আনিস চূড়ান্ত রকমের নার্ভাস। আজই তাঁর জীবনের প্রথম ম্যাজিক শো। কে জুনে কী হবে। পাঁচটা আইটেম সে তৈরি করে রেখেছে। আইটেম হিসেবে পাঁচটাই চমৎকার। আজ সারা দিনে সে প্রতিটি আইটেমই প্ৰায় এক হাজার বার করে প্রাকটিস করেছে। তবু তার মনে হচ্ছে, আসল সময়ে একটা কিছু গণ্ডগোল হয়ে যাবে। সবচে বড়ো সমস্যা হচ্ছে তার কোনো কন-ফিডারেট নেই, যে দর্শকদের মধ্যে বসে থাকবে। প্রয়োজনের সময় বিশেষ সাহায্যটি করবে। এরকম এক জন কাউকে পাওয়া গেলে চমৎকার একটা ম্যাজিক দেখানো যেত। আনিস চিন্তিত মুখে বীণার সঙ্গে কথা বলতে গেল। বীণাকে বলে দেখা যেতে পারে। সে রাজি হবে কি হবে না কে জানে।
বীণা সঙ্গে সঙ্গেই রাজি। সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, কী করতে হবে বলে দেন, নো প্রবলেম।
বিশেষ কিছুই না, টেবিলের উপর একটা রুমালে আঙটি লুকানো থাকবে। তুমি আঙটি আছে কিনা পরীক্ষা করতে গিয়ে আঙটিটি তুলে নিয়ে আসবে।
তুলে আনবার সময় কেউ দেখবে না?
না। সবার নজর থাকবে ম্যাজিসিয়ানের দিকে। সেই সময় একটা বক্তৃতা শুরু করব আমি। পারবে না?
পারব না কেন? নিশ্চয়ই পারব।
আনিস চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে লতিফা বললেন, তোর ও বাড়িতে যাবার কোনো দরকার নেই।
দাওয়াত দিয়েছে, যাব না?
না।
এসব বলে তোমা লাভ নেই। আমি যাব।
লতিফা গম্ভীর হয়ে রইলেন। মেয়েকে আর কিছু বলতে সাহস করলেন না। কেন জানি তিনি বীণাকে কিছুটা ভয় পেতে শুরু করেছেন। বীণা দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। আনিসের সঙ্গে তার সম্পৰ্কটা কোন পর্যায়ে, এই নিয়ে তিনি খুব ভাবেন। তাঁর ধারণা বীণা আনিসকে মাঝেমধ্যে এটা-ওটা কিনে দেয়। এই ধারণাটা হয়েছে গত পরশু। বীণা একা এক নিউ মার্কেটে গিয়েছিল। নিউ মার্কেট থেকে ফিরেই সে বেড়াতে গেল ছাদে। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি দেখলেন, আনিস লাল রঙের একটি নতুন চেক শার্ট গায়ে দিয়ে হাসিমুখে নোমছে। এর মানেটা কী? সারাটা দিন লতিফার খুব খারাপ কাটল। সন্ধ্যার পর বীণাকে খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, আনিসের গায়ে একটা নুতন শার্ট দেখলাম। বীণা হাই তুলে বলল, আমিও দেখলাম। খুব মানিয়েছে।
লাল রঙ ব্যাটাছেলেদের মানাবে কি?
লাল হচ্ছে এমন একটা রঙ, যা সবাইকেই মানায়।
নিউ মার্কেট থেকে তুই কী কী কিনলি?
তেমন কিছু না। দু দিস্তা কাগজ। একটা বল পয়েন্ট পেন।
এসব কেনার জন্যে নিউমার্কেটে যেতে হল? সুরমা ষ্টোরেই তো পাওয়া যায়।
তা যায়। তবু গেলাম।
লতিফা খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, নিউ মার্কেট থেকে ফিরেই ছাদে গেলি কেন?
এমনি গেলাম। ছাদে যাওয়া নিষেধ নাকি? লতিফা এক বার ভাবলেন সরাসরি জিজ্ঞেস করেন শার্টটা বীণা কিনে দিয়েছে কিনা। সাহস হল না। ঘরে একটা বড়ো মেয়ে থাকার কত যে সমস্যা। চোখের আড়াল হলেই বুক ধড়ফড় করে। বীণা গিয়েছে শাহানাদের ওখানে। ঘণ্টাখানেকের ব্যাপার, তবু ভালো লাগছে না। আনিসটাকে ঘাড় ধরে বিদেয় করে দিতে পারলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। লতিফা দীর্ঘ-নিঃশ্বাস ফেললেন।
টুনী বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল। রফিক বলল, ভাবী, আমি টেলিফোন করে দেখি ভাইয়া অফিসে আছে কিনা। টেলিফোনের কথাটা নীলুর মনে আসে নি। আগেই টেলিফোন করা যেত। কোত্থেকে করবে? রশীদ সাহেবের বাসা থেকে?
না, গ্রিন ফর্মেসি থেকে, চেনা লোক আছে। ভাইয়ার টঙ্গি অফিসের নাম্বার তোমার কাছে আছে?
না।
ঠিক আছে, আমি বের করে নেব!
টুনীকে শুইয়ে দিতে গিয়ে নীলুর চোখে পানি এসে গেল। মানুষ এমন হয়, আশ্চর্য! নীলুর ইচ্ছা করতে লাগল বাতিটাতি নিভিয়ে শুয়ে থাকে টুনীর পাশে! কিন্তু তা সম্ভব নয়। তাকে হাসিমুখে সবার সামনে ঘুরে বেড়াতে হবে, আনিসের ম্যাজিক দেখতে হবে।
ভাবী।
কী শাহানা?
তাড়াতাড়ি এস, কে এক জন মেয়ে এসেছে আমাদের বাসায়। পরীর মতো সুন্দর। না দেখলে তুমি বিশ্বাস করবে না। উপহারের প্যাকেট আছে হাउठ।
বন্যা নাকি?
আরে না। ওনাকে বুঝি আমি চিনি না? তুমি তাড়াতাড়ি আসে।
নীলুও তাকে চিনতে পারল না। মেয়েটি বিব্রত মুখে বলল, আমার নাম শারমিন। রফিকের সঙ্গে পড়ি। ও আমাকে দাওয়াত দিয়েছে ভাতিজির নাকি জন্মদিন।
হ্যাঁ। তুমি বস।
আপনি ওর ভাবী?
হ্যাঁ।
আমি সবাইকে চিনি। ও হচ্ছে শাহানা, তাই না?
হ্যাঁ।
আমাদের জন্মদিনের মানুষটি কোথায়?
টুনী ঘুমিয়ে পড়েছে।
ওর উপহারটা হাতের কাছে রেখে আসি।
নীলু ভেবে পেল না, এই মেয়েটির কথাই কি রফিক মাঝেমধ্যে তাকে বলে? এমন চমৎকার একটি মেয়ে! শারমিন হোসেন সাহেব ও মনোয়ারা দু জনকেই বিনীতভাবে সালাম করল। হোসেন সাহেব তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিতান্ত পরিচিত জনের মতো গল্প শুরু করে দিলেন। এমনকি মনোয়ারা পর্যন্ত মিশুক স্বরে গল্পে যোগ দিলেন।
বাসা কোথায় তোমার?
পুরানো ঢাকায়।
এত দুর একা একা এসেছ?
গাড়ি নিয়ে এসেছি। আর রাত বেশি হয় নি। সাতটা মাত্র বাজে।
শাহানা শারমিনকে নিয়ে ছাদ দেখাতে গেল। সে তাড়াতাড়ি কারো সঙ্গে সহজ হতে পারে না। সেও চট করে সহজ হয়ে গেল। শাহানার খুব ইচ্ছা করতে লাগল। এই চমৎকার মেয়েটিকে ম্যাজিশিয়ান আনিসের কথা বলে। কাউকে তার কথা বলতে ইচ্ছা করে।
এখানে কেউ থাকে নাকি শাহানা?
আনিস ভাই থাকেন।
আনিস ভাই কে?
এক জন ম্যাজিশিয়ান। যা সুন্দর ম্যাজিক দেখান!
তুমি দেখেছ?
না।
তাহলে বুঝলে কী করে, সুন্দর?
শাহানা চুপ করে গেল। শারমিন হাসিমুখে বলল, আমি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এক বার গিয়েছিলাম ইংল্যাণ্ড, সেখানে মিঃ স্মিথের ম্যাজিক দেখেছি। অপূৰ্ব।
