এই মাটি, তোমার এ কি অবস্থা।
মার্টি শুয়েই রইল, ছুটে এল না। ওর শরীর ভালো নেই। শরীর ভালো থাকলে এভাবে শুয়ে থাকতে পারত না। ডাকামাত্র ছুটে আসত। শারমিন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডাকল, জয়নাল, জয়নাল।
জয়নাল অল্প কিছু দিন হল চাকরিতে যোগ দিয়েছে। তার আসল কাজ হচ্ছে মাটির দেখাশোনা। একটি কুকুরকে দেখাশোনার কাজ তার কাছে খুব অপমানজনক মনে হয়েছে বলেই বোধহয় সে কখনো মাটির ধারে কাছে থাকে না। আজও ছিল না। শারমিনের গলা শুনে ছুটে এল।
মার্টিকে গোসল করিয়েছিলে?
জ্বি, আফা।
ওর গা এত ময়লা কেন?
কাদার মইধ্যে খালি গড়াগড়ি করে। কি করমু আফা।
যাও, আবার ওকে পরিষ্কার কর। মাটি উঠে আয়।
মাটি উঠে এল না। ঝিমুতে লাগল। জয়নাল বলল, এ আর বাঁচত না, আফা!
বুঝলে কী করে?
লেজ নাইম্যা গেছে দেখেন না? লেজ নামলে কুত্তা বাঁচে না।
জয়নালকে খুব উল্লসিত মনে হল। যেন সে একটা সুসংবাদ দিচ্ছে।
জয়নাল।
জ্বি আফা।
কাল ভোরেই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।
জ্বি, আইচ্ছা।
খাওয়াদাওয়া করছে ঠিকমতো?
জ্বি, করতাছে।
রাতের খাবার কখন দেওয়া হবে?
সইন্ধ্যাবেলা।
আমাকে খবর দেবে তখন। আমি দেখব ঠিকমত খায় কিনা।
শারামিনের অত্যন্ত মন খারাপ হয়ে গেল। মাটি কি সত্যি সত্যি মারা যাবে? মৃত্যুর পর পশুরা কোথায় যায়? ওদেরও কি কোনো স্বৰ্গ-নরক
শারমিন দোতলায় উঠে গেল। বাড়ি এখন একেবারে খালি। বাবা গিয়েছেন মতিঝিল। কখন আসবেন কোনো ঠিক নেই। কী একটা মিটিং নাকি আছে। এসব মিটিং শেষ হতে অনেক দেরি হয়। কোনো কোনো দিন ফিরতে রাত একটা-দেড়টা বেজে যায়। আজও হয়তো হবে। শারমিন কিছুক্ষণ একা একা বারান্দায় বসে রইল। কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। সবচে বড়ো কথা কিছুই করার নেই।
লাইব্রেরি থেকে একগাদা বই, আনা হয়েছে। কোনোটাই পড়া হয় নি। মাঝে মাঝে এমন খারাপ সময় আসে, কোনো কিছুতেই মন বসে না। বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হয়।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মার্টিকে খাওয়াবার সময় হয়েছে বোধহয়। শারমিন নিচে নেমে এল, এবং অবাক হয়ে দেখল রফিক বসে আছে।
আরে, তুমি কখন এসেছ?
প্রায় মিনিট পাঁচেক। দেখলাম দরজা খোলা, আশেপাশে কেউ নেই। চুপচাপ বসে আছি।
ভালো করেছি। এস আমার সঙ্গে।
কোথায়?
মাটি সাহেবকে ডিনার দেয়া হবে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব।
কুকুর খাবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব, এত শখ আমার নেই। তুমি খাইয়ে আসা। আমি বসছি। এখানে!
অসময়ে হঠাৎ কোত্থেকে এলে?
রফিক গম্ভীর হয়ে বলল, এখানে এক বন্ধুর বাসায় এসেছিলাম, তারপর ভাবলাম এসেছি। যখন, তখন দেখা করে যাই।
বাজে কথা বলবে না। এখানে তোমার কোনো বন্ধুর বাসা নেই। তুমি আমার কাছেই এসেছিলে। ঠিক কিনা বল।
রফিক কিছু বলল না। শারমিন বলল, চা খাবে?
খাব।
চায়ের সঙ্গে আর কিছু?
খাব, তবে মিষ্টি না। আমি মিষ্টি খাই না। ঘরে তৈরি সন্দেশও না।
তোমাকে রোগ লাগছে কোন রফিক?
ভাবীকে নিয়ে রাজশাহী গিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ খুব ছোটাছুটি করেছি। ভাবীর এক বোন মারা গেছে। একটা ছোট্ট ছেলে আছে তার। ছেলেটিকে নিয়ে এমন মুশকিলে পড়েছে সবাই!
মুশকিল কেন?
কোথায় রাখবে, কার কাছ রাখবে-এত ছোট বাচ্চার দায়িত্ব কেউ নিতে চাচ্ছে না।
বল কি।
দ্যাটস ফ্যাকট। তোমাদের মাটির জন্যে নিশ্চয়ই তিন-চার জন লোক আছে। কিন্তু এই বাচ্চাটির জন্যে কেউ নেই।
শারমিন কিছু বলল না। রফিক বলল, রাগ করলে নাকি?
না, রাগ করিনি। তুমি বস, চা নিয়ে আসছি। দুধ-চা না লেবু-চা?
আদা-চা। গলা খুশখুশ করছে।
রফিক ভেবেছিল দশোক গল্পসল্প করে চলে যাবে, কিন্তু সে রাত আটটা পর্যন্ত থাকল। এর মধ্যে যে কবারই সে উঠতে চেয়েছে, শারমিন বলেছে, আহ, বস না। এত ব্যস্ত কেন?
রাত হয়ে যাচ্ছে, অনেক দূর যাব।
যাবার ব্যবস্থা আমি করব। আজ আমার সঙ্গে ভাত খাবে।
সে কি, কেন?
কেন আবার কি? খেতে বলেছি তাই খাবে।
তোমাদের রান্না কী?
জানি না কি।
তোমাদের কখন কী রান্না হয় তা তোমরা জান না?
শারমিন কিছু বলল না।
খাও কিসে? রুপোর থালাবাটিতে?
বকবক করবে না। খেতে বসলেই টের পাবে কিসে খাই।
খাওয়াটা হবে কখন?
একটু দেরি হবে। বাবুর্চিকে নতুন একটা আইটেম রান্না করতে বলেছি।
আইটেমটি কী?
খেতে বসলেই টের পাবে! এখন আমার সঙ্গে এস, মার্টিকে খাওয়ান হবে।
আসতেই হবে?
হ্যাঁ, আসতেই হবে।
রহমান সাহেব ফিরলেন রাত দশটায়। শারমিন একটি ছেলের সঙ্গে ডিনার খাচ্ছে, এবং কিছুক্ষণ পরপর শব্দ করে হেসে উঠছে। এই দৃশ্যটি তিনি অবাক হয়ে দেখলেন। শারমিন বাবাকে দেখতে পায় নি।
রহমান সাহেব নিঃশব্দে দোতলায় উঠে গেলেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম কিছু ভাঁজ পড়ল।
মনোয়ারার গাল ফুলে
মনোয়ারার গাল ফুলে একটা বিশ্ৰী কাণ্ড হয়েছে।
সারা দিন কিছুই মুখে দেন নি। ব্যথায় ছটফট করেছেন। ব্যথা কমানোর কোনো ওষুধ কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না।
সবচে মুশকিল হয়েছে হোসেন সাহেবের। তাঁকে দেখামাত্র মনোয়ারার রাগ চড়ে যাচ্ছে। যা মনে আসছে, তাই বলছেন। হোসেন সাহেব অনেকক্ষণ সহ্য করলেন। কিন্তু এক সময় স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁর ধৈর্য্যচ্যুতি হল। তিনি থমথমে মুখে বললেন, আমার উপর রাগ করছ, কেন? তোমার দাঁতব্যথা তো আমি তৈরি করিনি। সে-রকম কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
মনোয়ারা চোখ-মুখ কুঁচকে বললেন, আমার সামনে থেকে যাও তো। শুধু শুধু ভ্যাজভ্যাজ করবে না।
