দেখতে ভালোই। বরিশালের মেয়েরা খুব সুন্দর হয়। হাসছ কেন তুমি ভাবী? এর মধ্যে হাসির কিছু নেই। এটা একটা সিরিয়াস ব্যাপার।
বিয়ের ভয়েই পালিয়ে এসেছ?
সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা ভালো লাগে না।
তুমি ওদের বলে এসেছি তো, নাকি না-বলে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এসেছে?
রফিক কোনো উত্তর দিল না। পরবর্তী বেশ কিছুদিন কাটাল গম্ভীর হয়ে। নীলু ঠাট্টা-টাট্টা করবার চেষ্টা করল, কী রফিক, বরিশাল-কন্যার জন্যে মন খারাপ নাকি?
একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে কী সব ঠাট্টা কর, ভালো লাগে না।
মেয়েটির দিকে দরদ একটু বেশি বেশি মনে হচ্ছে।
স্টপ ইট ভাবী। প্লীজ।
বিসিএস পরীক্ষাও রফিকের ভালো হল না। ইংরেজি এবং ইতিহাস দুটার কোনোটাতেই নাকি পাশ মার্ক থাকবে না। রফিকের ধারণা, এগজামিনররা খাতা দেখে হাসাহাসি করবে। হোসেন সাহেব বললেন, এতটা খারাপ হল কেন?
বোগাস সব কোশ্চেন করেছে, খারাপ হবে না?
বিসিএস-এ বোগাস প্রশ্ন করবে। কেন?
করলে তুমি কী করবে বল? সব মাথা-খারাপের দল। ইতিহাসের প্রশ্ন পড়লে মনে হয় জিওগ্রাফির কোশ্চেন।
বলিস কি?
বিশ্বাস না হলে তুমি পড়ে দেখ।
পরীক্ষা খারাপ দিয়ে রফিক খুবই মুষড়ে পড়ল। সে ধরেই নিয়েছিল, ভালো করবে। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কও কমে গেল নাশতা খেয়ে বেরিয়ে যায়, রাত দশটা—এগারটায় ফেরে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই রেগে যায়। কথাবার্তা যা হয় নীলুর সঙ্গেই। তাও সব দিন নয়, যেদিন মেজাজ ভালো থাকে সেদিন।
নীলু বুঝতে পারে, রফিক হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেছে। এটা কাটিয়ে তোলার জন্যে তার কিছু করা উচিত, কিন্তু সে কী করবে বুঝতে পারে না। আগে মাসের মধ্যে বেশ কয়েক বার রফিক টাকা চাইত। এখন আর চাচ্ছে না। চাইতে লজ্জা পাচ্ছে বোধহয়! দিন দশেক আগে হঠাৎ করে চাইল, ভাবী, তোমার গোপন সঞ্চয় থেকে কিছু দিতে পারবে?
কত?
সামান্য কিছু, ধর পঞ্চাশ।
নীলু এক শ টাকা এনে দিল।
গোটাটা দিলে নাকি ভাবী?
হুঁ, দিলাম।
থ্যাংকস। মেনি থ্যাংকস।
আমাকে থ্যাংকস্ কেন? তোমার ভাইকে দাও। আমি তো তার ধনেই পোদারি করছি।
ভাইয়াকেও থ্যাংকস। আমি ভাবী, সব লিখে রাখছি। ভেরি সুন তোমাদের সব পয়সা ফেরত দেব, উইথ ইন্টারেস্ট।
ঠিক আছে, দিও।
মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই একটা কিছু হবে।
তাই নাকি?
সেভেন্টি পারসেন্ট পসিবিলিটি। জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে বলেছে।–আপনার মত ইয়াং এ্যাকটিভ ম্যানদেরই এখন দরকার। নিউ ব্লাড। নিউ আইডিয়া।
বেতন কেমন?
ফ্যানটাস্টিক বেতন। বিদেশী কোম্পানি।
তোমার ভাইয়েরটাও তো বিদেশী কোম্পানি। বেতন তো এমন কিছু না।
কোম্পানিতে কোম্পানিতে বেশিকম আছে ভাবী।
তোমাদেরটা খুব রমরমা কোম্পানি বুঝি?
খুবই রমরমা। গাড়ি এসে দিয়ে যাবে, নিয়ে যাবে।
বল কি!
কোম্পানির নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। গ্ৰী বেড রুম। দেখলে মাথা ঘুরে যাবে।
ফ্ল্যাট দেখে এসেছ?
না, আমি দেখি নি। ঐ অফিসের অন্য অফিসারদের সঙ্গে আলাপ হল। সবাই বেশ মাইডিয়ার।
তাই নাকি?
হুঁ। বেশ কয়েক জন মহিলা আছেন। বড়ো বড়ো পোস্টে! বুঝলে ভাবী, মেয়েদের জন্যে আজকাল চাকরির খুব সুবিধা। তুমি যদি চেষ্টা কর, উইদিন টুমানথাস একটা কিছু জুটিয়ে ফেলতে পারবে।
সত্যি।
ইউ বেট। বি. এ. পাশ আছ। দেখতে–শুনতেও মোটামুটি খারাপ না! চলে যাও।
চলে যায় মানে?
ডানাকাটা পরী তুমি নও ভাবী। এ-রকম কোনো মিসকলো পসন থাকা উচি৩ না। তবে দেখতে খারাপও না।
নীলু হেসে ফেলল। রফিক সিগারেট ধরিয়ে উৎসাহের সঙ্গে বলল, আমার কথা শোন ভাবী, চাকরির চেষ্টা কর। এই যুগে একার রোজগারে কিছু হয় না। দু জনে মিলে হাল ধরা।
তোমার ভাই পছন্দ করবে না।
এর মধ্যে পছন্দ-অপছন্দের কিছু নেই। কোশ্চেন অব সারভাইভেল।
চাকরির ব্যাপার নিয়ে অনেক দিন থেকেই নীলু ভাবছে। বন্যা গত মাসে এসেছিল। তাকে এক সময় বলেই ফেলেছে, তুই বলেছিলি আমার জন্যে একটা ব্যবস্থা করে দিবি। চাকরি জুটিয়ে দিবি। মনে আছে?
মনে থাকবে না কেন? করতে চাস?
হুঁ। কী রকম চাকরি?
মোটামুটি ধরনের একটা কিছু, তোকে তো আর ফস করে ক্লাস ওয়ান অফিসার বানিয়ে ফেলবে না।
কেরানির চাকরি?
অসুবিধা আছে? দেড়-দু হাজার টাকা পাবি সব মিলিয়ে। এই বাজারে এটাই-বা মন্দ কী? কারবি? তাহলে আগামী সোমবার আয় আমার অফিসে। আমি কথা বলে রাখব।
কার সঙ্গে কথা বলবি?
লোক আছে। তুই আয় তো।
নীলু সোমবারে যেতে পারেনি। বুধবারে সত্যি সত্যি গিয়ে উপস্থিত। বন্যা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিল। হাসিমুখে বলল, তোর এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে হাতে দেবার ব্যবস্থা করতে না পারলে আমার নাম বন্যা নয়।
বলিস কি তুই!
মামাকে তোর কথা বলে রেখেছি। সার্টিফিকেটগুলি এনেছিস?
না।
বললাম না। সার্টিফিকেটগুলি সব আনতে?
এখন গিয়ে নিয়ে আসব?
আচ্ছা থাক, পরে হলেও চলবে।
মতিঝিলের এমন একটি অফিসে তারা ঢুকল যে, নীলুর বুক কাঁপতে শুরু করল। রিসিপশনে উগ্র ধরনের সাজ-করা ভারি সুন্দরী একটি মেয়ে। ঝক ঝক তকতক করছে চারদিক।
এইটাই নাকি অফিস?
হুঁ, কেন, পছন্দ হচ্ছে না?
নীলু কিছু বলল না। বন্যা বলল, চল, মামার সঙ্গে তোকে পরিচয় করিয়ে দিই। মুখ এমন শুকনো করে রেখেছিস কেন?
নীলু ফিসফিস করে বলল, এখানে আমার চাকরি হবে না।
বুঝলি কী করে হবে না?
আমার মন বলছে হবে না। কিছু কিছু জিনিস। আমি টের পাই। সিক্সথ সেন্স।
