টুম্পা বলল, পারব ছোট খালা।
কাজটা খুব সহজ হলো না কিন্তু যখন সত্যি সত্যি তিনজনই শুকনো কাপড় পরে বসেছে তখন নিজেদের এতো ঝরঝরে লাগছিল যে সেটা আর বলার মতো নয়। গাড়ি ছেড়ে দেবার সাথে সাথে সুমি বলল, আম্মু খিদে লেগেছে!
ছোট খালা বললেন, খিদে তো লাগবেই, এতো ছোটাচ্চুটি নাচানাচি করলে খিদে লাগবেনা? কী খাবি বল। পরোটা শিক কাবাব নাকি ডালপুরি স্যাণ্ডউইচ? বাবুর্চি সবকিছু তৈরি করে দিয়েছে।
রুমি বলল, বাবুর্চি ভাই! জিন্দাবাদ।
.
ওরা বাসায় পৌঁছালো রাত সাড়ে বারোটায়। গাড়ি থেকে নেমে উপরে ওঠার সময় সবাই দেখল সিঁড়িতে একজন গুটি গুটি মেরে বসে আছে। টুম্পা একটু অবাক হয়ে এগিয়ে গেল, মানুষটি মাথা তুলে বলল, টুম্পা?
টুম্পা অবাক হয়ে দেখলো মানুষটি তার আব্বু।
১২. অভিমান
টুম্পা কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারে না, অবাক হয়ে আব্বুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, আব্বু, তুমি?
হ্যাঁ, মা। আমি।
তুমি কখন এসেছ?
সন্ধ্যেবেলা।
কার সাথে এসেছ?
কারো সাথে আসি নাই। আমি একা একা এসেছি।
টুম্পা বিস্ফারিত চোখে বলল, একা?
হ্যাঁ। আমি একা একা এসেছি।
কেমন করে এসেছ?
এই তো স্কুটারে করে। এসে জিজ্ঞেস করে করে বাসাটা খুঁজে বের করেছি।
কিন্তু টুম্পা কথা বলতে পারে না, কিন্তু—
কিন্তু কী?
তুমি তো ঘর থেকেই বের হও না আব্বু।
আব্বু হাসার চেষ্টা করলেন, সিঁড়ির কাছে আবছা আলোতে আব্বুর হাসিটাকে খুব বিচিত্র দেখালো, আব্বু বললেন, কিন্তু আমাকে তো ঘর থেকে বের হতে হবে। হবে না?
কেন?
তুই বলেছিলি মনে নেই?
কিন্তু আমি তো ভুলে বলেছিলাম। ডাক্তার সাহেব বলেছেন–
তুই ভুল বলিস নাই। ডাক্তার সাহেব ভুল বলেছে। আব্বু টুম্পার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আয় মা, টুম্পা। আমার কাছে আয়। আমি খুব কষ্টের মাঝে আছি।
টুম্পা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো, দেখলো তার পিছনে রুমি সুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আরও পিছনে গাড়ি থেকে নামতে নামতে ছোট খালা আর খালু ও থেমে গেছেন। টুম্পাকে একা কথা বলতে দিয়ে তারা সবাই খুব আস্তে আস্তে উপরে উঠে গেল। আব্বু আবার ডাকলেন, বললেন, আয় মা টুম্পা, আমার কাছে আয়।
টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, না আব্বু। না।
আব্বু কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলেন, কেন না?
আমি এসে তোমার খুব ক্ষতি করেছি আব্বু।
কে বলেছে?
সবাই বলেছে। ডাক্তার সাহেব বলেছেন।
কী বলেছেন ডাক্তার সাহেব?
বলেছেন আমি অল্প কয়দিনের জন্যে এসে তোমার সব কিছু ওলট করে দিচ্ছি– তুমি তোমার নিজের একটা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলে–।
আব্বু কেমন যেন অবাক হয়ে বললেন, তুই ওলট পালট করে দিচ্ছিস?
হ্যাঁ আব্বু। আমি তোমার কিছু ওলট পালট করতে চাই না কথা নাই বার্তা নেই টুম্পা হঠাৎ হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল।
আব্বু একটু অবাক হয়ে টুম্পার কাছে এগিয়ে এলেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুই কাঁদছিস কেন টুম্পা?
ডাক্তার সাহেব বলেছেন তুমি আমাকে দেখে ভয় পাও! আমকে তোমার কাছে যেতে না করেছেন। আমি গেলে তোমার ক্ষতি হবে—
আব্বু আস্তে আস্তে বললেন, শোন টুম্পা, আমি অসুস্থ হতে পারি, আমি কিন্তু বোকা না। আমি সব বুঝি–কখনো কখনো ভুল জিনিষ বুঝি, যেটা বোঝার কথা না সেটাও বুঝি। কিন্তু আমি বুঝি। সবাই আমাকে বুঝিয়েছে আমার ঘরের ভেতরে বসে থাকতে হবে। ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে হবে। কারণ আমি বাইরে যেতে পারব না। কিছুতেই বাইরে যেতে পারব না! আর তুই আমাকে কী বলেছিস টুম্পা? তুই বলেছিস আমাকে বাইরে যেতে হবে! আমার ভয়টাকে নিয়ে বাঁচা শিখতে হবে। আমি বসে বসে ভেবেছি। ভেবে ভেবে কী বুঝেছি জানিস?
কী আব্বু?
ডাক্তারদের কথা ভুল। তোর কথা সত্যি। আমি চোখ খুললেই দেখি আমার চারপাশে কতো কী ভয়ের জিনিষ–কিন্তু আমি জানি সেগুলো মিথ্যা! কেন মিথ্যা জানিস?
কেন আব্বু?
কারণ তুই বলেছিস এ সব মিথ্যা। এতোদিন আমি কারও একটা কথা বিশ্বাস করি নাই। কিন্তু আমি তোর সব কথা বিশ্বাস করেছি।
টুম্পা চোখ মুছে বলল, তুমি আমাকে ভয় পাও না আব্বু?
ছিঃ মা! নিজের মেয়েকে কেউ ভয় পায়? তুই আয়–আমার কাছে আয়।
টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, না আব্বু। ডাক্তার সাহেব বলেছেন আমি যেন তোমার কাছে না যাই। আমি গেলে তোমার ক্ষতি হবে।
আব্বু কেমন জানি আহত গলায় বললেন, তুই আমার কাছে আসবি না?
আমি আসতে চাই আব্বু, কিন্তু আমি জানি আমি যদি আসি তোমার ক্ষতি হবে। আমি যখন চলে যাব কখন তোমার অসুখটা অনেক বেড়ে যাবে। তখন তোমার অনেক কষ্ট হবে কিন্তু কেউ তোমাকে দেখার জন্যে থাকবে না। তুমি একলা একলা কষ্ট পাবে। অনেক বেশি কষ্ট পাবে– টুম্পা কথা শেষ করার আগে আবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল।
আব্বু আস্তে আস্তে বলল, তুই তাহলে আমার কাছে আসবি না?
না।
আব্বু তখন আস্তে আস্তে সিঁড়ির উপরে বসে গেলেন। দুই হাত দিয়ে মুখ ডেকে কিছুক্ষণ বসে রইলেন, তারপর মুখটা তুলে দুর্বল ভাবে হাসলেন। বললেন, তুই যাবি মনে করে আমি আজকে আমার বাসাটা পরিষ্কার করেছিলাম। আমি দোকান থেকে তোর জন্যে চিকেন বার্গার কিনে এনেছিলাম।
টুম্পা ভাঙ্গা গলায় বলল, আই অ্যাম সরি আব্বু। আই অ্যাম ভেরি ভেরি সরি।
তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ ছিল।
