হ্যাঁ।
গাড়ি নিয়ে যান। গাড়ি আছে তো। ড্রাইভার চা খেতে গেছে, ডেকে নিয়ে আসছি।
ডাকতে হবে না!
রফিক লম্বা লম্বা পা ফেলতে লাগল। দারোয়ান শ্রেণীর কারোর গলায় এমন শুদ্ধ ভাষা শুনতে ভালো লাগে না। কেন লাগে না? এটা কি অত্যন্ত বাজে ধরনের একটা মানসিকতা নয়? দারোয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে! এর মধ্যে অবাক হবার কী আছে? এরা কি রফিকের এখানে আসা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে?
মনোয়ারা গম্ভীর মুখে বললেন
মনোয়ারা গম্ভীর মুখে বললেন, বৌমা, আজ অফিসে যাবে না?
নীলু হাসিমুখে বলল, আজ টুনীর জন্মদিন, অফিসে যাব না। মনোয়ারী কিছু বললেন না। আরো গম্ভীর হয়ে গেলেন। নীলুর খুব
ইচ্ছা, টুনীর দ্বিতীয় জন্মদিনটি খুব ভালো মতো করে। প্রথমটি করা হয় নি।
শফিক কোনো রকম উৎসাহ দেখায় নি। বিরক্ত মুখে বলেছে, জন্মদিন আবার কী?
নীলু বলেছে, আমাদের জন্যে তো না, টুনীর জন্যে।
এক বছরের বাচ্চা, ও জন্মদিনের কি বোঝে? বাদ দাও।
এ বছর সে-রকম কিছু বলতে পারবে না। টুনীর বয়স এখন দুই। জন্মদিনটি সে কিছু কিছু বুঝতে পারবে। আর না পারলেও জানবে তাকে ঘিরে একটি অনুষ্ঠান হচ্ছে। শফিক বলতে পারবে না, টাকা পয়সা নেই। এর জন্যে সে টাকা আলাদা করে রেখেছে। তেমন কোনো বড়ো উৎসব হবে না। একটা কেক কাটা হবে। কিছু ভালোমন্দ রান্না হবে! টুনীকে সঙ্গে নিয়ে সে এবং শফিক একটা ছবি তুলবে স্টুডিওতে। প্রতি বছর এ-রকম একটি করে, ছবি তোলা হবে। সেই ছবির এ্যালবামটি টুনীর বিয়ের সময় টুনীকে উপহাঁর দেওয়া হবে। প্রথম জন্মদিনের ছবিটি অবশ্যি তোলা হয় নি।
শফিক অফিসে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। নীলু এসে বলল, তুমি কি আজ একটু সকাল সকাল আসতে পারবো?
না।
একটু চেষ্টা করে দেখ না।
কেন?
টুনীর আজ জন্মদিন না? তুমি এলে তোমাকে নিয়ে স্টুডিওতে একটা ছবি তুলব।
শফিক জবাব দিল না। নীলু নরম স্বরে বলল, প্লীজ।
আচ্ছা দেখি।
দেখাদেখি না, আসতেই হবে। সন্ধ্যাবেলা কেক কাটা হবে। রাতে একটু খাওয়াদাওয়া হবে।
অনেককে বলেছি নাকি?
না, বন্যাকে বলেছি। ও তার হাসবেণ্ডকে নিয়ে আসবে। আনিসকে বলেছি। আনিস ম্যাজিক দেখাবে।
ও ম্যাজিক জানে নাকি?
শিখছে। জানে নিশ্চয়ই। তুমি যদি তোমার কোনো বন্ধবান্ধবকে বলতে চাও, বল।
কেউই নেই?
শফিক জবাব দিল না!
নীলুর ধারণা ছিল রফিককে বাজারে পাঠানো সমস্যা হবে। সে যেতে চাইবে না। ইদানীং সে অল্পতেই রেগে ওঠে। বাজারের কথা বললেই নিঃশ্বাস ফেলে বলে, বাজার করাই শেষ পর্যন্ত আমার ক্যারিয়ার হবে। বাজার সরকারের কাজই পাব। অন্য কিছু পাব না!
আজ সে খুব আগ্রহের সঙ্গে রাজি হল। শার্ট পরতে পরতে বলল, সিরিয়াস একটা হৈচৈ হবে মনে হয়। বিরাট খাওয়াদাওয়া নাকি?
বিরাট কিছুনা। তোমার কোনো বন্ধুবান্ধবকে বললে বলতে পার।
বেকারের কোনো বন্ধুবান্ধব থাকে না। লিস্টি দাও। কী কী নিয়ে আসতে হবে বল। ঘর সাজানো হবে নাকি?
দও না সাজিয়ে। বেলুন-টেলুন দিয়ে সাজালে ভালোই লাগবে।
সাজিয়ে দিতে পারি, তবে এক শ টাকা ফিজ লাগবে।
দেব, ফিজ দেব।
সবচে আগ্রহ দেখা গেল শাহানার মধ্যে। তার উৎসাহের সীমা রইল না। সে কলেজে গেল না। নিজেই নিউমার্কেট থেকে রঙিন কাগজ কিনে আনল। হোসেন সাহেবও তার সঙ্গে জুটে গেলেন। শিশুদের উৎসাহ নিয়ে রঙিন কাগজের শিকল বানাতে বসলেন। মনোয়ারা বিরক্ত মুখে বললেন, তুমি বুড়ো মানুষ, রঙিন কাগজ দিয়ে মালা বানাতে বসছ?
বুড়ো মানুষেরা মালা বানাতে পারবে না। এ রকম কোনো আইন আছে নাादि?
বাজে তর্ক করবে না।
এত দিন পরে একটা উৎসব হচ্ছে বাড়িতে, আর তুমি ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছি, এটা ঠিক না।
কি ঝগড়া বাধালাম?
এই তো বাধাচ্ছি। আমি এখন একটা কথা বলব, তুমি তার উত্তরে দশটা কথা বলবে। তারপর আমি আবার আরেকটা কথা বলব, তুমি তার উত্তরে বলবে বিশটা, তারপর
মনোয়ারা ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। মাথা ধরেছে এই অজুহাতে বিছানায় শুয়ে রইলেন। কোনো ব্যাপারেই কোনো রকম আগ্রহ দেখালেন না। নীলু যখন এসে বলল, পোলাওটা একটু বসিয়ে দিন না মা। তখন তিনি ভুরু কুচকে বললেন, কেন, তুমি কি পোলাও রান্না ভুলে গেছ নাকি? নীলুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
শফিকের জন্যে সে সেজেগুজে বিকাল থেকেই বসে ছিল। শফিক আসামাত্র ছবি তুলতে যাবে। টুনীও খুব আগ্রহ নিয়ে নতুন জামা পরে বসে আছে। সে বারবার বলছে, বারা কখন আসবে? বাৰ্বা হচ্ছে আরা। টুনী কিছু কিছু শব্দ তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে। আরা হল বাৰ্বা। পাচ্ছি হচ্ছে পাখি। সে আ বা পা উচ্চারণ করতে পারে না, তা নয়। ঠিকই পারে। তবু নতুন শব্দগুলি কেন বলে, কে জানে! শিশুদের মধ্যে অনেক দুর্বোধ্য ব্যাপার আছে।
সাড়ে ছটা বেজে গেল, শফিক এল না। শাহানা বলল, তুমি একাই টুনীকে নিয়ে ছবি তুলে আস ভাবী, ভাইয়া আসবে না।
বলেছিল তো আসবে।
আসার হলে এসে যেত। চল, আমরা তিন জনে একটা রিক্সা নিয়ে চলে যাই। শ্যামলীতে একটা ভালো স্টুডিও আছে।
আরেকটু দেখি।
শুধু শফিক নয়, বন্যাও আসে নি। নীলুর মন খারাপ হয়ে গেল। এত চম ৎকার করে ঘর সাজানো হয়েছে, অথচ লোকজন কেউ নেই। কেউ আসুক না-আসুক, শফিক তো আসবে। হোসেন সাহেব বললেন, টুনী ঘুমিয়ে পড়বে বৌমা, কেকটা কাটাও। আনিস ম্যাজিক শুরু করুক, আমরা দেখি বসে বসে। উৎসবটা জমছে না মোটেই। নীলু মৃদুস্বরে বলল, আরেকটু অপেক্ষা করি, ও এসে পড়বে।
