ঠিক হয় ভোরবেলাতেই। আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে দীর্ঘদিন পর বৌটি রওনা হয় বাপের বাড়ি।
এক জন ভিনদেশী মাস্টারের এই ক্ষমতাও তো তুচ্ছ করার মতো নয়। এ ধরনের ক্ষমতা হঠাৎ করে আসে না, অর্জন করতে হয়। কবির মাস্টার তা করেছেন।
কেনাকাটা করতে নীলু
কেনাকাটা করতে নীলু কখনো একা একা আসে না। তার সঙ্গে থাকে শাহানা কিংবা রফিক। আজ সে এসেছে একা। এবং আসার সময় সারা পথেই মনে হয়েছে গিয়ে দেখবে নিউ মার্কেট বন্ধ। সে লক্ষ করেছে, যেদিনই কোনো একটা বিশেষ কিছু কেনাকাটার থাকে, সেদিনই নিউমার্কেট থাকে বন্ধ। হয় সোমবার পড়ে যায়, কিংবা মঙ্গলবার। আজ অবশ্যি বুধবার। কে জানে এখন হয়তো নিউ মার্কেট বুধবারেই বন্ধ থাকে। অনেক দিন এদিকে আসা হয় না।
নিউ মার্কেট খোলাই ছিল। দুপুরবেলার দিকে শুধু বয়স্ক মহিলারাই বাজার করতে আসে নাকি? নীলু লক্ষ করল, তার চারদিকে খালাম্মা শ্রেণীর মহিলা। দরদাম করছে, কেনাকাটা বিশেষ করছে না। সময় কাটাবার জন্যেই আসে বোধহয়।
এক জন চকমকে শাড়ি পরা মহিলা সবকিছুর দাম জানতে জানতে এগুচ্ছে। নীলুর বেশ মজা লাগল। সে তার পেছনে পেছনে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগল। অনেক দিন পর সে ঘর থেকে বের হয়েছে। ভালোই লাগছে। তার। সেও অন্যদের মতো দরদম শুরু করল। একটা ট্রাইসাইকেলের দাম করল।
কত টাকা?
তের শ টাকা।
এত দাম। বলেন কি!
বিদেশি জিনিস।–আমেরিকান। দেশিট দেখবেন আপা?
আচ্ছা দেখান।
দোকানি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখাতে লাগল। নীলুর মায়াই লাগল। সে কিছু কিনবে না। শুধু শুধু বেচারাকে কষ্ট দিচ্ছে। এত টাকা দিয়ে বাবুর জন্যে ট্রাইসাইকেল কেনার প্রশ্নই ওঠে না।
জাপানি সাইকেল দেখবেন আপা? মিডিয়াম দামের মধ্যে পাবেন।
দেখান দেখি কেমন।
নীলু ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। একটা সাইকেল কিনতে পারলে ভালোই হত। বলে দেখবে নাকি শফিককে? না, বলাটা ঠিক হবে না। শফিক কিনে দিতে পারবে না। শেষে কষ্ট পাবে। কাউকে কষ্ট দিতে তার ভালো লাগে না।
এই, নীলু না? এখানে কী করছিস?
নীলু। তাকিয়ে রইল, মেয়েটিকে চিনতে পারল না।
এমন করে তাকাচ্ছিস কেন? চিনতে পারছিস না নাকি? চিনতে না-পারলে চড় খাবি।
বন্যা না?
বন্যা এত লোকজনের মধ্যেও ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। প্রায় ন বছর পর দেখা। স্কুলজীবনের তার সবচে প্রিয় বন্ধু। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় দু জনে এক বার প্রতিজ্ঞা করেছিল, সারা জীবন তারা বিয়ে করবে না। কোনো পুরুষের অধীনে থাকবে না। স্বাধীনভাবে বেঁচে থেকে দেখিয়ে দেবে, মেয়েরাও ইচ্ছা করলে একা একা থাকতে পারে। করবার পর কী ভেবে যেন দু জন খানিকক্ষণ কেঁদেছিল।
বন্যা, নীলুকে জড়িয়ে ধরে কল, বিয়ে করেছিস, তাই না?
হুঁ। তুই?
আমিও করেছি। এখন বল, আমাকে চিনতে পারিস নি কেন?
বন্যা আগের মতোই আছে, তবুও কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তনটা ধরা যাচ্ছে না। বন্যা বলল, কী, কথা বলছিস না কেন? আমার মধ্যে কোনো চেঞ্জ দেখছিস?
না, তেমন কিছু দেখছি না।
বলিস কি! ববকাট করেছি। গাদাখানিক চুল কেটে ফেলে দিয়েছি। তোর চোখেই পড়ল না! তোর হয়েছেটা কী বল তো?
তাই তো! পিঠভর্তি চুল ছিল বন্যার। চুলে নজর লাগবে বলে বন্যার মা কী একটা তাবিজও তার গলায় দিয়ে রেখেছিলেন। এই নিয়ে ক্লাসে কত হাসাহাসি।
চুল কেটে ফেললি কেন?
হাসবেণ্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে কেটে ফেলেছি।
বলিস কি!
হ্যাঁ। আমার জিনিস আমি কাটব, ওর বলার কী?
তুই এখনো আগের মতোই পাগল আছিস।
আর তুই আছিস আগের মতোই বোকা। চল যাই, চা খাব।
কোথায় চা খাবি?
কোথায় আবার, রেস্টুরেন্টে।
একা একা চা খাব নাকি আমরা?
বন্যা বিরক্ত মুখে বলল, দুটা মেয়ে যাচ্ছি। আমরা, একা বলছিস কেন? আজ তুই সারা দিন থাকবি আমার সঙ্গে। ম্যাটিনিতে ছবি দেখবি?
নীলু হকচকিয়ে গেল। বন্যা বলল, নাকি স্বামীর অনুমতি ছাড়া মুভি দেখা যাবে না?
তা না। ঘরে বাচ্চা আছে।
এর মধ্যে বাচ্চাও বাধিয়ে ফেলেছিস? এমন গাধা কেন তুই?
বন্যা তাকে নিয়ে অসঙ্কোচে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পুরুষদের ভঙ্গিতে ডাকল, এই বয়, আমাদের দু কাপ চা দাও। নীলু মৃদুস্বরে বলল, এত পুরুষদের মধ্যে বসে চা খেতে তোর অস্বস্তি লাগবে না?
অস্বস্তির কী আছে? ওরা কি আমাদের খেয়ে ফেলবে নাকি?
কেমন তাকাচ্ছে আমাদের দিকে।
তাকাক না।
তুই আগের চেয়ে অনেক স্মার্ট হয়েছিস।
স্মার্ট হতে হয়েছে। চাকরি করি তো। নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়।
চাকরি করিস?
করব না? তোর মতো ঘরে বসে বছরে বছরে বাচ্চা দেব নাকি?
নীলুর এই কথাটা ভালো লাগল না। বন্যা এমনভাবে বলছে, যেন বাচ্চা হওয়াটা একটা অপরাধ। কিন্তু বন্যাকে বড়ো ভালো লাগছে। আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে।
কোথায় চাকরি করছিস?
ইরানিয়ান এম্বেসিতে। রিসিপশনিষ্ট।
নীলু একবার ভাবল জিগ্যেস করে বেতন কত, কিন্তু জিগ্যেস করল না। বন্যা বলল, বেতন কত জিগ্যেস কয়লি না? নাকি জিগ্যেস করতে লজ্জা व्लনা?
বেতন কত?
তিন হাজার টাকা। যাতায়াতের একটা এ্যালাউন্স পাই। মেডিকেল এ্যালাউন্স আছে। সব মিলিয়ে চার হাজার টাকার মতো।
বলিস কি!
বেতন ভালোই। নিজের টাকা খরচ করি। ওর কাছে চাইতে হয় না। আগে ভাইয়ের বাড়িতে যাবার জন্যে পাঁচ টাকা রিকশা ভাড়া পর্যন্ত চাইতে হত। আর সে দিত এমনভাবে, যেন দয়া করছে, ভিক্ষা দিচ্ছে! এখন সে মাসের শেষে আমার কাছে ধার চায়।
