ধারের টাকা সাত দিনের মধ্যে ফেরত এল। মনি অর্ডারের কুপনে তোজল্লি নামের আরবি বানান, বুৎপত্তিগত অর্থ বিশদভাবে লেখা। সেই সঙ্গে লেখা–আমার পুরনো কোনো ছাত্রের সঙ্গে দেখা হলে অবশ্যই তার নাম-ঠিকানা লিখে রাখবে। ভুল হয় না যেন।
সব মানুষের মধ্যেই কিছু রহস্য থাকে।
অমীমাংসিত রহস্য। কবির মামার মধ্যে সেই রহস্যের পরিমাণ কিছু বেশি। তাঁর বাড়ি চৰ্বিশ পরগণার বারাসাতে। বারাসাত থেকে এগার মাইল র বনগ্রামের এক স্কুলে মাস্টারি করতেন। ভাদ্র মাসের এক ভোরবেলায় হঠাৎ তাঁর মধ্যে বৈরাগ্য এসে গেল। ক্যান্বিসের ব্যাগ এবং একটি ছাতা নিয়ে গৃহত্যাগ করলেন। কাউকে কিছু বলে গেলেন না।
পথে বিধু মল্লিকের সঙ্গে দেখা। বিধু মল্লিক বলল, সাত সকালে কোথায় যান? মাস্টার তার জবাবে ফ্যাকাসেভাবে হাসলেন। পরিষ্কার কিছু বললেন না। বিধু মল্লিক বলল, হাবড়া যান নাকি?
হুঁ।
রাতে ফিরবেন না?
হুঁ, ফিরব।
কিন্তু তিনি ফিরলেন না। সেটা বাংলা তেরশ বাহান্ন সন। ভারতবর্ষের ক্রান্তিকাল। দীর্ঘদিন তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
প্রায় এক যুগ পর ইংরেজি উনিশ শ চুয়ান্ন সনে তাঁকে দেখা গোল ময়মনসিংহের নীলগঞ্জে। মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। অত্যন্ত রাশভারি প্রকৃতির মানুষ, কাজকর্মে খুব উৎসাহা। ছ মাসের মধ্যে স্কুলের চেহারা পাল্টে ফেললেন। কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে স্কুল কম্পাউণ্ডের সামনে চমৎকার একটা ফুলের বাগান করলেন। গ্রামের সুকুমান বলাবাল করতে লাগল–তোলসমাতি কাণ্ড। করছে কী পাগলা মাস্টার?
সেবার শীতে ময়মনসিংহ থেকে স্কুল ইন্সপেক্টর জমীর আলি সাহেব স্কুল ইন্সপেকশনে এলেন। বাগান দেখে অবাক হয়ে বললেন, এই বাগান আপনার করা?
জি, স্যার।
নিজের হাতেই করেছেন?
ছাত্ররা সাহায্য করেছে। নিজেও করেছি।
জমীর আলি সাহেব ফিরে গিয়ে স্কুলের সরকারী সাহায্য বাড়িয়ে দিলেন। শুধু তাই না, ময়মনসিংহ জেলার সব কটি মাইনর স্কুলের হেড মাস্টারকে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠালেন। যার সারমর্ম হচ্ছে–ছাত্রদের মানসিক বিকাশ সাধনের জন্যে প্রতিটি স্কুলে ফুলের বাগান থাকা বাঞ্ছনীয়। ফুল ছাত্রদের মনোজগতের উন্নতি ও সৌন্দর্যস্পৃহা বৃদ্ধির সহায়ক ইত্যাদি।
অজ পাড়াগাঁর একটি দরিদ্র দীনহীন স্কুলে রকমারি ফুলের সমারোহ জমীর আলি সাহেবকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল, যার জন্যে তিনি পরের বছরই আবার স্কুল ইন্সপেকশনে এলেন এবং স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন ফুলের কোনো চিহ্নই কোথাও নেই। সে জায়গায় নানা ধরনের সবজির চাষ করা হয়েছে। জমীর আলি থমথমে গলায় বললেন, কী ব্যাপার? কবির মাস্টার গম্ভীর হয়ে বললেন, দরিদ্র দেশে ফুলের বিলাসিতা ঠিক না। শাক-সবজি বিক্রি করে কিছু পয়সা হয়। সেই পয়সা ছাত্রদের পিছনে খরচ করা হয়। সবাই এখানে খুব দরিদ্র।
জমীর আলি রাগী গলায় বললেন, দরিদ্রদের সৌন্দর্যবোধ থাকবে না?
জ্বি-না। আগে পেটে ভাত, তারপর অন্য কিছু। এখানে আমার অনেক ছাত্র আছে, যারা আজ স্কুলে না–খেয়ে এসেছে।
জমীর আলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ফুলগাছগুলি আপনি কি নিজের হাতেই নষ্ট করেছেন?
জ্বি স্যার।
আপনার কষ্ট হয় নি?
জ্বি—না।
পাগল নাকি আপনি! আমি কত জায়গায় আপনার ফুলের বাগানের প্রশংসা করেছি, আর আপনি কিনা সব উপড়ে লাউ, কুমড়া লাগিয়েছেন, আবার বলছেন কষ্ট হয় নি। আপনাকে বোঝা মুশকিল। ইউ আর এ ভেরি স্ট্রেঞ্জ ম্যান।
নীলগঞ্জের লোকেরাও বোধহয় তাঁকে বিচিত্র মানুষ হিসেবেই জানে। জীবন প্ৰায় পার করে দিয়েছেন। এখানে। এখানকার সবাই তাঁকে চেনে, পাগলা মাস্টার হিসেবে। দেখে একটু অন্য রকম চোখে। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সঙ্গে তাদের সেই দৃষ্টিতে কিছু ভয়ও হয়তো থাকে।
গ্রাম্য বড়ো বড়ো সালিসিগুলিতে তাঁকে থাকতে হয়। সমস্যার যখন কোনো রকম মীমাংসা খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন এক জন কেউ বলে–মাস্টার সাব যা বলেন, তা-ই কবির মাস্টারকে তখন কিছু একটা বলতে হয়। এবং তাঁর কথাই হয় সালিসির শেষ কথা। তাঁর মীমাংসা যাদের পছন্দ হয় না, তারাও চুপ করে থাকে। শুকনো মুখে বলে, আচ্ছা ঠিক আছে, মাস্টার সাব বলছেন, এর উপর আর কথা কী? মাস্টার সাবের কথার একটা ইজ্জত আছে না? এক জন মানুষের জন্যে এটা হয়তো তেমন বড়ো কোনো সম্মান নয়, আবার হয়তো ঠিক তুচ্ছ করবার মতোও কিছু নয়।
ভাটি অঞ্চলের মেয়ে বিয়ে করে এনেছে নীলগঞ্জের একজন কেউ। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার বিবাদ। স্ত্রীকে নাইয়ার যেতে দিচ্ছে না। দু বছর হয়ে গেল বাপের বাড়ি যেতে পারছে না মেয়েটি। কোনো উপায় না-দেখে এক সময় সে মাস্টার সাহেবের কাছে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াবে।
মাস্টার সাহেব বলবেন, কার বাড়ির বৌ তুমি? কোনো দিন তো দেখি নি। বৌটি ক্ষীণস্বরে বলবে, মিয়াবাড়ির।
ও, আচ্ছা–সোলায়মানের বৌ। বাটিতে করে কী এনেছ গো মা?
মাছের সালুন।
ভালো, খুব ভালো। রাত্রে আরাম করে খাব। রেখে দাও।
বৌটি তরকারির বাটি রেখে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আর কিছু বলতে চাও নাকি? বলে ফেল, মা। ছেলের কাছে লজ্জার কিছু নেই।
বৌটি তার সমস্যার কথা বলে। মাস্টার সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, রাত্রে যাব এক বার তোমাদের বাড়ি। চারটা ডাল-ভাত খাব তোমাদের ওখানে।
মাস্টার সাহেব যান রাতের বেলা। সোলায়মানকে ডেকে প্রচণ্ড একটা ধমক দেন, চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব। বাচ্চা মেয়ে আটকে রেখে খুব বাহাদুরি দেখাচ্ছে। কাল ভোরেই যেন নৌকা ঠিক হয়।
