তাই নাকি?
হ্যাঁ। ভদ্রলোক একটা ইউনিভার্সিটির অঙ্কের প্রফেসর। অথচ প্রফেশন্যাল ম্যাজিশিয়ানদের হার মানাতে পারেন।
শারমিন জন্মদিনের উৎসবে এসেছে, এটা শুনে রফিকের বিস্ময়ের সীমা রইল না। টেলিফোনে জন্মদিনের দাওয়াত অবশ্যি সে দিয়েছে। সেটাও তেমন কোনো জোরালো দাওয়াত নয়। শারমিনও আসবে এমন কোনো ইঙ্গিত দেয় নি। ঠিকানা অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল।
নীলু বলল, শাহানা ওকে ছাদে নিয়ে গেছে।
শীতের মধ্যে ছাদে কেন?
নীলু হেসে ফেলল, মমতা খুব বেশি মনে হচ্ছে।
তুমি যা ভাবছ তা না ভাবী, শারমিনের শিগগিরই বিয়ে হচ্ছে। আগস্টে হবার কথা ছিল, পিছিয়ে গেছে।
আমি অবশ্যি মনে মনে আশা করছিলাম, এ মেয়ে এই বাড়িতেই আসবে।
পাগল হয়েছ! এরা যে কী সিরিয়াস বড়োলোক এটা তুমি ধারণাও করতে পারবে না।
সিরিয়াস বড়োলোকদের মেয়েরা বুঝি বিয়ে করে না?
করে, তবে আমার মতো কাউকে করে না।
শফিক আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবে বলেছিল। এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, তার দেখা নেই। হোসেন সাহেব বললেন, আনিসের ম্যাজিকটা শুরু হয়ে যাক, দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুমি বরং টুনীকে ঘুম থেকে তোল।
টুনীর ঘুম ভাঙানো গেল না। আজ দুপুরে ঘুমায় নি। সহজে সে আর জাগবে না। ও ঘুমাক, আসুন, আমরা ম্যাজিক দেখি।
আনিস এই শীতেও রীতিমতো ঘামছে। হাত-পা কাঁপছে, কী অবস্থা হবে কে জানে! প্রতিটি আইটেমই অনেক বার করে করা। চোখ বন্ধ করেও এসব করা যাবে, কিন্তু তবু তার মনে হচ্ছে এক্ষুণি একটা হাসির কাণ্ড হবে। শাহানা বলল, শুরু করুন আনিস তাই।
বীণা বসে আছে শাহানার পাশে। বীণার মুখ অস্বাভাবিক গভীর। কারো সঙ্গেই সে কোনো কথাবার্তা বলছে না। যে কোনো কারণেই হোক সে অস্বস্তি বোধ করছে। আনিস প্রায় এক শ ভাগ নিশ্চিত, সে আঙটি সরিয়ে দিতে পারবে না। আনিস ঘরের কোণের দিকে সরে গেল। তার হাতে কিছু নেই।
আমি তাহলে শুরু করছি। দেখুন আমার হাত। হাতে কিছু নেই।
হোসেন সাহেব চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছেন। ম্যাজিকের ব্যাপারে তিনি দারুণ উৎসাহ বোধ করছেন। আনিস তার খালি হাত দেখিয়ে মুহুর্তেই দুটি টকটকে লাল রুমাল তৈরি করল। হোসেন সাহেব মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
শাহানা বলল, দেখি, রুমাল দুটি আমার হাতে দিন তো আনিস ভাই। পরীক্ষা করে দেখি।
ম্যাজিকের রুমাল তো দেওয়া যাবে না।
বলতে বলতেই আনিস রুমাল দুটি নিশানের মতো কিছুক্ষণ বাতাসে ওড়াল। সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হল একটি টকটকে লাল গোলাপ। আনিস গোলাপটি এগিয়ে দিল শাহানার দিকে। শাহানা কেন জানি খুব লজ্জা পেল। হোসেন সাহেব মুগ্ধকণ্ঠে বললেন, অদ্ভুত ম্যাজিক! এত সুন্দর ম্যাজিক আমার জীবনে আমি দেখি নি। বীণা শুধু কঠিন দৃষ্টি নিয়ে বসে রইল। সে আশা করেছিল এই গোলাপটি সে পাবে।
আনিস আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে কাজেই তার তৃতীয় ম্যাজিক লিংকিং রিং হল চমৎকার। রফিক বলল, এ তো দেখি সিরিয়াস ম্যাজিশিয়ান।! ঠিক না শারমিন?
হ্যাঁ, আমার নিজেরই এখন ম্যাজিক শিখতে ইচ্ছা হচ্ছে।
শাহানা বলল, মিঃ স্মিথের ম্যাজিকের মতো লাগছে আপনার কাছে?
হ্যাঁ, সেরকমই লাগছে।
শেষ ম্যাজিকে গণ্ডগোল হয়ে গেল। আঙটি হাওয়া করে দেওয়ার ম্যাজিক আনিস শারমিনের আঙটি নিয়ে রুমালে ভরে রাখল টেবিলে। হাসিমুখে বলল, এখানে একটি আঙটি আছে, এ বিষয়ে কি কারো কোনো সন্দেহ আছে? সন্দেহ থাকলে হাত রুমালে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে যান। বীণার দায়িত্ব হচ্ছে পরীক্ষা করতে এসে আঙটি উঠিয়ে নেওয়া। সে উঠে দাঁড়াল এবং সরু গলায় বলল, আমার মাথা ধরেছে, আমি বাসায় যাব। শাহানা বলল, আরে, এখন যাবে কি! দেখে যাও কী হয়।
যা ইচ্ছা হোক, আমার ভালো লাগছে না।
আনিস বীণার এই হঠাৎ রাগের কোনো কারণ খুঁজে পেল না। সে বলল, বীণা এসে দেখে যাও, আঙটি আছে কিনা।
অন্যরা দেখুক।
বীণা গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। শেষ ম্যাজিকটি আনিসের দেখানো হল না। হোসেন সাহেব অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বললেন, আনিস, আঙটিটির কী হল দেখাও।
ম্যাজিকের মাঝখানে কেউ উঠে গেলে সে ম্যাজিক আর দেখানো যায় না।
তাই নাকি, জানতাম না তো!
এইটি অন্য কোনোদিন দেখাব।
শাহানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মন বলছে-বীণার মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে, সে সম্পর্কে তার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই, তবে সে একেবারেই যে বুঝতে পারছে না, তাও নয়।
মনোয়ারা ম্যাজিক শেষ হওয়ামাত্র নীলুকে ডেকে বারান্দায় নিয়ে গেলেন। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন, শারমিন মেয়েটি কেন এসেছে। এ বাড়িতে?
রফিক দাওয়াত করেছে, তাই এসেছে।
দাওয়াত করবে। আর হুঁট করে চলে আসবে? তাও একা একা এসেছে। আমার কিন্তু ভালো লাগছে না।
ঐসব কিছু নামা।
তুমি বুঝলে কী করে ঐসব কিছু না? বড়োলোকের মেয়ে, নাকে দড়ি দিয়েঘোরাচ্ছে।
নীলু কিছু বলল না।
রফিক চাকরি-বাকরি কিছু খুঁজছে না। ঐ মেয়ের পেছনে ঘুরঘুর করে সময় কাটাচ্ছে।
না মা, চাকরির চেষ্টা ও ঠিকই করছে।
বাজে কথা বলবে না। চেষ্টা করলে এই অবস্থা হয়? হয় না। আর, কিছু যে হচ্ছে না, সেই নিয়ে কোনো মাথা ব্যথাও নেই। দিব্যি মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াচ্ছে। আজ আমি তাকে কিছু কথা শোনাব।
থাক মা, আজ আর কিছু না বললেন।
কেন? তাকে কথা শোনাতে হলে আগে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে? পঞ্জিকা দেখতে হবে?
আস্তে কথা বলুন মা, ওরা শুনবে।
