খাটে পা তুলে আরাম করে বস তো মা।
সঙ্গে তোমার ঝগড়া-টগড়া হয়েছে নাকি?
না, ঝগড়া হবে কেন?
ফিরে যাবার সময় এয়ারপোর্টে তাকে খুব গম্ভীর দেখলাম।
পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। অনেক রকম ঝামেলা যাচ্ছে ওনাদের। তাঁর মারও অসুখ ছিল।
তুমি কি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলে?
ঢাকায় নেই তো উনি। জামালপুরে তাঁর মেয়ের কাছে থাকেন।
রহমান সাহেব সিগারেট ধরালেন। সিগারেট প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিছুদিন হল আবার শুরু করেছেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, শারমিন সিগারেটের
প্রসঙ্গে কিছু বলবে। কিন্তু সে কিছুই বলল না।
সাব্বির তোমাকে চিঠিপত্র লিখেছে তো?
হ্যাঁ।
জবাব দাও তো তুমি?
হ্যাঁ, দিই। দেবনা কেন?
আমি আজ তার একটা লম্বা চিঠি পেয়েছি। সে দেশে চলে আসছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে পড়বে। তোমাকেও নিশ্চয়ই লিখেছে?
হ্যাঁ।
আমি ঠিক করেছি। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তোমাদের বিয়ের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলব। কী বল তুমি?
শারমিন কিছু বলল না। রহমান সাহেব বললেন, খুব জমকাল একটা উৎসব করতে চাই। তোমার মার শখ ছিল জমকাল উৎসবের।
শারমিন এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন সে কিছু শুনছেন। অন্য কিছু ভাবছে। রহমান সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি আশা করেছিলেন বেশ অনেকক্ষণ গল্প গুজব করবেন। মেয়েটি ক্রমেই কি দূরে সরে যাচ্ছে? বিয়ের পর নিশ্চয়ই আরো দূরে যাবে।
শারমিন মৃদুস্বরে বলল, বাবা, তুমি তোমার কোনো কারখানায় একটি চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবো?
রহমান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কার চাকরি?
আমাদের সঙ্গে পড়ত একটা ছেলে। অনেক দিন ধরে চাকরির চেষ্টা করছে। পাশ করবার পর প্রায় দু বছর হয়ে গেল।
রহমান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, যে ছেলে দু বছর চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছে না, সে মোটামুটিভাবে এক জন অপদার্থ।
অপদাৰ্থ হবে কেন? দেশের অবস্থা খারাপ।
খারাপ ঠিকই, কিন্তু বুদ্ধিমান ছেলেরা এই খারাপ অবস্থার মধ্যেও গুছিয়ে নিতে পারে।
শারমিন কিছু বলল না। রহমান সাহেব বললেন, ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিও আমার কাছে, আমি দেখব। ও কি প্রায়ই আসে নাকি এখানে?
না, প্রায়ই আসবে কেন?
ঠিকানা জান?
না, জানি না।
বলেই শারমিন চমকে উঠল। এই মিথ্যাটা সে কেন বললঃ কোনো দরকার ছিল না তো!
ঠিকানা না জানলে খবর দেবে কি করে?
শারমিন লজ্জিত মুখে বলল, আমি ঠিকানা জানি। রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
বাবা, আমার মাথা ধরেছে, ঘুমুতে যাই।
শারমিন উঠে দাঁড়াল। তার সত্যি সত্যি মাথা ধরেছে। জ্বর আসছে বোধহয়। রহমান সাহেব বললেন, একটু বস। আদাচা করে দিক, মাথা ব্যথা কমবে। তিনি নিজেই চায়ের কথা বলবার জন্যে উঠে গেলেন। এবং তখনই জানতে পারলেন, আজ বিকেলে মাটি মারা গেছে। খবরটি দিতে গিয়ে জয়নালের মুখের ভাব এ-রকম হল, যেন সে নিজেই মার্টিকে মেরেছে।
আমাকে খবরটা তখন দাও নি কেন?
আপা নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন ভাত খাওয়ার পরে দিতে।
রহমান সাহেব মার্টিকে দেখতে গেলেন। ঠাণ্ডা মেঝেতে মাটি এলিয়ে পড়ে আছে। তার গায়ে মোটা একটা কম্বল।
মারা গেল কীভাবে?
জানি না। খাওন দিতে গিয়া দেখি এই অবস্থা।
জ্বি-না।
কিছুই বলে নি?
বলেছেন সকাল হইলে মাটি দিতে। বরই গাছের নিচে।
মাটির গায়ে কম্বল দিয়ে রেখেছে কেন?
আমি দেই নাই, আফা দিছেন।
চা— পৰ্ব্ব সমাধা হল নিঃশব্দে। মাটি প্রসঙ্গে কোনো কথাই হল না। শারমিন বলল, বাবা, আমি যাই?
যাও মা, ঘুমাও। আর শোন, ঐ ছেলেটিকে বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে।
দরকার নেই।
দরকার থাকবে না কেন?
যারটা সে-ই করুক। আমার এত মাথাব্যাথা নেই।
এসব কি শারমিনের রাগের কথা? কেন সে রাগ করছে? কার উপর রাগ করছে? শারমিন নিজেই তা বুঝতে পারছে না। সে কি অতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে? সব মেয়েই কি এ-রকম বদলে যায়, না এটা শুধু তার বেলায় হচ্ছে। জানার কোনো উপায় নেই, কাকে সে জিজ্ঞেস করবে?
শারমিনের কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। আত্মীয়স্বজন যারা ঢাকায় আছেন, তাদের সঙ্গেও কোনো রকম যোগাযোগ নেই। কেউ কেউ ঈদের দিনে বেড়াতে আসেন। গেটের ভেতর ঢোকার পর থেকেই তাঁরা অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। সেই অস্বস্তি বাড়ি থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কমে না। এদের অনেককেই শারমিন চেনে না। রহমান সাহেব চেনেন, কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস দেখান না। মেয়েকেও কারো বাসায় বেড়াতে যাবার জন্যে বলেন না। যে-কোনো কারণেই হোক, মেয়েকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান। তবু মাঝে মাঝে নিতান্ত অপরিচিত এক জন কেউ আসে। অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলে-যেন দীর্ঘদিনের চেনা। এদের কথার ধরন থেকেই বোঝা যায়-সাহায্যপ্রার্থী।
এক বার দুপুরবেলায় ঘোমটা-পরা এক জন মহিলা এলেন। সঙ্গে চারটা আনারস, দু বোতল আচার। শারমিনকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ কাঁদলেন, আহ গো মা, কত দিন পরে দেখলাম। গায়ের রঙটা একটু ময়লা হয়ে গেছে, আগে সোনার পুতলার মত ছিল। আমাকে চিনছ তুমি?
না।
আমি আটপাড়ার। তোমার আরার মামাতো বোন।
সেই মহিলা খুব আগ্রহ নিয়ে সমস্ত বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলেন, এবং ঘন ঘন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। এবং এক সময় জানা গেল। তিনি এসেছেন ছ হাজার টাকার জন্যে। মেয়ের বিয়ে আটকে গেছে। জামাই একটা সাইকেল এবং একটা টু-ব্যাণ্ড রেডিও চায়। বিয়ের কথাবার্তা সব পাকা। এখন এই অল্প কিছু টাকার জন্যে বিয়ে আটকে আছে। শারমিন লজ্জিত স্বরে বলল, আমার কাছে তো এত টাকা থাকে না। আপনি অপেক্ষা করুন, বাবা আসুক। তিনি বিকেলে আসেন।
