কোনো চাকরির ব্যাপার?
জ্বি-না, কোনো চাকরির ব্যাপার নয়।
ব্যাপারটা কী?
আপনি আগে দেখুন, তারপর বলব।
রহমান সাহেব দেখলেন। অনার্স এবং এম. এস. সি দুটিতেই প্রথম শ্রেণী।
আপনার তো চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়।
না, আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি অন্য ব্যাপারে এসেছি।
বলুন, শুনি।
আমি আমেরিকান একটি ইউনিভার্সিটি-ষ্টেট ইউনিভার্সিটি অব আইওয়াতে টিচিং এ্যাসিসটেন্টশিপ পেয়েছি। সেখানে আণ্ডার-গ্রাজুয়েট ক্লাসে পড়াব, সেই টাকায় পি-এইচ. ডি. করব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে। আমি অত্যন্ত দরিদ্র। আমার আত্মীয়স্বজনরাও দরিদ্র। আমেরিকায় যাবার জন্যে আমার ত্রিশ হাজার টাকার মতো দরকার।
আপনি চাচ্ছেন এই টাকাটা আমি আপনাকে দিয়ে সাহায্য করি?
ধার হিসেবে চাচ্ছি।
এত লোক থাকতে আমার কাছে এসেছেন কেন?
শুধু আপনার কাছে নয়, আরো অনেকের কাছেই গিয়েছি। আমি একুশ জন ইণ্ডাষ্টিয়েলিষ্টের একটি লিষ্ট করেছি। ঠিক করেছি, এদের সবার কাছেই যাব।
লিস্টটা দেখতে পারি?
নিশ্চয়ই পারেন।
সাব্বির লিস্টি বের করে দিল।
আইওয়া ষ্টেট ইউনিভার্সিটির চিঠিটি সঙ্গে আছে?
হ্যাঁ, আছে। রেজিস্টারের চিঠি।
রহমান সাহেব চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন। শান্ত স্বরে বললেন, ওরা আই টুয়েন্টি পাঠিয়েছে?
জ্বি, পাঠিয়েছে।
ভিসা হয়েছে?
হ্যাঁ, হয়েছে।
পাসপোর্টটা দেখাতে পারেন?
পারি।
সাব্বির পাসপোর্ট বের করল। মাল্টিপল এন্টি ভিসা। রহমান সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, টিকেটের টাকা জোগাড় না-করেই ভিসা করেছেন?
হ্যাঁ, করেছি। কারণ টাকার ব্যবস্থা হবেই।
রহমান সাহেব শান্তস্বরে বললেন, ক্যাশ দেব না চেক কেটে দেব?
ক্যাশ হলে ভালো হয়।
তিনি ক্যাশিয়ারকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার ব্যবস্থা করতে বললেন। সাব্বির বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস দেখাল না-যেন এটা তার প্রাপ্য। রহমান সাহেব তাকে বাড়তি কোনো ফেভার করছেন না।
আমেরিকা যাবার আগে সে দেখা করতে পর্যন্ত এল না। ছ মাস পর ইউ গ্লস ডলারে সাব্বির টাকাটা শোধ করল। সেই সঙ্গে চমৎকার একটি চিঠিও লিখল:
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
বড়লোকদের প্রতি আমার এক ধরনের ঘৃণা আছে। সারা জীবন অত্যন্ত দরিদ্র ছিলাম বলেই হয়তো। এখন বুঝতে পারছি, ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভালোমানুষ আছেন। আপনার অনুগ্রহের কথা আমি মনে রাখব। টাকাটা পাঠানোর আগে আমি আপনাকে লিখি নি, কারণ আমি এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগছিলাম। আশা করি, আপনি আমার মানের অবস্থা বুঝতে পারছেন।
বিনীত
সাব্বির
দু বছরের মাথায় সাব্বির দেশে এল। রহমান সাহেবের জন্যে প্রচুর উপহার নিয়ে এল। সাৰ্বিরের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হল তখন। পি-এইচ.ডি শেষ করে আবার সে দেশে এল। শারমিনের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা হল সেই সময়। শারমিন তখন মাত্র কলেজে। সেকেণ্ড ইয়ারে উঠেছে।
দুপুরের খাওয়া সারতে-সারতে দুটা বেজে গেল। খাবার টেবিলে সাব্বির খুব গম্ভীর হয়ে রইল। রহমান সাহেব বললেন, তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
কোন পরিকল্পনার কথা বলছেন?
আমেরিকাতেই থাকবে, না দেশে আসবে?
দেশে আসব। আমেরিকায় থাকব। কেন? পোস্ট ডক শেষ করে ফিরব। এখানকার ইউনিভার্সিটিতে সহজেই আমার চাকরি হবার কথা।
অনেকেই তো ফিরতে চায় না।
আমি চাই। বিদেশের জন্যে আমার কোনো মোহ নেই।
শারমিন বলল, আপনি এত তাড়াহুড়া করছেন কেন, আস্তে আস্তে খান।
দেরি হয়ে যাচ্ছে। জামালপুর যেতে হবে তো।
আজ না গেলে হয় না?
আমার হাতে সময় বেশি নেই। আজই যাব। বাসে করে চলে যাব।
রহমান সাহেব বললেন, বাসে যেতে হবে না। ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি, ও তোমাকে নিয়ে যাবে। তিনটা সাড়ে-তিনটার দিকে রওনা হলেই হবে, তুমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম কর। .
সাব্বিরকে বিশ্রামের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হল না। যেন এই মুহূর্তে তার রওনা হওয়া দরকার। শারমিন বলল, আপনি কি সব সময়ই এমন ছটফট করেন?
তা করি।
এ রকম ভাব করছেন, যেন দু মিনিটের মধ্যে আপনার গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। আপনি আরাম করে বসুন তো, আমি চা এনে দিচ্ছি। শান্ত হয়ে চা খান।
চা আন। আমি বসছি শান্ত হয়ে।
আর শোনেন সাব্বির ভাই, আপনি তো গাড়ি চালাতে জানেন?
জানি। কেন?
আপনি আবার বাহাদুরি করে গাড়ি চালাতে যাবেন না। যা ছটফটে স্বভাব আপনার, এ্যাকসিডেন্ট করবেন।
সাৰ্বির হেসে ফেলল এবং পরীক্ষণেই গম্ভীর হয়ে বলল, শারমিন, তুমিও চল না। আমার সঙ্গে, মা খুব খুশি হবে।
শারমিন হকচকিয়ে গেল।
গাড়ি যখন যাচ্ছে, তখন তো অসুবিধা হবার কথা নয়।
না-না, আমি এখন যাব না।
কেন, অসুবিধাটা কী?
শারমিন কী বলবে ভেবে পেল না। সাব্বির বলল, গল্প করতে—করতে যাব, তোমার ভালোই লাগবে।
চট করে রেডি হওয়া যাবে না। তৈরি হতেও সময় লাগবে!
বেশ তো, না হয়। কাল সকালে যাই। তৈরি হবার সময় পাবে। পাবে না?
শারমিন বিব্রত স্বরে বলল, আমি এখন যাব না, সাব্বির ভাই।
কেন?
আমার যেতে ইচ্ছা করছে না।
সাব্বিরকে দেখে মনে হল, তার আশাভঙ্গ হয়েছে। যেন সে ধরেই নিয়েছিল শারমিন যাবে।
বিকেলে শারমিনের নিজেরও কেমন যেন নিঃসঙ্গ লাগতে লাগল। মনে হল—গেলেই হত। যার সঙ্গে সারা জীবন কাটানো হবে, তার সঙ্গে বিয়ের আগে কিছু সময় কাটানোয় এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হত না। নাকি হত?
শারমিন বাগানে বেড়াতে গেল।
মার্টি বরই গাছের নিচে গা এলিয়ে শুয়ে আছে। সারা গা কাদায় মাখামাখি।
