তুমি কী ভেবেছিলে?
আমি জানি না কী ভেবেছিলাম। মনে হয় ভেবেছিলাম বড় বড় গাছ থেকে টি ব্যাগ ঝুলছে!
সুমি হি হি করে হেসে বলল, ভালোই বলেছ টুম্পা আপু। গেস্ট হাউজে বেশ কয়েকটা ঘর, একটাতে ঢুকলো টুম্পা আর সুমি অন্যটাতে ছোট খালা, ছোট খালু আর রুমি। রুমি অবশ্যি ঘণ্টাখানেক পরেই নিজের বিছানা বালিশ নিয়ে টুম্পাদের রুমে চলে এল।
গেস্ট হাউজে পৌঁছানোর সাথে সাথেই টেবিলে খাবার দিয়ে দেয়া হয়েছে, অনেক বেলা হয়ে গেছে বলে সবার পেটেই খুব খিদে সে জন্যেই হোক আর ভাল রান্নার জন্যেই হোক সবাই খুব মজা করে খেলো। ছোট খালু বললেন তিনি একটু শুয়ে নেবেন। ছোট খালা বললেন, সে কী, বেড়াতে এসে ঘুমাবে মানে? ঘুমাতে পারবে না– চল বের হই। এক্ষুণি বের হই। কতো কী আছে দেখার। কতো সুন্দর চা বাগান–
একটু পর দেখা গেল ছোট খালাই শুয়ে ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে গেছেন, ছোট খালু এপাশ ও পাশ করছেন, তার চোখে ঘুম আসছে না। টুম্পা সুমি আর রুমি তাদের জন্যে অপেক্ষা না করে বের হয়ে গেল। চা বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টুম্পা অবাক হয়ে দেখে চা বাগানের মেয়ে শ্রমিকেরা সারি বেধে চা তুলতে যাচ্ছে। মেয়ে গুলো শুকনো, তাদের মাথায় বড় বড় ঝুড়ি। চা বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে এতো তাড়াতাড়ি চা পাতা ছিড়ছে যে তারা দেখে অবাক হয়ে যায়। সুমি ফিস ফিস করে বলল, টুম্পা আপু।
কী?
চায়ের বিজ্ঞাপনে এই চা বাগানের ছবি থাকে। সেখানে যে মেয়েরা চায়ের পাতা তুলে তারা হয় নাদুস নুদুস মোটা সোটা। আর এই মেয়েগুলি দেখো কী শুকনা।
টুম্পা বলল, এই মেয়েগুলি কাজ করে, যারা কাজ করে তারা কোনোদিন মোটা হতে পারে না। যারা ঘরে বসে বসে খায় তারা মোটা হয়।
তা ঠিক।
টুম্পা, রুমি আর সুমি চা বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেল। এক জায়গায় একটা টিলা শেষ হয়ে গেছে– নিচে একটা শুকনো খাল, খালের ভেতর দিয়ে টলটলে পরিষ্কার পানি তির তির করে বয়ে যাচ্ছে। টুম্পা সুমি আর রুমি খালের পাড়ে একটা গাছের গুড়িতে বসে রইলো। রুমি জিজ্ঞেস করল, টুম্পা আপু, আমেরিকাতে চা বাগান আছে?
উহুঁ। কিন্তু আমেরিকা তো অনেক বড় দেশ সেইখানে পাহাড় আছে, মরুভুমি আছে, সাগর আছে, নদী আছে, জঙ্গল আছে–
সুমি তার ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল, তুমি কখনো মরুভূমিতে গেছো?
টুম্পা একটু অবাক হয়ে সুমির দিকে তাকালো। এই প্রশ্নটাতে অবাক হবার কী আছে সুমি বুঝতে পারল না, আবার জিজ্ঞাস করলো, গিয়েছ টুম্পা আপু?
টুম্পা চোখ বড় বড় করে বলল, তোমার ঘাড়ে ঐটা কী?
সুমি ঘাড়ে হাত দেয়, যেখানে চুলকাচ্ছিল সেখানে পিছলে পিছলে এক ধরনের অনুভূতি, মাথা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু এমন জায়গায় চুলকাচ্ছে সেটা দেখা যাচ্ছে না। ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী?
রুমি চিৎকার করে বলল, নড়ছে! এইটা নড়ছে!
সুমি তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দাপাদাপি করতে লাগলো। কাছাকাছি কয়েকটা মেয়ে চায়ের পাতা তুলছিল, চিৎকার শুনে তাদের কয়েকজন ছুটে আসে। বলে, কী হইছে গো?
সুমি তখন কোনো কথা বলতে পারছে না, সারা শরীর শক্ত করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। টুম্পা বলল, ঘাড়ের মাঝে কী যেন হয়েছে।
কালো মতোন একটা মেয়ে এগিয়ে এসে এক নজর দেখে হি হি করে হেসে বলল, জোঁকে ধরিছে!
জোক! জোক! বলে সুমি এবারে এমন চিৎকার শুরু করে দেয় যে তাকে দেখে মনে হতে থাকে সে বুঝি হার্টফেল করে মরে যাবে।
কালো মতন মেয়েটি হাসতে হাসতে বলে, এতো ভয় পাও কেন? জোকরে ভয় পায় নাকী? তুমি লাফ দিও না আমি জোঁক তুলে দেই–
সুমি বলল, প্লিজ-প্লিজ প্লিজ–
মেয়েটি ঘাড়ে হাত দিয়ে কীভাবে জানি জোকটাকে ধরে টেনে খোলার চেষ্টা করল, এমন ভাবে কামড়ে ধরেছে যে টানার সাথে সাথে ইলাস্টিকের মতো লম্বা হতে থাকে কিন্তু ছুটে আসে না! ছেড়ে দিয়ে আবার টেনে ধরতেই এবারে ছুটে এল। জোঁকটাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে ডলে পিশে ফেলতেই রক্ত দিয়ে জায়গাটা একটু লাল হয়ে যায়। কালো মতন মেয়েটা বলল, কতো রক্ত খাইছে দেখো।
সুমী এতোক্ষণ ভয়ে কাবু হয়েছিল, এইবারে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে শুরু করে দিলো। মেয়েটা বলল, কান্দনের কিছু নাই। জেঁকে কামড়ালে কিছু হয় না। আমাদের প্রত্যেক রোজ চাইরটা পাঁচটা কামড়ায়। রক্ত খাইয়া ঢোল হইয়া গড়াইয়া পড়ে আমরা টের পর্যন্ত পাই না।
এটা শুনেও সুমি খুব ভরসা পেল না, ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতেই লাগলো। টুম্পা বলল, এখন আর কাঁদছ কেন, জোঁক তো সরিয়েই ফেলেছে!
তোমাকে ধরলে তুমিও কাঁদতে।
টুম্পা বলল, সেটা মিথ্যা বল নাই! কিন্তু এখন কান্না থামিয়ে এই মেয়েটাকে থ্যাংকস দাও।
সুমি ফোঁস ফোঁস করে কঁদতে কাঁদতে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী আপু?
নাম? আমার?
হ্যাঁ?
কমলা।
কমলা আপু তোমাকে থ্যাংকস। অনেক থ্যাংকস। তার মানে অনেক ধন্যবাদ। তুমি আজকে আমাকে না বাঁচালে আজকে এই জেঁক আমাকে খেয়ে ফেলতো!
কমলা নামের মেয়েটা হিহি করে হাসতে হাসতে বলল, কী কথা বলে এইটাতো একটা জেঁক! এইটাতো বাঘ না! ভালুক না।
সুমি বলল, বাঘ ভাল্লুক আমি ভয় পাই না। কিন্তু জোঁক? ও মাগো!
.
সবাই চা বাগান থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় রওনা দিল পরদিন দুপুর বেলা। এর মাঝে তারা অনেক কিছু করেছে, চা বাগান ঘুরে দেখেছে, চায়ের পাত তুলে আনার পর ধাপে ধাপে সেটা দিয়ে কী ভাবে চা বানানো হয় সেটা দেখছে, কীভাবে প্যাকেট করে বাক্সে ভরা হয় সেটা দেখেছে। চা শ্রমিকেরা কোথায় থাকে কীভাবে থাকে সেটা দেখেছে, তাদের একটা মন্দির দেখেছে এমন কী শুশানে একজনকে পুড়তেও দেখেছে–কিন্তু তারপরেও সারাক্ষণই তাদের কথাবার্তা হলো জোককে ঘিরে। সারাক্ষণই সুমি তটস্থ হয়ে ছিল, একটু পরে পরে শরীরের এখানে সেখানে হাত দিয়ে চমকে চমকে উঠছিল। বাসায় ফিরে আসার জন্যে গাড়িতে ওঠার পর শেষ পর্যন্ত তার ভয়টা একটু কমলো।
