তারা যখন গাড়ি করে রওনা দিয়েছে তখন অসম্ভব গরম। টুম্পার এরকম গরম দেখে অভ্যাস নেই সে দরদর করে ঘামছে, ছোট খালা এবং ছোট খালুও খবরের কাগজ দিয়ে নিজেদের বাতাস করতে করতে বলছেন, ইশরে! এ দেখি মানুষ মারা গরম!
গাড়ি যখন ঘণ্টা খানেক গিয়েছে তখন টুম্পা একটু অবাক হয়ে দেখলো হঠাৎ করে আকাশে মেঘ জমা হতে শুরু করেছে। একটু আগেই আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন ছিল না, এতো তাড়াতাড়ি কেমন করে এরকম মেঘ এসে হাজির হয়েছে কে জানে! দেখতে দেখতে মেঘে আকাশ ঢেকে গেল–কি মিশমিশে কালো মেঘ! টুম্পা অবাক হয়ে দেখে মেঘগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো আকাশে নড়ছে। টুম্পা তার জীবনে এরকম কালো মেঘ দেখে নি! আকাশ চিরে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলক নিচে নেমে এল আর সেই বিদ্যুতের আলোতে পুরো এলাকাটা যেন ঝলসে উঠলো। একটু পর বজ্রপাতের গুরুগম্ভীর আওয়াজ গুম গুম করে দূর থেকে ভেসে আসে– সেই শব্দটি পুরো মাঠ ঘাট ক্ষেত নদীর ওপর দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ভেসে যায়।
টুম্পা বলল, ও মাই গড! কী দৃশ্য! কী অসাধারণ দৃশ্য!
ছোট খালু বললেন, এখন এক পশলা বৃষ্টি হবে, দেখবে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে পৃথিবীটা।
ছোট খালু গাড়িটা একটু থামাতে বলো না, একটু ভালো করে দেখি!
সুমি আর রুমি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ আব্বু হ্যাঁ। থামাও না।
ছোট খালু ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন, ড্রাইভার সাথে সাথে রাস্তার পাশে গাড়ি থামালো। ছোট খালু গাড়ির দরজা খুলে দিতেই সবাই দুদ্দাড় করে গাড়ি থেকে নেমে যায়। আকাশের কালো মেঘ আরো মিশমিশে কালো হয়েছে, দিনের বেলাতেই মনে হচ্ছে বুঝি অন্ধকার নেমে এসেছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে সাথে সাথে মেঘের গর্জন। সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ তার পাশে একটা ছোট নদী। নদীতে একটা ছোট মেয়ে একটা নৌকাকে লগি দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে বিচিত্র একটা থমথমে পরিবেশ, মনে হতে থাকে বুঝি ভয়ানক কিছু ঘটবে। হঠাৎ করে একটা দমকা বাতাস ছুটে এল, শুকনো খড়কুটো পাতা ধূলো বালি উড়তে থাকে। কিছু পাখি তারস্বরে চিৎকার করতে করতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।
টুম্পা এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মাঝে হঠাৎ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। ছোট খালা চিৎকার করে বললেন, গাড়িতে! গাড়িতে!
সুমি বলল, আম্মু বৃষ্টিতে ভিজি?
রুমি বলল, হ্যাঁ আম্মু। প্লিজ?
টুম্পা অবাক হয়ে ভাবল, মানুষ আবার বৃষ্টিতে কেমন করে ভেজে? ছোট খালা নিশ্চয়ই এরকম পাগলামো করতে দেবেন না, কিন্তু টুম্পা অবাক হয়ে দেখলো ছোট খালা বললেন, ভিজবি? যা!
সুমি আর রুমি টুম্পার হাত ধরে আনন্দে চিৎকার করে বলল, চল টুম্পা আপু! চল!
সুমি আর রুমির হাত ধরে টুম্পা যখন খোলা মাঠের দিকে ছুটে যেতে লাগলো তখন সে হঠাৎ করে বুঝতে পারলো কেন বৃষ্টিতে ভেজা এতো আনন্দের। সারা জীবন সে দেখে এসেছে বৃষ্টি মানেই টিপটিপে ঠাণ্ডা মন খারাপ করা স্যাঁতস্যাঁতে একটা ব্যাপার। অথচ এই বৃষ্টিটি একেবারে উদ্দাম, প্রবল, তীব্র আর সবচেয়ে বড় কথা মোটেও ঠাণ্ডা নয়। বৃষ্টির প্রথম ঝাঁপটাটা কেটে যাবার পরই পুম্পা অবাক হয়ে দেখলো এটা খুব মজার এক ধরণের বৃষ্টি। ঝমঝমে বৃষ্টি তাদের শরীর ভেসে যাচ্ছে অথচ তাদের ঠাণ্ডা লাগছে না– এটা কী বিচিত্র অনুভূতি!
রুমি আর সুমি নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভিজে অভ্যস্ত–তারা মাঠে নাচানাচি করে ছুটতে লাগলো, চিৎকার করে গাইত লাগলো আয় বৃষ্টি ঝেপে ধান দেব মেপে…, টুম্পা প্রথমবার বুঝতে পারলো কেন এই দেশের মানুষ বৃষ্টিকে এতো ভালোবাসে! যে বৃষ্টি এতো সুন্দর তাকে কী ভালো না বেসে পারা যায়?
সুমি টুম্পাকে ডাকলো, আস টুম্পা আপু! আস এখানে নাচি!
টুম্পার প্রথম প্রথম একটু লজ্জা করছিল কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই লজ্জা ভেঙ্গে সেও ছোটাচ্চুটি করতে লাগলো। চিৎকার করে গান গাইতে লাগলো। টুম্পা অবাক হয়ে দেখলো বৃষ্টির মাঝে ছুটে যেতে যেতে অনেক গুলো বাচ্চা দাঁড়িয়ে গেছে। কয়েকজন বেশ ছোট, গায়ে একটা সূতাও নেই, রুমি সুমি আর টুম্পাকে নাচানাচি করতে দেখে তারা কিছুক্ষণ দাঁত বের করে হাসলো তারপর তারাও নাচানাচিতে যোগ দিয়ে দিলো।
নাচানাচি করতে করতে তারা অনেকদূর চলে গিয়েছিল। হঠাৎ করে শুনতে পেলো তাদের গাড়ির হর্ণ বাজছে– ছোট খালা আর ছোট খালু নিশ্চয়ই ফিরে যেতে ইঙ্গিত করছে!
সুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, চল! আম্মু ডাকছে!
রুমি বলল, অরও একটু থাকি! এরকম ফাটাফাটি বৃষ্টি বেশি হয় না।
সুমি বলল, ঠিকই হয়। আমরা বিল্ডিংয়ের ভেতরে থাকি তো, তাই টের পাই না।
টুম্পা বলল, অনেক মজা হয়েছে। আমি চিন্তাও করি নাই এরকম বৃষ্টির মাঝে ভেজা যায়। আমেরিকায় বৃষ্টিগুলা প্যাঁচপ্যাঁচ ঠাণ্ডা– পিট পিট করে পড়ে। আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও খালি নাকের ডগাটা ভিজবে। আর এটা কী চমৎকার বৃষ্টি! সারা শরীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে।
আবার হর্ণের শব্দ হলো, তার সাথে এবার ছোট খালার গলা শোনা গেল, চিৎকার করে ডাকছেন।
টুম্পা বলল, চল যাই।
সবাই ভিজতে ভিজতে গাড়ির কাছে ফিরে এল, ছোট খালু বললেন, ভেজা হলো?
টুম্পা বলল, জী ছোট খালু এতো মজা জীবনে হয় নাই।
ছোট খালা বললেন, এখন ঝটপট মাথা মুছে শুকনো কাপড় পরে নাও, গাড়ির ভেতরে কাপড় বদলাতে পারবে তো?
