আজ নীলুর একটি বিশেষ দিন। চাকরিতে যোগ দেবার তারিখ। সাড়ে নটায় শফিক বলল, এস খেয়ে নিই। নীলুর লজ্জা করতে লাগল। সে বলল, তুমি খেয়ে নাও।
খাবে না?
ইচ্ছা করছে না। ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নেব।
খেতে বসল শফিক একাই। নীলু বসল। তার সামনের চেয়ারো মনোয়ারা খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর মুখ গভীর। তিনি নীলুর দিকে এক বারও তাকাচ্ছেন না। শফিক বলল, এখানে বসে আছ কেন? তৈরী হও।
নীলু তৈরী হয়েই ছিল। তবু উঠে পড়ল। হোসেন সাহেব শোবার ঘরে বসে পত্রিকা দেখছিলেন। নীলুকে ঘরে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে তাকালেন, তৈরি নাকি মা?
হ্যাঁ।
নীলু পা ছুঁয়ে সালাম করল। হোসেন সাহেব দরাজ গলায় বললেন, ফি আমানুল্লাহ মা। ফি আমানুল্লাহ।
নীলু একটু ইতস্তত করে বলল, বাবা, আমার এই চাকরি করতে যাওয়া নিয়ে আপনার কি কোনো আপত্তি আছে?
হোসেন সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপত্তি থাকবে কেন?
মা বোধহয় খুব একটা পছন্দ করছেন না।
এখন না করলেও পরে করবে।
ওনার উপর অনেক ঝামেলা পড়বে।
সহ্য হয়ে যাবে। তাছাড়া টুনী তো বিরক্ত করে না। আমি দেখব টুনীকে।
যাই তাহলে বাবা।
যাও মা। দশ বার ইয়ামুকাদ্দেমু পড়ে, ডান পা আগে ফেলে ঘর থেকে বেরবে।
মনোয়ারা শেষ পর্যন্ত গম্ভীর হয়েই রইলেন। বৌয়ের চাকরির ব্যাপারটি তিনি গোড়া থেকেই অপছন্দ করে এসেছেন। শফিককে বেশ কয়েক বার বলেছেনও। কিন্তু শফিক কোনো উত্তর দেয় নি। যেন এ ব্যাপারে তার কোনো রক্তব্য নেই। কিছু জিজ্ঞেস করলে শফিক এমন ভাব করে, যেন এর উত্তর দেয়াটা জরুরি নয়। গতকাল রাতেই তিনি শফিককে ডেকে বললেন, আমি এই বয়সে সংসার সামলাব কী করে? শফিক হাই তুলে বলেছে, অসুবিধা হবে না। কাজের একটা লোক তো আছে।
ঐ লোককে আমি এক্ষুণি বিদায় করব।
কেন?
এত বড় একটা জোয়ান কেউ রাখে। বাসায়? কোন দিন সবাইকে খুন করে জিনিসপত্র নিয়ে ভাগবে।
ওকে তাড়ালে তোমারই অসুবিধা হবে মা?
হোক অসুবিধা।
মনোয়ারা কাজের লোকটিকে সত্যি সত্যি বিদায় করে দিলেন। এতেও শফিক কিছু বলল না। ছেলেদের সংসারে থাকার কাল কি তাঁর শেষ হয়েছে? বোধহয় হয়েছে।
রফিক অফিস পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল। সে তার স্বভাবমতো বকবক করছে। নীলুর কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না, তবু বলতে হচ্ছে। রফিক সঙ্গে থাকলে কথা না-বলে থাকা মুশকিল।
কি ভাবী, গুমি হয়ে আছ কেন? আজকে তোমার খুশির দিন। আনন্দ-ফুর্তি কর।
কী আনন্দ-ফুর্তি করব?
গান-টান গাও।
কী যে পাগলের মতো কথা বল।
আমি হলে তাই করতাম। রিক্সায় যেতে যেতে গান ধরতাম, কী আনন্দ চারিধারে কী আনন্দ চারিধারে!,
টুনীকে ছাড়া এতক্ষণ থাকতেই পারব না।
খুব পারবে। আর এত ভয় পাচ্ছি কেন? আমরা সবাই দেখব। চোখে-চোখে রাখব।
সারা দিন তো তোমার দেখাই পাওয়া যায় না। তুমি আবার চোখে-চোখে কি রাখবো?
আমি না রাখলেও অন্যরা রাখবে।
রফিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে নেমে গেল। মতিঝিল পর্যন্ত তার যাবার কথা, কিন্তু সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে এমনভাবে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামল, যেন খুব জরুরি কোনো কাজের কথা হঠাৎ মনে পড়েছে। অথচ তেমন কোনো কাজই নেই। রাস্তায় হাঁটা। এই হাঁটার মধ্যেই পরিচিত, অর্ধ-পরিচিত কারের সঙ্গে দেখা হওয়া।
এ্যাই, রফিক না?
হুঁ।
চিনতে পারছিস?
না।
বলিস কি, আমি ইয়াসিন। কলেজে তোর সঙ্গে পড়তাম।
ও ইয়াসিন। আছিস কেমন?
ভালো। এখন বিটিসিতে আছি।
গুড।
বেতনপত্র মন্দ না। তিনটা বোনাস আছে; আসিস একদিন মোমার এখানে, ফ্রি সিগারেট দেব। খাস তো সিগারেট?
খাই।
আসিস তাহলে অফিসে।
আচ্ছা আসব।
শফিস কোথায়, কি, কিছুই না বলে চলে গেল। ইয়াসিন। অনেক দিনের পুরোনো পরিচিতদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু অবশ্যি আশা করা যায় না। ইউনিভার্সিটির বন্ধুরাই যেখানে দায়সারা গোছের কথা বলা শুরু করেছে! সেদিন করিমের সঙ্গে দেখা। সুন্দর একটি মেয়ে সঙ্গে নিয়ে নিউ মার্কেটে ঘুরছে। হাঁটার ভঙ্গি দেখেই বলে দেয়া যায়, নতুন বিয়ে। সঙ্গের মেয়েটি তাঁরই স্ত্রী, অন্য কারোর নয়, এটা বোঝানোর প্রবল চেষ্টা। গর্বিত দৃষ্টি। রফিক দূর থেকে ডাকল—করিম নাকি?
করিম অনুৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে এল। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারত, তা এল না। সুন্দরী মেয়েটি ঘাড় কাত করে বইয়ের দোকানে বই দেখতে লাগল।
কি রে, বিয়ে করেছিস নাকি?
হুঁ, হুঁট করে হয়ে গেল। কাউকে খবর দিতে পারি নি। তুই আছিস কেমন?
ভালোই।
দাড়ি-টাড়ি যেভাবে বড়ো করছিস-দরবেশ হয়ে যাচ্ছিস মনে হয়?
চেষ্টা করছি।
চাকরি-বাকরি?
হবে হবে করছে। যা তুই, তোর বৌ বিরক্ত হচ্ছে।
করিম প্রায় ছুটে গেল তাঁর পুতুল-পুতুল স্ত্রীর কাছে। সময় বদলে যাচ্ছে। পুরানো বন্ধুত্বের গাঁথুনি আলগা হয়ে যাচ্ছে। আর পাঁচ বছর পর এক জন অন্য জনের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলবে, কেমন, ভালো? ব্যস, ফুরিয়ে গেল।
দুপুরে রফিক নীলুর খোঁজ নিতে গেল। হাসিমুখে বলল, দেখতে এলাম কাজকর্ম কেমন এগোচ্ছে।
নীলুর জন্যে ছোটখাট ছিমছাম একটা ঘর। টেবিলের উপর একটা টেলিফোন। রফিক চোখ কপালে তুলে বলল, টেলিফোনও আছে নাকি?
সবার টেবিলেই আছে। পিবিএক্স। ডিরেকটি লাইন না।
খুব মালদার পার্টি মনে হচ্ছে।
নীলুর লজ্জা করতে লাগল।
কাজকর্ম শুরু করেছ নাকি?
না। প্রথম দিন কাজকর্ম কিছু নেই। এটা-ওটা শিখছি। দুপুরবেলা ঘুরঘুর করছ কেন, বাসায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া কর।
