নীলু খুব লজ্জা পেল। মনোয়ারা সরে গেলেন। কবির মামা গম্ভীর গলায় বললেন, বুঝলে বৌমা, সত্যিকার আত্মীয়তা সম্পর্ক নেই তো, সে জন্যেই এই অবস্থা। যখন উপস্থিত হই, তখন আমার কথা মনে হয়। শফিকের বিয়ের কার্ড পাই বিয়ের এক সপ্তাহ পর।
নীলু চুপ করে রইল।
বিয়ের পর হঠাৎ মনে পড়েছে–আরে, কবির মামাকে তো বলা হয় নি–তখন একটা কার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে।
নীলুদৃঢ়ম্বরে বলল, আর এ-রকম ভুল হবে না মামা!
না হওয়াই উচিত। ভালোবাসার জবাব ভালোবাসা দিয়েই দিতে হয়। রফিক আসছে না কেন? এই রফিক, রফিক।
রফিক উঁকি দিল।
আছ কেমন মামা?
ভালোই আছি!
কোমর ভেঙে ফেলেছি নাকি?
কবির মামা জবাব দিলেন না।
দেখি, পাটা দাও, সালাম করি। নয়তো পরে ক্যাটক্যাট করবে।
তোর অসুখবিসুখ নাকি?
না।
এ-রকম গম্ভীর হয়ে আছিস কেন? মনে হয় বিরক্ত।
বিরক্ত না হয়ে উপায় আছে? তুমি এসেছ, ঘরটা ছেড়ে দিতে হবে তোমাকে। সোফায় আমি ঘুমাতে পারি না।
আয়েশী হয়ে গেছিস মনে হয়? পরীক্ষা কবে?
এপ্রিল মাসে।
প্রিপারেশন কেমন?
সেকেণ্ড ক্লাস টাইপ। আমি তো মামা লাইফ লং সেকেণ্ড ক্লাস ছাত্র।
পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাইলে কর।
পড়াশোনার আলাপ করতে ভালো লাগে না?
না।
যা আমার সামনে থেকে।
রফিক খুশি মনেই বের হয়ে গেল। কবির মামা বহু কষ্টে উঠে বসলেন। ব্যথা অনেকখানি কমেছে। এখন আর একে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এসব জিনিস প্রশ্রয় দিলেই বাড়ে।
এবার তোমার কন্যাকে নিয়ে এসে গো ম।
নীলু তার মেয়েকে নিয়ে এল।
চশমাটা দাও। চশমা ছাড়া ভালো দেখি না।
বাবুকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বারবার বলতে লাগলেন-—তোমার এই মেয়ে শাহানার মতো রূপসী হবে। বড়ো সুন্দর। গোলাপ ফুলের মতো লাগছে।
আপনি মামা দোয়া করবেন।
এই যুগে মা, দোয়াতে কাজ হয় না। কোনো যুগেই হয় না। কাজ হয় কর্মে। কর্ম ঠিক রাখবে, তাহলেই হবে। নাম কী রেখেছ মেয়ের?
এখনো রাখা হয় নি। বাবা রেখেছেন টুনি।
টুনি ফুনি আবার কী রকম নাম?
আপনি একটা নাম রাখেন মামা।
আমার নাম কি আর পছন্দ হবে?
পছন্দ হবে, আপনি রাখেন।
কবির মামা কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, ভোজল্লি! ভোজল্লি রাখ। এর মানে হচ্ছে আল্লাহর জ্যোতি।
নীলুর মুখ শুকিয়ে গেল। ঠিক তোজলি পূরনের নাম সে আশা করে নি।
নাম পছন্দ হয়েছে তো মা?
জ্বি, হয়েছে।
তাহলে ভোজল্লিই রাখা!
তিনি ফতুয়ার পকেট থেকে একটা এক শ টাকার নোট বের করে মেয়ের মুখ দেখলেন। এই এক শ টাকাই ছিল তাঁর সঙ্গে।
রাতে কবির মামার জ্বর এসে গেল। বেশ ভালো জ্বর। হোসেন সাহেব বললেন, এক ডোজ আনিকা খাবে? ব্যথা সেরে যাবে।
তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন, কয়েকটা জিনিসে আমার বিশ্বাস নেই, হোমিওপ্যাথি তার মধ্যে একটা!
তাহলে ডাক্তার ডেকে আনুক।
এই দুপুর রাতে ডাক্তার ডাকতে হবে না। তোমরা ঘুমাতে যাও!
রাতে তিনি কিছু খেলেন না। নীলু এক গ্লাস দুধ নিয়ে গিয়েছিল। তিনি ছুঁয়েও দেখলেন না।
দুধ শিশুদের খাবার, মা। দেশে দুধের অভাব। আমরা বুড়োরাই যদি সব দুধ খেয়ে ফেলি, ওরা খাবে কী?
রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি এক গ্লাস দুধ খেলে ওদের কম পড়বে না?
এক গ্লাস এক গ্লাস করেই লক্ষ গ্লাস হয়। ঠাণ্ডা মাথায় সব কিছু বিচার করতে হয়। একটা রাত উপোস দিলে শরীর ঝরঝরে হয়ে যাবে। উপোসের মতো বড়ো অষুধ কিছু নেই।
কবির মামার ঢাকা আসার উদ্দেশ্য দ্বিতীয় দিনে জানা গেল। তাঁর মাথায় বিরাট একটা পরিকল্পনা এসেছে। তিনি নীলগঞ্জকে সুখী নীলগঞ্জ বানাতে চান। নীলগঞ্জের সব মানুষকে তিনি সুখী দেখতে চান। সেখানে কোনো দুঃখ থাকবে না। সবাই দু বেলা ভাত খাবে। সবটাই তিনি করবেন স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে। তাঁর পুরানো ছাত্রদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে। মনোয়ারা বললেন, আপনার তো ভাইজান এখন বিশ্রামের সময়। রিটায়ার করেছেন, এখন বিশ্রাম করবেন।
শুয়ে থাকলেই বুঝি বিশ্রাম হয়? বিশ্রাম হচ্ছে কাজে। একটা ভালো কাজ করার মধ্যে বিশ্রাম আছে। শফিক, কী বলিস?
শফিক কিছু বলল না।
হোসেন, তোমার কি মত?
ভালোই তো।
ভালোই তো বলছি কেন? আইডিয়া পছন্দ হচ্ছে না? মরবার আগে যদি এটা করে যেতে পারি তাহলে কাজের মতো কাজ হয়। কিছুই তো করলাম না জীবনে।
কিছুই কর নি-কথাটা তো ঠিক বললে না। হাজার হাজার ছাত্র তৈরি করেছি। এটা তো কম না।
নীলগঞ্জের এই কাজটাও করতে চাই। আমাকে দেখে অন্যরা উৎসাহী হবে। বাংলাদেশে হাজার হাজার নীলগঞ্জ হবে। দেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। ঠিক কিনা বল।
ঠিক।
একটা বড়ো জাবদা খাতা কিনেছি। ছাত্রদের সব নাম-ঠিকানা বের করে করে লিখছি। এদের সবার কাছে চিঠি দেব, তারপর দেখা করব। কাজে নেমে পড়তে হবে। কত দিন বাঁচি তার ঠিক নেই কোনো।
তিনি সবার সঙ্গেই মহা উৎসাহে নীলগঞ্জ নিয়ে আলাপ করলেন। রফিক শুধু বাদ পড়ল। রফিকের সঙ্গেও তুলতে চেয়েছিলেন, রফিক হাই তুলে বলল, এইসব বোগাস আদর্শবাদী স্বপ্নের কথা শুনতে আমার ভালো লাগে না, মামা।
বোগাস।
বোগাস তো বটেই। এক জন রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে ফেলবো?
বাংলাদেশের কথা তো বলছি না। নীলগঞ্জের কথা বলছি।
তোমাকে দিয়ে এসব হবে না মামা। এই বয়সে খামোক দৌড়াদৌড়ি করে শরীর নষ্ট করবে। এমনিতেই কোমর ভেঙে কাত হয়ে আছে।
কবির মামা দুদিন ঢাকা থাকলেন। ফিরে যাবার ভাড়া ছিল না। শফিকের কাছ থেকে ত্ৰিশ টাকা ধার করলেন।
