শেষ হয়েছে। বড়োসাহেব মঞ্জর হোসেন ডেকেছেন সবাইকে।
মজ্বর হোসেন সাহেবের মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। এই মুখ দেখে ভরসা হয় না, কোনো ভালো খবর আছে। কিন্তু সত্যি সত্যি ভালো খবর ছিল। বড়ো সাহেব নীরস ভঙ্গিতে খবরগুলি দিলেন।
কোম্পানি এ বছর খুব ভালো বিজনেস করেছে। কোম্পানির পলিসি মতো লাভের একটি ভালো অংশ কর্মচারীদের জন্যে ব্যয় করা হবে। সবাই এবার স্পেশাল বোনাস পাবে। সেটা হচ্ছে চার মাসের বেসিক পে। আমাদের এখানে দু জন আছেন, যাদের চাকরির মেয়াদ এক বছর হয় নি। আইন অনুযায়ী তাঁরা বোনাস পেতে পারেন না, তবে এ বছর তাঁদেরকেও বোনাস দেবার সুপারিশ করা হয়েছে।
কর্মচারীদের বাসস্থান নিমাণের একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এবং মেডিক্যাল এ্যালাউন্স বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। মেডিক্যাল এ্যালাউপের ব্যাপারটি যাবে ফাইন্যান্স কমিটিতে।
তুমুল হাততালির মধ্যে বক্তৃতা শেষ হল। মঞ্জর সাহেব নীলুকে হাত ইশারা করে ডাকলেন, আপনি একটু আমার কাছে আসুন।
নিশ্চয়ই সুখবরটা বলা হবে। নীলুর বুক টিপটপ করতে লাগল।
বসুন।
নীলু বসল।
আপনার জন্যে একটা ভালো খবর আছে। কোম্পানি এ বছর আপনাকে সুইডেনে টেনিংয়ের জন্যে সিলেকট করেছে। ছ মাসের ট্রেনিং বিজনেস ম্যানেজমেন্টের উপর টেনিংটা হবে। কাল সকালে আপনাকে কাগজপত্র দেব। টেনিং পিরিয়ডে থাকা-খাওয়ার খরচ ছাড়াও প্রতি মাসে দু শ পঞ্চাশ ইউ এস ডলার পাবেন হাত খরচ।
নীলু মৃদুস্বরে বলল, থ্যাংক ইউ স্যার।
থ্যাংকস্ দেবার কিছু নেই। সুযোগটা আপনি পেয়েছেন আপনার নিজের যোগ্যতায়। খুব অল্প সময়ে আপনি কাজের নেচার পিক আপ করেছেন এবং চমৎকারভাবে করেছেন। এ্যানুয়েল রিপোর্টটাও আপনি ভালো তৈরি করেছেন।
আনন্দে নীলুর চোখ ভিজে উঠতে শুরু করল। নীলু নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল। ভদ্রলোকের সামনে কেঁদে ফেললে লিজার ব্যাপার হবে।
রাত হয়ে গেছে তো, আপনি যাবেন কীভাবে?
আমাকেনিতে আসবে স্যার।
বাসা কোথায় আপনার?
কল্যাণপুর।
সে তো অনেক দূর। যাতায়াত করেন কীভাবে?
বাসে আসি স্যার।
কোম্পানি শিগগিরই একটা মাইক্রোবাস কিনবে। যাতায়াতের প্রবলেম তখন অনেকটা দূর হবে।
বড়োসাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
আপনাকে কখন নিতে আসবে?
কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে স্যার।
দরকার হলে আমি একটা লিফট্ দিতে পারি।
থ্যাংক ইউ স্যার। আমার দরকার নেই।
রফিক এসে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যে। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, বাড়িতে পৌঁছানো মাত্র আজ একটা ফাইটিং চিত্র হবে। ভাইয়া আগুন খেয়েলাফাচ্ছে।
দেরি হয়েছে বলে?
হুঁ।
তার দেরি হয় না? সেও তো প্রায়ই রাত এগারটার দিকে বাড়ি ফেরে।
পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে একটা ডিফারেন্স আছে না? মহিলাদের বাড়ি ফিরতে হবে সূর্য ডোবার আগে।
কেন?
আমি জানি না কেন। এটাই নিয়ম। চল ভাবী, রওনা হওয়া যাক।
নীলু বলল, কিছু মিষ্টি কিনতে চাই রফিক। দেরি যখন হয়েই গেছে, আরেকটু হোক।
মিষ্টি কেন?
তোমার ভাইয়ার রাগ কমানোর জন্যে।
বলতে বলতে নীলু হেসে ফেলল।
মাই গড, তোমার প্রমোশন হয়েছে নাকি! বিগ বস?
না, সেসব কিছু না। বলব তোমাকে, চল রিকশা নিই। নিউ মার্কেট পর্যন্ত রিকশায় যাব। নিউমাকেট থেকে বেবিট্যাক্সি নেব।
দারুণ ঠাণ্ডা পড়েছে। হুঁ-হু করে শীতের হাওয়া বইছে। সাড়ে আটটা বাজে, কিন্তু রাস্তাঘাট জনশূন্য। রফিক বলল, এত বড়ো শহর ঢাকা, কিন্তু এখনো কেমন গ্রামের ছাপ দেখিছ? আটটা না বাজতেই লোকজন বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নীলু কিছু বলল না। তার কেন জানি বড়ো ভালো লাগছে।
প্রেসক্লাবের সামনে এসেই রফিক বলল, এক মিনিট ভাবী, একটু দেখে যাই।
কী দেখবো?
কয়েকটি ছেলে চাকরির জন্যে আমরণ অনশন শুরু করেছে। এদের একটু দেখে যাই। তুমিও আস, এক মিনিট লাগবে।
ছ-সাত জন ছিল দিনে, এখন দেখা গেল তিন জনকে। কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। এক জনের এর মধ্যে ঠাণ্ডা লেগে গেছে। ঘন ঘন নাক ঝাড়ছে। আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। একটি নীল শাড়ি পরা অসম্ভব রোগা মেয়ে টুলের উপর বসে আছে শুকনো মুখে। অনশনকারীদের কারোর স্ত্রী হবে। এই মেয়েটিও নিশ্চয়ই না–খেয়ে আছে।
রফিক বলল, কী ভাইসব, কেমন আছেন?
কেউ কোনো জবাব দিল না।
আপনি তো দেখি একেবারে সর্দি লাগিয়ে বসে আছেন। দেখেন, শেষে নিউমোনিয়া-টিউমোনিয়া বাধিয়েবসবেন।
