তোমাদের এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই? ক্যাস্টিন–ফ্যান্টিন কি আছে?
আছে। চল যাই।
ক্যান্টিন দেখে রফিক মুগ্ধ হয়ে গেল। নিচু গলায় বলল, কাজ করলে এইসব বিদেশী ফার্মেই কাজ করতে হয়। তুমি ভাবী আমার জন্যে একটু টুটাই করবে। বস-টসদের ভজিয়ে ভাজিয়ে বলবে আমার কথা।
ওরা কি আমার কথা শুনবে?
এখন না শুনুক, বৎসরখানেকের মধ্যেই শুনবে তোমার কাজকর্মে খুশি হয়েই ওরা শুনবে। শুনতেই হবে।
তোমার ধারণা, আগামী এক বৎসরের মধ্যে তোমার চাকরি হচ্ছে না?
অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে সে-রকমই মনে হচ্ছে! অবস্থা সুবিধার না ভাবী।
হাল ছেড়ে দিচ্ছ নাকি?
এখনো ছাড়ি নি, ধরেই আছি। তবে ধরে থাকতে থাকতে হাত ব্যথা হয়ে গেছে।
রফিক উঠে দাঁড়াল। নীলু বলল, যাচ্ছ কোথায় এখন?
এক বন্ধুর বাসায়।
এখন কি আর কারো বাসায় যাবার সময়?
আনএমপ্লয়েডদের সময়-অসময় বলে কিছু নেই।
তোমার বন্ধুও কি আন এমপ্লয়েড?
রফিক কোনো জবাব দিল না। সে হেটে হেঁটে চলে এল পুরানো ঢাকায়। শারমিনদের বাসায় যাবার তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবু সে কেন জানি দুপুরবেলায় উপস্থিত হল সেখানে। কাজের মেয়েটি বলল, আপা ঘুমাইতেছে। ডাকমু?
না, কোনো দরকার নেই। আমি অপেক্ষা করব। ঘুম ভাঙলে খবর দিও। পত্রিকা বা ম্যাগাজিন কিছু থাকলে দিয়ে যাও, বসে বসে পড়ি।
বড়লোকদের বাড়ির কাণ্ডকারখানাই অন্য রকম। কাজের মেয়েটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফির লেটেস্ট সংখ্যাটি দিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে চা এবং কেকও এসে গেল। চা খেতে খেতে পত্রিকা ওন্টাতে ভালোই লাগছে। চম ৎকার সব ছবি। বিদেশী পত্রিকাগুলি ছবি দেখার জন্যেই বের হয় সম্ভবত। একটি এস্কিমো পরিবারের ছবি দেখে রফিক মুগ্ধ হল। স্বাস্থ্যে সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। দেখেই মনে হয়। চমৎকার একটি জীবন এদের। পাস করে চাকরি খুঁজতে হয় না। বাড়ি বানানোর জন্যে জমি কিনতে হয় না। যেখানে পছন্দ সেখানেই বরফের একটা ঘর বানিয়ে নিলেই হল। রাতে তিমি মাছের তেলের বাতি জ্বলিয়ে সবাইকে নিয়ে গল্পগুজব চলবে। বাইরে হুঁ-হু করে বইবে তুষারঝড়। চমৎকার একটা জীবন। রফিক একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল।
আরে, তুমি কখন এসেছ?
এই তো কিছুক্ষণ!
আমাকে ডাক নি কেন?
সারা দুপুর ঘুমিয়ে শারমিনের চোখ ভারি হয়ে আছে। এলোমেলো করে পরা শাড়ি, চুল বাঁধা নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে দৃশ্যটি এত সুন্দর।
চা দিয়েছে?
হুঁ।
কোনো কাজে এসেছ, না এমনি এসেছ?
এমনি এসেছি।
এস আমার সাথে।
কোথায়?
আসতে বলছি,আস।
শারমিন তাকে নিয়ে এল দারোয়ানের ঘরের পাশের ছোট্ট ঘরটিতে। মাটি শুয়ে আছে সেখানে। শারমিনকে ঢুকতে দেখে এক ধরনের ঘড়ঘড় শব্দ করল। শারমিন মৃদুস্বরে ডাকল, মাটি সাহেব। মাটি মাথা তুলে এক বার মাত্র তাকাল, তারপরই মাথা নামিয়ে নিল।
ও বাঁচবেনা। এই ঘরেই তার শেষশয্যা।
বলতে বলতে শারমিনের গলা ভারি হয়ে এল। কেঁদে ফেলবে নাকি?
বেচারার এত কষ্ট হচ্ছে! সারা রাত ঘুমায় না। কাঁদে শুধু।
রফিক কিছু বলল না। শারমিন নিচু হয়ে মাটির মাথায় হাত রাখল। চাপা। স্বরে বলল, পশুদের সবচে বড়ো কষ্ট হচ্ছে এরা নিজেদের কষ্টের কথা অন্যদের বলতে পারেনা।
অনেক মানুষও সেটা পারে না।
বাজে কথা বলবে না। মানুষ ঠিকই পারে। আজ তোমার মনে কোনো কষ্ট হলে সেটা তুমি কাউকে বলবে না?
সব কষ্টের কথা কি বলা যায়? কিছু কিছু কষ্টের কথা কখনো বলা যায় না।
শারমিন বলল, মাটি মারা গেলে আমার খুব কষ্ট হবে। আমার বন্ধু কেউ নেই। মাটিই আমার বন্ধু।
শারমিন উঠে দাঁড়াল। হালকা গলায় বলল, আজ কিন্তু তুমি রাতে খাবে এখানে।
কেন?
একা একা খেতে আমার খুব খারাপ লাগে। বাবা চিটাগাং গেছেন, কাল আসবেন। তুমি না এলে সাব্বির ভাইকে আসতে বলতাম।
উনি আমেরিকায় যান নি?
সামনের সপ্তায় যাবেন। মামার বাসায় আছেন। সাত দিনের জন্যে এসে বেচারাকে দুমাস থাকতে হল। মায়ের অসুখ।
তুমি কি তাকে আপনি—আপনি করে বল?
হুঁ।
কেন, আপনি বল কেন?
তুমি বলতে কেমন জানি লজ্জা লাগে।
উনি কিছু বলেন না। এ নিয়ে?
খুব একটা বলেন না। হঠাৎ এক-আধা দিন বলেন।
বাগানে বসে চা খাওয়া গেল না। টিপটপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। শারমিন বলল, এস, দোতলায় বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখি।
বৃষ্টির মধ্যে দেখার কী আছে?
দেখার কিছু নেই? কী বল তুমি!
আমার মধ্যে এত কাব্য ভাব নেই।
সন্ধ্যা পর্যন্ত রফিক বারান্দায় বসে রইল। তেমন কোনো কথাবার্তা ওদের মধ্যে হল না। শারমিন কেমন অন্যমনস্ক। কথাবার্তা কিছুই বলছে না। রফিকের হঠাৎ খুব মন খারাপ হল। কেন সে বারবার ঘুরে ঘুরে এখানে আসে? এটা ঠিক না। কেন সে আসবে?
শারমিন, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, উঠি।
খেয়ে যেতে বললাম না?
না, আজ থাক, অন্য এক দিন।
আজ অসুবিধা কী?
রফিক হালকা স্বরে বলল, আজকের রাতটা খুব চমৎকার। তুমি সাব্বির সাহেবকে আসতে বল। দু জনে মিলে খাওয়াদাওয়ার পর বারান্দায় বসে গল্পটল্প কর।
শারমিন কিছু বলল না। রফিক উঠে দাঁড়াল। অন্য সময় শারমিন আসত তার সঙ্গে সঙ্গে। ড্রাইভারকে বলত পৌঁছে দিতে। আজ সে কিছুই করছে না।
রফিক ভিজতে ভিজতেই রওনা হল। তার বারবার ইচ্ছা করছিল। পেছনে ফিরে শারমিনকে এক বার দেখতে। কিন্তু সে তাকাল না। মাটি সাহেব কাঁদছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে সে কান্না মিশে কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে। গেটের সদারোয়ান বলল, চলে যাচ্ছেন নাকি সারা?
