হ্যাঁ, হবে। আগস্টেই হবার কথা।
গুড। তাই লিখব। যাও মা, এখন ঘুমুতে যাও। মনে হয় অনেক রাত হয়েছে।
শারমিন উঠে দাঁড়াল এবং হঠাৎ রহমান সাহেবকে অবাক করে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, বাবা, আমি ঠিক করেছি, সাব্বির ভাইকে বিয়ে করব না।
রহমান সাহেব পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেনু মেয়ের দিকে। তাঁর চেহারা বা বসে থাকার ভঙ্গিতে পরিবর্তন হল না। চুরুট নিতে গিয়েছিল, তিনি চুরুট ধরালেন এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বললেন, এই নিয়ে আমি কাল সকালে তোমার সঙ্গে কথা বলব, এখন ঘুমুতে যাও।
শারমিন নড়ল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। রহমান সাহেব শীতল কণ্ঠে বললেন, ঘুমুতে যাও শারমিন।
শারমিন ঘর ছেড়ে গেল। রহমান সাহেব সাধারণত এগারটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। আজ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইলেন। রাত একটায় বারান্দায় হাঁটতে গিয়ে দেখেন, শারমিনের ঘরেও বাতি জ্বলছে। এক বার ভাবলেন, ডাকেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাকলেন না।
ছোটবেলায় শারমিন মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় বসে থাকত। তিনি দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলতেন, ভয় পাচ্ছি মা?
হ্যাঁ।
আমার সঙ্গে ঘুমুবো?
না।
মজনুর মাকে বলব তোমার ঘরে ঘুমুতে? মেঝেতে বিছানা পেতে সে ঘুমুবে।
না।
আচ্ছা ঠিক আছে, সে না-হয় দরজার বাইরে ঘুমাক!।
না, দরকার নেই।
শারমিন অত্যন্ত জেদী। তাকে দেখে অবশ্যি খুব নরম ধরনের মেয়ে বলেই মনে হয়। রহমান সাহেব অত্যন্ত চিন্তিত বোধ করলেন। শারমিনের ভেতর এক ধরনের দৃঢ়তা আছে, যাকে তিনি ভয় করেন। তার সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করতে হবে। সেজন্যে তাঁকে সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা করার মতো বাজে ব্যাপার আর কিছুই নেই।
ভোরবেলা শারমিনকে খুব স্বাভাবিক মনে হল। নিজের হাতে বাবার জন্যে বেড টি নিয়ে এল। মার্টিকে খাবার দিয়ে বাগানে বেড়াতে গেল। তার রোজাকার অভ্যাস হচ্ছে টেবিলে নাশতা না দেয়া পর্যন্ত বাগানে হাঁটা। তার সঙ্গে হাঁটবে মাটি। মাটি খানিকক্ষণ হাঁটবে। আবার দৌড়ে গিয়ে তার খাবার খাবে, আবার ছুটে আসবে শারমিনের কাছে।
নাশতার টেবিলে রহমান সাহেব শারমিনকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করলেন। চেহারায় রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি নেই। তোরবেলায় গোসল করেছে। স্নিগ্ধ একটা ভাব এসেছে চেহারায়। রহমান সাহেব চা খেতে খেতে বললেন, কাল রাতে তুমি একটি প্রসঙ্গ তুলেছিলে, আমরা কি সেটা নিয়ে এখন আলাপ করব?
শারমিন মৃদুস্বরে বলল, আলাপ করার দরকার নেই।
আমি কি লিখব সাব্বিরকে আসবার জন্যে?
হ্যাঁ, লেখা।
কোনো কারণে কি তোমার মন বিক্ষিপ্ত?
না।
রহমান সাহেব নিঃশব্দে চা পান পর্ব শেষ করলেন। চুরুট ধরালেন এবং একসময় ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, চল আমরা বরং বেড়িয়ে আসি কোনো জায়গা থেকে। যাবে?
যাব।
কোথায় যেতে চাও?
আমি জানি না, তুমি ঠিক কর।
নেপালে যাবে? হিমালয়-কন্যা নেপাল।
যাব।
বেশ, আমি ব্যবস্থা করছি।
শারমিনরা পরের সোমবারেই সাত দিনের জন্যে নেপাল চলে গেল। বেড়াতে যাবার জন্যে সময়টা ভালো নয়। প্রচণ্ড শীত, কিন্তু তবু ঢাকা ছেড়ে বেরোতে পেরে শারমিনের ভালোই লাগল। কেমন যেন হাঁপ ধরে গিয়েছিল।
নেপাল থেকে সে সুন্দর একটি চিঠি লিখল সাব্বিরকে।
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
আমরা বেশ কদিন হল নেপালে এসেছি। চমৎকার জায়গা। আপনিও চলে আসুন। আপনি এলে আমার আরো ভালো লাগবে। কিছুদিন ধরেই আমার কেন জানি খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আপনি এলে রাত-দিন আপনার সঙ্গে গল্প করব। আপনার যত কাজই থাকুক, সব ফেলে রেখে আমার সঙ্গে গল্প করতে হবে। গোমড়ামুখের প্রফেসর আমার এতটুকুও পছন্দ নয়।
বিনীতা
শারমিন
টুনির বয়স এখন ন মাস
টুনির বয়স এখন ন মাস।
ন মাস বয়েসী বাচ্চারা বাবা, মা, দুদু এই জাতীয় কথা বলতে শেখে, কিন্তু টুনির ব্যাপারটা হয়েছে এই রকম, সে শুধু শিখেছে একটি শব্দ–জেজে। যাই দেখে উল্লসিত হয়ে ওঠে এবং হাত নেড়ে বলে ওঠে, জেজে।
তাকে কথা শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছে শাহানা। শাহানার পরীক্ষা হয়ে গেছে। কাজেই প্রচুর অবসর। শাহানা ঘোষণা করেছে, এক মাসের মধ্যে টুনিকে সব কথা শিখিয়ে ফেলবে।
শাহানা টুনিকে সোফায় গায়ে হেলান দিয়ে বসিয়েছে। টুনি তাকে লক্ষ করছে তীক্ষ্ণ। শাহানা তার মনযোগ আরো ভালোভাবে আকর্ষণ করবার জন্যে কিছুক্ষণ হাত নাড়ল, তারপর বলল, বল তো টুনি–মামা।
টুনি তার দুটি দাঁত বের করে ফিক করে হেসে ফেলল, তারপর গম্ভীর হয়ে বলল–জেজে।
উহুঁ, জেজে নয়। বল মামা।
জেজে, জেজে।
হল না। বোকা মেয়ে, বল, মা মা।
জে জে। জে…
মোটেও হচ্ছে না। ইচ্ছা করলেই তুমি পারবে। তোমার কত বুদ্ধি!
জে জে। জে…
হচ্ছে না।
জেজে, জেজে, জেজে।
শাহানা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। টুনি হাত বাড়িয়ে দিল। সে কোলে উঠতে চায়। দুটি জিনিস সে খুব ভালো শিখেছে–কোল এবং ছাদ। কোলে উঠেই সে দরজার দিকে দেখাবে। দরজা খোলামাত্র ছাদের দিকে হাত বাড়বে।
ছাদে নিয়ে ছেড়ে দিলে সে নিজের মনে হামাগুড়ি দেবে। মাঝে মাঝে একা একা দাঁড়াতে গিয়ে ধাপ করে পড়ে যাবে। ব্যথা পেলেও কাঁদবে না। অবাক হয়ে বলবে।–জেজে, জেজে।
শাহানা টুনিকে কোলে নিয়ে উঁচু গলায় বলল, ভাবী, আমি ওকে একটু ছাদে নিয়ে যাচ্ছি। কেউ তার কথার কোনো জবাব দিল না। নীলু রান্না ঘরে রান্না নিয়ে ব্যস্ত। মনোয়ারা গেছেন ডেনটিষ্টের কাছে। কাল রাত থেকে তাঁর দাঁতে ব্যথা। আজ গেছেন দাঁত ফেলে আসতে।
