শাহানা ছাদে উঠে গেল। রাতে তুমুল বৃষ্টি হয়েছে। ছাদ ভেজা। টুনিকে নামানোর প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু সে নেমে পড়ার জন্যে ছটফট করছে। শাহানা আনিসের ঘরে উঁকি দিল।
আনিস তিনিকোণা একটা কাঠের বাক্সে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক মারছিল। শাহানাকে দেখেই চট করে বিছানার চাদর টেনে বাক্স ঢেকে ফেলল। শাহানা অবাক হয়ে বলল, এটা আবার কী!
আনিস বলল, আমার ম্যাজিকের বাক্স। পারলিককে দেখানো নিষেধ আছে।
ম্যাজিকের ব্যাপারটি অল্প কিছু দিন হল শুরু হয়েছে। আনিস মনস্থির করেছে, সে ম্যাজিশিয়ান হবে। পড়াশোনায় তার মাথা নেই। এই লাইনে কিছু করতে পারবে না। তার ধারণা, ম্যাজিকের লাইনে সে উন্নতি করবে।
রশীদ সাহেব মহা বিরক্ত হয়েছেন। কোনো ভদ্রলোকের ছেলে ম্যাজিশিয়ান হতে চায়, এটা ভাবলেই তাঁর মাথায় রক্ত উঠে যায়। সার্কাস, ম্যাজিক এইসব হচ্ছে ফালতু লোকের কাজ। ভদ্রলোকের কাজ না। আনিসকে তিনি ঘাড় ধরেই বের করে দিতেন, কিন্তু মেয়ের জন্যে পারেন নি। বীণা আনিসকে তাড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে শুনেই খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে এমন একটা কাণ্ড করেছে যে, তিনি রীতিমত হকচকিয়ে গেছেন। স্ত্রীকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, প্ৰেম-ফ্রেম না তো? লতিফা রেগে গিয়ে বলেছেন, কী পাগলের মতো কথা বল। বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে নাকি তোমার? চাকর শ্রেণীর একটা লোকের সঙ্গে তোমার মেয়ে প্রেম করবে? এসব নিয়ে আর কোনোদিন কোনো কথা বলবে না।
আনিসকে কি চলে যেতে বলব?
থাক, চলে যেতে বলার দরকার নেই। তবে, ওর এ বাড়িতে ঢোকা আমি বন্ধ করছি।
কীভাবে?
আমি ব্যবস্থা করব, তুমি দেখ না।
ব্যবস্থা তিনি কী করলেন ঠিক জানা গেল না। শুধু দেখা গেল আনিস একটা কেরোসিন কুকার কিনেছে। নিজের রান্না এখন নিজেই রাঁধছে।
আনিসের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্যে লতিফা বেশ কিছু দিন
দেখা যায়। না, দেখা গেল না।
বীণার একটা তালাবন্ধ সুটকেস আছে। চাবি জোগাড় করে গোপনে একদিন সেই সুটকেস খুললেন, যদি চিঠিপত্র কিছু পাওয়া যায়। আনিসের কোনো চিঠি পাওয়া গেল না, তবে পাশা নামের একটি ছেলের কুৎসিত ধরনের একটা চিঠি পাওয়া গেল। সেই চিঠি পড়ে তাঁর রক্ত হিম হয়ে যাবার জোগাড়। কী সৰ্ব্বনাশ!
লতিফা চিঠির কথা কাউকে বলতে পারলেন না। এটি এমনই এক চিঠি, যা কাউকে দেখানো যায় না, কারো সঙ্গে এ নিয়ে গল্পও করা যায় না। বীণা সেই চিঠি সুটকেসের পকেটে যত্ন করে রেখে দিয়েছে কেন কে জানে?
টুনিকে কোলে নিয়ে শাহানা কৌতূহলী হয়ে আনিসের ঘরে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে থাকা জিনিসপত্র দেখছে। সে বলল, সবই কি আপনার ম্যাজিকের জিনিস নাকি আনিস ভাই?
হুঁ।
ঐ আংটাগুলি কী?
লিংকিং রিঙ। একটা চাইনিজ টিক। একটার ভেতর দিয়ে একটা ঢুকে যায়, আবার বের হয়ে আসে।
তাই নাকি? দেখানো না।
এখন দেখান যাবে না, প্রাকটিস নেই। পুরোপুরি ওস্তাদ না হয়ে আমি কোনো ম্যাজিক দেখাব না। বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন, ভেতরে আস।
না।
না, কেন?
ইচ্ছা করছে না।
প্লিজ, আসা। চা বানিয়ে খাওয়াব, আমার ঘরে এখন চা বানানোর সব সরঞ্জাম আছে।
চা আমি খাই না।
টুনিকে কোলে নিয়ে শাহানা নিচে নেমে গেল।
নীলু রান্না চড়াতে গিয়ে দেখল, লবণ নেই। কাজের কোনো লোক নেই। এমন মুশকিল হয় একেক বার। এখন লবণের জন্যে পাঠাতে হবে রফিককে, সে বোধহয় এখনো ঘুমুচ্ছে। ঘুম ভাঙালে সে রাগ করবে। দশটা বেজে যাচ্ছে, শফিকের অফিসে যাবার সময় হয়ে এল। আজ না খেয়েই অফিসে যেতে হবে।
নীলু উঠে এল। রফিককে অনুরোধ–টনুরোধ করে পাঠাতে হবে, এছাড়া উপায় নেই!
রফিকের ঘরের সামনে এসে নীলু থমকে দাঁড়াল। দরজায় নোটিশ ঝুলছে।–রাত তিনটা দশ মিনিটে ঘুমাতে যাচ্ছি। কেউ যেন সকাল এগারটার আগে না ডাকে। ডাকলে খুনখুনি হয়ে যাবে।
পদ্ম নেই। নীলুদরজায় ধাক্কা দিল। রফিক চচিয়ে উঠল, কে?
আমি।
ভাবী, তুমি অন্ধ নাকি? নোটিশ দেখছি না?
দেখছি। উপায় নেই আমার, প্লিজ উঠে আস।
কী করতে হবে?
লবণ এনে দিতে হবে। রান্না চড়াতে পারছি না।
রফিক অত্যন্ত বিরক্ত মুখে দরজা খুলল। বিড়বিড় করে বলল, ভোর রাতে তোমাকে রান্না চড়াতে হয় কেন বল তো? তোমাদের যন্ত্রণায় শান্তিতে একটু ঘুমাবার উপায় নেই।
রফিকের দাড়ি অনেকখানি বড়ো হয়েছে। তাকে দাড়িতে এখন ভালোই লাগছে। স্বাস্থ্যও আগের চেয়ে একটু ভালো হয়েছে। পড়াশোনায় ঝামেলা চুকেছে, এই শান্তিতেই বোধহয়।
এম. এ. পরীক্ষায় রফিকের রেজাল্ট বেশ ভালো হয়েছে। সেকেণ্ড ক্লাস থার্ড। সে সেকেণ্ড ক্লাস আশা করেছিল, তবে নিচের দিকে। রেজাল্ট বের হবার পর অন্যদের চেয়েও সে নিজে বেশি অবাক হয়েছে। নীলুকে বলেছে, আরেকটু খাটাখাটনি করলে ফার্স্ট ক্লাস মেরে দিতে পারতাম ভাবী। কী, পারতাম না?
হ্যাঁ, তা তো পারতেই।
আমি যে এক জন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, তা আগে বুঝতে পারি নি। আগে বুঝতে পারলে রাতদিন পড়তাম। আর তো পড়ার স্কোপ নাই। শেষ পরীক্ষাটাও দিয়ে দিলাম।
বিসিএস-এর জন্যে পড়। বিসিএস দাও।
বিসিএস আমার হবে না, ভাবী। তাইবাতে আউট করে দেবে।
কেন?
বিসিএস-এ চেহারা-টেহারা দেখে। আমার তো সেই দিক দিয়ে জিরো। শর্ট। বোকা-বোকা চাউনি। তাও দাড়িটা থাকায় রক্ষা!
তোমার কি ধারণা, দাড়ি রাখায় তোমাকে খুব হ্যাণ্ডসাম লাগছে?
হ্যাণ্ডসাম না লাগলেও ইন্টেলিজেন্ট লাগছে। চেহারায় একটা শাপনেস চলে এসেছে। কী, আসে নি? একটা অনেষ্ট ওপিনিয়ন দাও তো ভাবী
