যদি ভুলে যাওয়ার একটা সুইচ থাকতো তাহলে আমি টুক করে সেই সুইচটা অফ করে দিয়ে সব কিছু ভুলে যেতাম।
সুমি কোনো কথা বলল না, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে টুম্পা বলল, আমাদের সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার রাঙামাটি এসব জায়গায় যাবার কথা ছিল, মনে আছে? কতোদিন থেকে যেতে চেষ্টা করছি, যেতে পারছি না। এখন যেতে পারব।
সুমি কোনো কথা বলল না, টুম্পা বলল, দোকানের সামনে ছোট বাচ্চাগুলোর ছবি তুলেছিলাম মনে আছে? তাদের ছবিগুলোও প্রিন্ট করে দিতে হবে, কতোদিন থেকে বাচ্চাগুলি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করে আছে।
সুমি এবারেও কোনো কথা বলল না। টুম্পা বলল, সবাই মিলে একটা বাংলা নাটক দেখার কথা ছিল, মনে আছে? আর একটা বাংলা সিনেমা? এখন আমরা সেটাও দেখতে পারব। বাংলাদেশে এসে আসলে এখনো তো কিছুই করি নাই।
সুমি এবারেও কোনো কথা বলল না, দুইজন চুপচাপ অন্ধকারে বসে রইল। রাত্রে খাবার টেবিলে আজকে কেউ বেশি কথা বলল না। কথাবার্তায় কেউ একটিবারও সুমির আব্বুর কথা তুলল না। কথা যেটুকু সেটা ছিল ছোট খালার রান্না, ছোট খালুর অফিসের একজন বোকা অফিসার আর সুমির স্কুলের একজন রাজাকার টাইপ টিচারকে নিয়ে। খাওয়া শেষ করে আজকে অন্যদিনের মতো সবাই বসে গল্প গুজব করল না, যে যার মতোন শুয়ে পড়ল।
টুম্পা বিছানায় অনেক রাত পর্যন্ত নিঃশব্দে শুয়ে রইল তার চোখে ঘুম আসছিল না। গভীর রাতে তার ঘরের দরজা খুলে ছোট খালা এসে ঢুকলেন, নিচু গলায় খালায় বললেন, টুম্পা, মা ঘুমিয়ে গেছিস?
না, ছোট খালা।
ছোট খালা মশারির ভেতর ঢুকে টুম্পার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আমি খোঁজ নেওয়ার জন্যে হাসপাতালে ফোন করেছিলাম। তোর আব্বু ভালোই আছেন। কাল সকালে রিলিজ করে দেবে।
থ্যাংক ইউ ছোট খালা।
তুই কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করিস না।
আমি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করছি না, ছোট খালা। তুমি ঘুমাতে যাও।
ছোট খালা টুম্পার মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন, ঘুমাতে গেলেন না।
.
রাঙ্গামাটি এবং কক্সবাজার যাবার কথা অনেকদিন থেকে বলা হচ্ছিল কিন্তু পরের দিন ঘুম থেকে উঠে সবাইকে নিয়ে ছোট খালু একটা চা বাগানে রওনা দিলেন। ঢাকা শহর থেকে বের হতেই তাদের দেড় ঘণ্টা লেগে গেল। রাস্তায় যা ভীড় সেটা আর বলার মতো নয়, ভীড় ব্যাপারটা টুম্পার অবশ্যি খারাপ লাগে না– গাড়ির ভেতরে বসে বসে রাস্তার মানুষগুলো দেখা খুব মজার একটা ব্যাপার। একেকজন মানুষের মুখের ভঙ্গী একেক রকম, কেউ গম্ভীর কেউ খুশি, কেউ রাগ, কেউ বিরক্ত কেউ কেউ একেবারে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এক জায়গায় দেখা গেল দুইজন হাতাহাতি করছে, অন্য মানুষেরা গোল হয়ে দেখছে, মনে হয় ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করছে!
গাড়ি একটু যায় তারপর থেমে যায় তারপর আবার একটু যায়, ঘণ্টা খানেক এরকম হবার পর রুমি হড় হড় করে বমি করে দিলো। ভাগ্যিস বমি করার আগে রুমি একটা ওয়ার্নিং দিয়েছিল তাই ছোট খালার কোলের উপর বমি না করে জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাইরে বমি করতে পারল। সকালে রুমি এমন কিছু খায় নি কিন্তু বমি করলো অনেক কিছু কোথা থেকে সেগুলো পেটে এসেছে কে জানে!
শেষ পর্যন্ত ভীড় পার হয়ে তারা হাইওয়েতে উঠে গেল, তখন রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। ফাঁকা রাস্তায় এসে টুম্পার মনে হলো ভীড়টাই বুঝি ভালো ছিল, কারণ গাড়ির ড্রাইভার ফাঁকা রাস্তায় যেভাবে গাড়ি চালাতে লাগলো যে মনে হতে লাগলো এটা গাড়ি নয়, এটা বুঝি একটা প্লেন–এটা বুঝি এক্ষুণি রাস্তা ছেড়ে আকাশে উড়ে যাবে। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে উল্টোদিক থেকে আসা দৈত্যের মতো বাস আর ট্রাকগুলো। ড্রাইভারেরা একেবারে সোজাসুজি একজন আরেকজনের দিকে এগুতে থাক, অনেকটা যেন কার নার্ভ কতো শক্ত তার একটা পরীক্ষা, একেবারে শেষ মুহূর্তে দুটি গাড়ি একটু সরে একজন আরেকজনকে জায়গা করে দেয়। টুম্পার প্রত্যেকবারই মনে হয় এক্ষুণি বুঝি একটা একসিডেন্ট হয়ে সবাই ছাতু হয়ে যাবে, কিন্তু একসিডেন্ট হয় না। টুম্পা অবাক হয়ে দেখলো তাদের ড্রাইভার এরকম পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছে কিন্তু ছোট খালা, ছোট খালু বা অন্য কেউই সেটা নিয়ে একটুও অস্থির হচ্ছে না। টুম্পা একটু পরে বুঝতে পারল এই দেশে সবাই এভাবেই গাড়ি চালায়। আমেরিকার একজন কল্পনাও করতে পারবে না যে কেউ এভাবে গাড়ি চালাতে পারে। টুম্পা নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইল, মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকলো যেন কোনোভাবে কোনো একসিডেন্ট না করে চা বাগানে পৌঁছাতে পারে। যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে যদি একসিডেন্ট হয় তাহলে আর কাউকে বেঁচে থাকতে হবে না!
শেষ পর্যন্ত যখন চা বাগানে পৌঁছালো তখন চা বাগান দেখে টুম্পার যত আনন্দ হলো তার থেকে অনেক বেশি আনন্দ হলো গাড়ি থেকে নামতে পেরে।
গাড়িটা একটা গেস্ট হাউজের সামনে থেমেছে, গেস্ট হাউজটা একটা টিলার উপরে, এখানে দাঁড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়। যতদূর চোখ যায় শুধু চা বাগান। টুম্পার চা খেতে খুব ভালো লাগে কিন্তু আগে কখনোই চিন্তা করে নি। চা আসে কোথা থেকে। টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে চা বাগানটা দেখতে দেখতে টুম্পা অবাক হয়ে বলল, কী আশ্চর্য!
সুমি জিজ্ঞেস করল, কোনটা কী আশ্চর্য?
এই চা বাগান। আমি কখনোই ভাবি নি চা বাগান এরকম হয়।
