শুনলে শুনুক, আমি কাউকে ভয় পাই নাকি? ওর রোজগারে আমি খাই?
ওদের খাবার দিয়ে আসি মা। রাত হয়ে যাচ্ছে।
শফিক ফিরল এগারটায়।
নীলু না-খেয়ে অপেক্ষা করছিল। সে কিছুই বলল না। শফিক বলল, জন্মদিন কেমন হল?
ভালোই।
লোকজন এসেছিল?
এসেছে কেউ কেউ। তুমি হাত-মুখ ধুয়ে আস, খাবার গরম করছি। নাকি খেয়ে এসেছ?
না, খাব কোথায়? অফিসে একটা ঝামেলা হল।
নীলু কোনো আগ্রহ দেখাল না।
স্যুরেনসেন মনে হয় চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। অবশ্যি গুজবও হতে পারে।
নীলু নিঃশব্দে ভাত বেড়ে দিতে লাগল। শফিকের কথাবার্তা তার শুনতে ইচ্ছা করছে না। সারা দিনে অনেক পরিশ্রম হয়েছে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। শফিক ভাত মাখতে মাখতে বলল, হুঁইঙ্কি খেয়ে ব্যাটা খুব হৈচৈ করছিল। আজ, কেলেঙ্কারি অবস্থা।
শফিক অনেক রাত পর্যন্ত বসার ঘরে বসে বসে সিগারেট টানল। নীলু যখন বলল, ঘুমুবে না? তখন সে নিয়ম ভঙ্গ করে চা খেতে চাইল।
কৃষ্ট না হলে একটু চা কর তো নীলু কাজের ছেলেটা কোথায়? ওকে দেখছি না কেন?
মা বিদায় করে দিয়েছেন।
কবে করলেন?
গত সপ্তাহেই করেছেন। তোমার চোখে পড়ে নি বোধহয়।
শফিক আর কিছু বলল না। চা খেতে খেতে এলোমেলোভাবে কিছু কথাবার্তা হল। যেমন, রফিকের কিছু হয়েছে? চেষ্টা করছে না বোধহয় সে-রকম। চাকরির বাজার এতটা খারাপ নিশ্চয়ই না। প্রশ্ন করার জন্যেই করা। নীলু বলল, আমি ঘুমুতে যাচ্ছি।
শফিক কিছু বলল না।
নীলু শুয়ে শুয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল, তারা দু জনে কি ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে? বোধহয় যাচ্ছে। কিন্তু কেন? দোষটা কার? শফিকের একার নিশ্চয়ই নয়। তারও নিশ্চয়ই কোনো ভূমিকা আছে। সংসারের পেছনে শফিককে একা খাটতে হচ্ছিল। এখন সে কিছু সাহায্য করছে। শফিকের সেটা পছন্দ নয়। শুধু শফিক নয়, তার শাশুড়িরাও।
প্রথম বেতনের টাকা থেকে এক হাজার টাকা সে মনোয়ারাকে দিতে গেছে, তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ঐ টাকা তোমার কাছেই রাখ বৌমা। আগে যদি শফিকের টাকায় চলে থাকে, এখনো চলবে। শফিকও বলেছে একই কথা, তবে একটু ঘুরিয়ে, রেখে দাও, দরকার হলে নেব।
প্রথম দিকের সেই অবস্থা এখন নেই। মনোয়ারা এখন টাকা নেন। গত মাসে বললেন, সামনের মাস থেকে আরো কিছু বেশি দিতে পার কিনা দেখ তো বৌমা।
নীলু তার নিজের মাকে প্রতি মাসেই দু শ টাকা করে দিচ্ছে। তিনি বারবার লিখছেন, কোনো দরকার নেই। যখন দরকার হবে আমি চাইব। তিনি চাইবেন না কোনোদিন। তাঁর ধারণা, মেয়ের টাকায় তাঁর কোনো অধিকার নেই। এটা একটা মিথ্যা ধারণা। ছেলের টাকায় মার অধিকার থাকলে মেয়ের টাকায়ও থাকবে। কেন থাকবে না?
নীলুর চাকরি কেউ পছন্দ করছে না, কিন্তু তার টাকায় বাড়তি কিছু সুখ কি আসছে না? সে টাকা জমাচ্ছে। মাস তিনেকের ভেতরই একটি টিভি কেনার মতো টাকা জমে যাবে। এটা কম কী-নিশ্চয়ই কম নয়।
মশারির ভেতর কয়েকটা মশা ঢুকে গেছে। গুনগুন করছে কানের কাছে। নীলুর উঠতে ইচ্ছা করছে না। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে, কিন্তু পুরোপুরি ঘুম আসছে না। বিয়ের আগে এরকম হত। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হত। তখন সময়টাও খুব খারাপ ছিল। বিয়ে দেবার জন্যে মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু বিয়ের কোনো প্রস্তাবই আসে না। বড়ো ভাবী। খুব কায়দা করে কাটা-কাটা কথা শোনান। তাঁর প্রতিটি কথার তিন চার রকম মানে হয়। একেক বার প্রচণ্ড রাগ হত। কিন্তু কার উপর রাগ করবে? মার উপর? যার কেউ নেই, তার উপর রাগ করা যায় না।
টুনী কাঁদতে শুরু করেছে। কোনো ভয়ের স্বপ্ন-টপু দেখেছে বোধহয়।
কী হয়েছে মা। ভয় লাগছে?
না।
বাথরুম?
না।
পানি খাবে?
না।
তাহলে কাঁদছ কেন?
বাথরুম করব।
নীলু টুনীকে কোলে নিয়ে নামল। টুনী বলল, বাথরুম করব না। দাদুর সঙ্গে ঘুমোব।
কাল ঘুমিও।
না, আজ।
নীলু রাত—দুপুরে হোসেন সাহেবের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিল। প্রায় রাতেই এখন এ-রকম হচ্ছে। টুনী ঘুমুতে যাচ্ছে দাদুর সঙ্গে। এখন গল্প বলে বলে ঘুম পাড়াতে হবে। মনোয়ারা বিরক্ত হবেন। খিটিমিটি বাঁধবে দুজনের মধ্যে।
রহমান সাহেব খেতে এসে দেখেন
রাত ন টা।
রহমান সাহেব খেতে এসে দেখেন শারমিন দোতলা থেকে নিচে নামে নি। জমিলার মা বলল, আফা ভাত খাইবেন না।
কেন?
কিছুকন নাই? শরীর খারাপ মনে হয়।
রহমান সাহেব বিস্মিত হলেন। শরীর ভালো থাকুক না-থাকুক, খাবার সময় শারমিন উপস্থিত থাকে। কিছুদিন থেকে তিনি তার ব্যতিক্রম লক্ষ করছেন। রহমান সাহেব নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করলেন। রাতের খাবার সময়টা তিনি বেশ আনন্দে কাটান। ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে হালকা আলাপ করেন শারমিনের সঙ্গে। অফিসের ব্যাপার নিয়েও কথাবার্তা হয়। আজ তিনি একটি জরুরি ব্যাপার নিয়ে শারমিনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন।
নাই।ক্ষ্যংছড়িতে তিনি একটা রাবার চাষের পরিকল্পনা নিতে চাচ্ছেন। এই বিষয়ে মতামত জানা।
রহমান সাহেব খাওয়া শেষ করে শারমিনের দরজায় টোকা দিলেন।
মা জেগে আছ?
আছি।
শরীর খারাপ নাকি?
হ্যাঁ।
জ্বর?
জবাব না দিয়ে শারমিন দরজা খুলল। রহমান সাহেব চমকে উঠলেন। ফ্যাকাসে মুখ শারমিনের। চোখ লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এইমাত্র কেঁদে উঠেছে।
এস আমার ঘরে। গল্প করি।
শারমিন চাদর গায়ে দিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে এল। রহমান সাহেবের মনে হল, মেয়েটি খুব একলা হয়ে পড়েছে। নিঃসঙ্গতার চেয়ে বড়ো কষ্ট তো আর কিছু নেই। এই কষ্টটার ধরন তাঁর মতো আর কেউ জানে না। তারা দু জন নিঃশব্দে রহমান সাহেবের প্রকাণ্ড শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকল।
