তোমার কাছে কত টাকা আছে?
আমার কাছে খুব অল্পই আছে, এতে আপনার কাজ হবে না। আপনি বিশ্রাম করুন, বাবা চলে আসবেন।
ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করতে লাগলেন। শারমিন সাধ্যমত তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে চেষ্টা করল। ভালো ব্যবহারের চেষ্টা করাও মুশকিল। তারা দু জন দুই জগতের মানুষ। এই দু জগতের ভেতরে কানো বন্ধন নেই। অল্প সময়ের মধ্যেই শারমিন বিরক্ত হয়ে পড়ল। ভদ্রমহিলা একটির পর একটি আব্দার করেই যাচ্ছেন, ও মা, তোমার তো বাক্সভর্তি শাড়ি। দুই-একটা আমাকে দিও গো মা। পুরানা চাদর আছে? খুব শীত পড়ে আটপাড়ায়। না গেলে বুঝবা না।
সন্ধ্যাবেলা রহমান সাহেব এলেন। টাকার কথা শুনে বললেন, তোমাকে তো মেয়ে বিয়ের জন্যে তিন মাস আগেই চার হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, বঙ্কর সাহেব এসে নিয়ে গেছেন।
সেই বিয়াটা হয় নাই ভাইজান।
আকদ হওয়া বিয়ে ভেঙে গেছে! বকর সাহেব তো বললেন, আকন্দ হয়ে গেছে। রোসমত আটকে আছে। তিন হাজার টাকা চেয়েছিলেন। আমি দিয়েছিলাম চার হাজার টাকা।
ভদ্রমহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। বিশ্ৰী অবস্থা! শারমিন সরে গেল সামনে থেকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনল বাবা বলছেন, আমার সঙ্গে চাল চালিতে যাবে না। তোমাদের চাল বোঝার ক্ষমতা আমার আছে।
সময় কাটানোই হয়েছে শারমিনের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। সময় পাহাড়ের মতো বুকের উপর চেপে বসে থাকে। বই পড়া, গান শোনা, এর কোনোটাই এখন আর ভালো লাগে না। ছবি আকা শেখার কথা এক বার মনে হয়েছিল। রং-তুলি কিনে কয়েক দিন খুব রঙ মাখামাখি করা হল, তাও মনে ধরল না। প্রতিটি কাজ এত বিরক্তিকর।
কোনো কোনো দিন একা একা ঘুরতে ইচ্ছা করে। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে খারাপ লাগে না। সব দিন তো আর তা করা যায় না। পুরানো বান্ধবীদের কারোর ঠিকানা নেই, নয়তো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। অদিতির ঠিকানা ছিল। তাকে পরপর দুটি চিঠি দিয়েছে, জবাব পাওয়া যায় নি। হয়তো এই ঠিকানায় সে এখন থাকে না কিংবা থাকলেও তার জবাব দেবার ইচ্ছা নেই। শারমিন বন্ধুর জন্যে অতীতে কখনো হাত বাড়ায় নি, তার মূল্য দিতে হচ্ছে এখন। হাত বাড়িয়ে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।
শারমিন জেগে উঠল খুব ভোরে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করল। আজকের দিনটি কেমন করে কাটান যায়। ইউনিভাসিটিতে গেলে কেমন হয়? পরিচিত কাউকে কি পাওয়া যাবে ইউনিভার্সিটিতে? সম্ভাবনা খুব কম। এই পরিকল্পনাটা বাদ দিতে হল। রফিকদের বাসায় গিয়ে হঠাৎ উপস্থিত হলে কেমন হয়? শাহানা মেয়েটিকে ঐ দিন চমৎকার লেগেছিল। ওর সঙ্গে গল্পগুজব করা যেত। কিন্তু সে নিশ্চয়ই কলেজে। কোন কলেজে পড়ে জিগ্যেস করা হয় নি। জানা থাকলে ঐ কলেজে হাজির হলে মন্দ হত না। শাহানাকে বের করে সিনেমা দেখা যেত, কিংবা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসে সময় কাটান যেত।
কিংবা ঐ ম্যাজিশিয়ান আনিসকে এক বার খবর দিয়ে এ বাড়িতে নিয়ে এলে হয়। ছোটখাট একটা উৎসবের মতো করা হবে। ম্যাজিশিয়ান আনিস ম্যাজিক দেখাবে। পরিচিত কিছু মানুষ থাকবে।
চায়ের টেবিলে শারমিন হাসিমুখে বলল, ম্যাজিক তোমার কেমন লাগে বাবা?
কী ম্যাজিক?
ট্রিক্স। রুমাল ভ্যানিশ হয়ে যাবে। শূন্য থেকে তৈরি হবে রক্তগোলাপ।
ভালোই লাগে। হঠাৎ ম্যাজিক প্রসঙ্গ কেন?
আমি এক জন ম্যাজিশিয়ানকে চিনি। তাঁকে আমি বাসায় শো করতে दब्द।
বেশতো, বলবে।
কবে করলে তোমার সুবিধা হয়?
যে-কোনো দিন করতে পার। রবিবারে করা যেতে পারে।
ঠিক আছে বাবা, রবিবার সন্ধ্যায়।
রহমান সাহেব মেয়ের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালেন। ম্যাজিশিয়ান শ্রেণীর কাউকে তাঁর মেয়ে চেনে, এটা বিশ্বাস করতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।
বাবা, তাহলে ঐদিন খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।
হ্যাঁ, ব্যবস্থা কর।
ঐদিন সব রান্না আমি করব, কী বল?
ভেরি গুড আইডিয়া!
দেশী রান্না, না চাইনিজ? কোনটা চাও তুমি?
মিক্সড় হলে কেমন হয়?
ভালোই হয়।
শারমিনের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রহমান সাহেবের মনে হল, মাটির শোক শারমিনকে স্পর্শ করে নি। তার জীবনে কি এর চেয়েও কোনো বড়ো শোক আছে?
শারমিন হাসিমুখে বলল, নাশতা খাওয়ার পর আজ সারা দিন আমি ঘুরব।
ভেরি গুড। কোথায় ঘুরবে?
ঠিক নেই কোনো। গাড়ি নিয়ে যাচ্ছ তো?
হুঁ।
তুমি নিজে গাড়ি চালানোটা শিখে নাও না কেন?
আমার ইচ্ছে করে না।
প্রেসক্লাবের সামনে রফিক দাঁড়িয়ে আছে। ছোটখাট একটা ভিড় সেখানে। শারমিন বলল, ড্রাইভার সাহেব, গাড়ি থামান।
ড্রাইভার গাড়ি থামাল।
ঐ কোণায় পার্ক করে রাখুন। তারপর রফিককে ডেকে নিয়ে আসুন। ঐ যে হলুদ পাঞ্জাবি, দড়ির ব্যাগ কাঁধে।
রফিক হাসিমুখে এগিয়ে এল, আরে, কী ব্যাপোর?
তুমি এই ঠাণ্ডায় শুধু একটা পাঞ্জাবি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?
ইয়েস ম্যাডাম। বেকারদের শীত লাগে না।
করছ কি এখানে? ভিড় কিসের?
চাকরির দাবিতে অনশন হচ্ছে। তাই দেখছিলাম। নিজেও ঢুকে পড়ব কিনা ভাবছি।
উঠে আসে।
কোথায় যাচ্ছ?
ঠিক নেই।
রফিক উঠে এল। শারমিন বলল, তোমার ঝুলির ভেতর কী আছে?
কিছুই নেই। যাচ্ছি কোথায় আমরা?
কোথাও না। শুধু ঘুরব ঢাকা শহরে। তোমার কোনো কাজ নেই তো?
না। দুপুরবেলা ভাবীর অফিসে যাবার একটা প্ল্যান ছিল, সেটা বাতিল করলাম।
বাতিল করবার দরকার কী? যাবে দুপুরে। আমি বাইরে অপেক্ষা করব। কিংবা আমিও যেতে পারি, তোমার ভাবী যদি রাগ না করেন।
