যাবিটা কোথায়?
যেখানে ইচ্ছা যাও। শুধু চোখের সামনে থাকবে না।
আই সি। .
কী, দাঁড়িয়ে আছ কেন?
যাচ্ছি, শেষে আফসোস করবে কিন্তু।
হোসেন সাহেব কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। নীলু কাপড় ইন্ত্রি করছিল, তাকে গিয়ে বললেন, চললাম মা। নীলু আশ্চর্য হয়ে বলল, কোথায় চললেন? তিনি তার জবাব দিলেন না। অনেক সময় নিয়ে হ্যাণ্ডব্যাগ গোছালেন এবং এক সময় সত্যি সত্যি বেরিয়ে গেলেন।
নীলু খুব একটা বিচলিত হল না। হোসেন সাহেব প্রায়ই এ রকম গৃহত্যাগ করেন, ঘণ্টা দু-এক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেন এবং এক সময় বাড়ি ফিরে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, হোসেন সাহেবের গৃহত্যাগের কিছুক্ষণের ভেতরই মনোয়ারার দাঁতের ব্যথার আরাম হল। তিনি এক কাপ লেবু-চা এবং দু স্নাইস রুটি খেলেন। রাতের বেলা কী রান্না হচ্ছে খোঁজ নিলেন, তারপর শাহানার সঙ্গে ছোটখাটো একটা ঝগড়া বাধিয়ে বসলেন। ঝগড়া বাধানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তিনি বেশ স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোদের রেজাল্ট বেরুতে এত দেরি হচ্ছে কেন?
শাহানা গম্ভীর গলায় বলল, আমি কী করে বলব। এত দেরি হচ্ছে কেন।
মনোয়ারা অবাক হয়ে বললেন, তুই এমন ক্যাটক্যাট করে কথা বলছিস কেন? একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম, আর ছ্যাৎ করে উঠলি? তোর সঙ্গে কি কথাও বলা যাবে না?
শাহানা থমথমে মুখে তাকাল। তিনি তীক্ষ্ণ কষ্ঠে বললেন, তোর তেল বেশি হয়েছে। কাজকর্ম নেই তো, শুধু বসে বসে খাওয়া। বসে-বসে খেলে এমন তেল হয়ে যায়।
এ-রকম বাজে করে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলবে না, মা।
বাজে করে কথা বলব না?
না।
কেন? তুই কি রানী ভিকটোরিয়া?
হ্যাঁ, আমি রানী ভিকটোরিয়া।
চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব। মুখে-মুখে কথা।
শাহানা নিঃশব্দে উঠে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল, এবং দরজা বন্ধ করে দিল। শাহানার দরজা বন্ধ করা একটা ভয়াবহ ব্যাপার, সহজে এ দরজা সে খুলবে না। ক্রমাগত দুদিন দু রাত দরজা বন্ধ রাখার রেকর্ড তার আছে। এ দরজা কবে খুলবে কে জানে।
মনোয়ারা কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লেন।
নীলু বড়ো অস্বস্তির মধ্যে পড়ল। এ বাড়ির সবার এখন মেজাজ খারাপ যাচ্ছে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে রাগোরাগি। নীলুর নিজের মন-মেজাজও ভালো না। এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু মাথা ঘামাতে হয়, এক-এক করে সবার রাগ ভাঙাতে হয়। ভালো লাগে না।
সংসারে অভাব-অনটন বাড়ছে। অনেক চেষ্টা করেও কিছু করা যাচ্ছে না। প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের লোনের টাকা কাটতে শুরু করেছে। বাড়িভাড়া বেড়েছে এক শ টাকা। নীলুর ধারণা ছিল, খুব সহজেই রফিকের চাকরি হয়ে যাবে। ধারণা ঠিক হয় নি। রফিকের কিছুই হচ্ছে না। সপ্তাহে দু-তিনটা করে ইন্টারভ্যু দিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফিরছে, ভাবী, একেবারে মেরেকেটে দিয়েছি।
তাই নাকি?
ইয়েস। স্মার্টলি সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম! যেখানে হাসার দরকার সেখানে মৃদু হাসলাম। যেখানে গভীর হওয়ার দরকার সেখানে গম্ভীর হলাম।
পেরেছ সবকিছু?
এইট্টি পারসেন্ট পেরেছি। যেগুলি পারিনি, সেগুলি পারার কথা নয়।
চাকরি হবে বলছ?
এক জনের হলেও আমার হবে।
বল কি!
দ্যাটস রাইট। এখন চট করে চা-সিগ্রেট খাওয়াও। আমাকে খুশি রাখার চেষ্টা কর। ভবিষ্যতে লাভ হবে। বেতনের দিন ভালোমন্দ কিছু পেয়েও যেতে পার।
শেষ পর্যন্ত অবশ্যি কিছুই হয় না। রফিক নতুন কোনো ইন্টারভুর জন্যে তৈরি হয়। নীলুর বড়ো মায়া লাগে। মনোয়ারা রাগারগি করেন, দুনিয়াসুদ্ধ লোকের চাকরি হয়, তোর হয় না কেন?
হবে। আমারো হবে।
কবে সেটা?
ভেরি সুন। কোনো এক সুপ্রভাতে দেখবে রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠি এসে হাজির?
আমি আর দেখে যেতে পারব না।
এখনো তো পাঁচ মাস হয় নি। পাশ করেছি, এর মধ্যে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন?
যারা হয় না পাঁচ মাসে, তার হয় না পাঁচ বছরে।
চিঠি অবশ্যি একটা আসে রফিকের। রেজিস্ট্রি ডাকে নয়-সাধারণ ডাকে। মনসুর আলি কলেজের প্রিন্সিপ্যালের চিঠি। ইতিহাসের প্রভাষক পদে নিয়োগপত্র। যেতে হবে বরিশালের কোনো এক গ্রামে।
নীলু জিজ্ঞেস করল, যাবে নাকি?
যাব না মানে? অফ কোর্স যাব।
থাকতে পারবে গ্রামে?
খুব পারব। গ্রামের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বিসিএস-এর জন্য সিরিয়াস এপ্রিপারেশন নিয়ে নেব। দেখবে ফার্স্ট-সেকেন্ড কিছু একটা হয়ে বসে আছি।
রফিক মহা উৎসাহে বরিশাল চলে গেল। এবং এক সপ্তাহের মধ্যে মুখ অন্ধকার করে ফিরে এল। শফিক অবাক হয়ে বলল, চলে এলি কেন? রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, আরে দূর, যত ফালতু ব্যাপার! অলরেডি সেখানে একটা ভালো কলেজ আছে। রেষারেষি করে আরেকটা কলেজ দিয়েছে। না। আছে মাস্টার, না আছে ছাত্র। এগার জন টীচার আছে, এরা গত পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছে না।
বলিস কি।
আমি যাওয়ামাত্র প্রিন্সিপ্যাল আমার জন্যে একটা জায়গীরের ব্যবস্থা করে ফেলল। নাইনে পড়ে এক মেয়ে, তাকে পড়াতে হবে। তার বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। চিন্তা কর অবস্থা।
শফিক কিছু বলল না। রফিক শুকনো মুখে বলল, বুলে থাকতাম সেখানেই, কিন্তু মেয়ের বাবার কথাবার্তা যেন কেমন-কেমন।
কেমন–কেমন মানে?
ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় মেয়ে বিয়ে দিতে চায় আমার কাছে।
বলিস কি!
হ্যাঁ। ভদ্রলোক প্রথম প্রথম আমাকে ভাই বলত, তারপর বলা শুরু করল-আপনি আমার ছেলের মতো।
নীলু বলল, মেয়েটি দেখতে কেমন?
